শান্তর চোখে বাংলাদেশের বদলের গল্প, মুশফিকের কণ্ঠে জয়ের আবেগ

পাকিস্তানকে টেস্ট সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করার পর বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর কণ্ঠে ছিল বদলে যাওয়া দলের গল্প। শুধু একটি সিরিজ জয় নয়, তার কাছে এটি দীর্ঘ প্রস্তুতি, মানসিকতার পরিবর্তন ও টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের নতুনভাবে গড়ে তোলার ফল।
ম্যাচ শেষে মানসিকতার পরিবর্তন নিয়ে জানতে চাইলে শান্ত কৃতিত্ব দিলেন পুরো দলকে। বাংলাদেশ অধিনায়ক বলেন, ‘কৃতিত্ব সব খেলোয়াড়ের। তারা অনেক পরিশ্রম করছে। আমরা কিছু জিনিস বদলেছি, দলটা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি। বিশ্ব ক্রিকেটে তাকালে দেখবেন, কিছু তৈরি করতে হলে পরিবর্তন আনতেই হয়। আশা করি, আমরা যেভাবে খেলছি, সেটা ধরে রাখতে পারব।’
সিলেটের উইকেট ও প্রস্তুতির কথাও আলাদা করে বলেছেন শান্ত। তার মতে, এমন কন্ডিশনে ভালো করার পেছনে প্রস্তুতির বড় ভূমিকা আছে। শান্ত বলেন, ‘প্রস্তুতির দিক থেকে আমরা অসাধারণ ছিলাম। এমন কন্ডিশনে সেটাই সাহায্য করেছে। গরমের মধ্যে, ফ্ল্যাট উইকেটে আমাদের পেসাররা দারুণ কাজ করেছে। এটা এমন একটা জায়গা, যেখানে আমরা উন্নতি করতে চেয়েছিলাম।’

শুধু বোলিং নয়, ব্যাটিংয়ের উন্নতিও দেখছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। মাঝে মাঝে দ্রুত উইকেট পড়লেও এখন গুরুত্বপূর্ণ জুটি হচ্ছে, লেজের ব্যাটসম্যানরাও অবদান রাখছেন—এই জায়গাগুলোই তাকে বেশি সন্তুষ্ট করেছে। শান্তর ভাষায়, ‘ব্যাটিংয়ে কখনো কখনো আমরা অনেক উইকেট হারিয়েছি। কিন্তু এখন আমাদের দারুণ কিছু জুটি হচ্ছে। টেলএন্ডাররাও অনেক অবদান রাখছে। এগুলোই আমরা উন্নতি করতে চেয়েছিলাম।’
সামনে বিদেশের কঠিন সিরিজগুলোকেও বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন শান্ত। তার মতে, দেশের বাইরে ভালো করা বাংলাদেশের পরের লক্ষ্য। তিনি বলেন, ‘অ্যাওয়ে সিরিজ খেলাটা আরও গুরুত্বপূর্ণ। গত চক্রে আমরা বাইরে কিছু ভালো ক্রিকেট খেলেছি। তবে এ বছর আরও চ্যালেঞ্জিং সফর আছে। এটা আমাদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা হবে। কিন্তু পেসার ও স্পিনাররা এভাবে ভালো খেলতে থাকলে আমরাও সেখানে ভালো ক্রিকেট খেলতে পারব।’

সিরিজসেরা হয়েছেন মুশফিকুর রহিম। সিরিজে ২৫৩ রান করা অভিজ্ঞ এই ব্যাটসম্যানের কাছে সাফল্যটা বিশেষ। মুশফিক বলেন, ‘এটা সত্যিই অনেক বড় ব্যাপার। ছেলেরা এটা প্রাপ্য। গত দুই-তিন বছর, বিশেষ করে টেস্ট ফরম্যাটে তারা যেভাবে খেলছে, তার কৃতিত্ব তাদেরই।’
সিলেট টেস্টে নিজের সেঞ্চুরির চেয়েও প্রথম ইনিংসে লিটন দাসের শতককে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন মুশফিক। তার মতে, সেই ইনিংসই বাংলাদেশকে ম্যাচে টিকিয়ে রেখেছিল। মুশফিক বলেন, ‘সত্যি বলতে, প্রথম ইনিংসে লিটনের সেঞ্চুরিটা ছিল অসাধারণ। সেটাই আমাদের ম্যাচে রেখেছিল। ড্রেসিংরুমের মনোবল অনেক উঁচু ছিল এবং আমরা তার জন্যও খেলতে চেয়েছিলাম।’
দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের লক্ষ্য কী ছিল, সেটিও জানিয়েছেন মুশফিক। তিনি বলেন, ‘উইকেটটা ব্যাটিংয়ের জন্য বেশ ভালো ছিল। তাই আমাদের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল অন্তত ৪০০, সম্ভব হলে ৪৫০-এর বেশি করা। কারণ আমি জানতাম, এটা সাধারণ দিনের পঞ্চম দিনের উইকেট হবে না। বোলাররা নিজেদের পরিকল্পনায় স্থির ছিল, কৃতিত্ব তাদের।’
নিজের অনুপ্রেরণা নিয়ে মুশফিকের উত্তর ছিল আবেগঘন। তিনি বলেন, ‘আমি বেঁচে আছি এবং দেশের হয়ে খেলছি। দেশের হয়ে খেলতে চাইলেই সেটা সহজে হয় না। পরিশ্রম করতে হয়, নিজেকে প্রমাণ করতে হয়। আমি জীবনটা উপভোগ করছি, আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ।’
ম্যাচসেরা হয়েছেন লিটন দাস। প্রথম ইনিংসে ১১৬ রানে ৬ উইকেট হারানোর পর তার ১২৬ রানের ইনিংসই বাংলাদেশকে লড়াইয়ে ফিরিয়ে আনে। নিজের সেঞ্চুরি নিয়ে লিটন বলেন, ‘শেষ দুই ইনিংসে রান পাইনি, তাই উইকেটে যাওয়ার সময় কোনো চাপ ছিল না। কিন্তু হঠাৎ কয়েকটি উইকেট পড়ে গেল, তখন বুঝতে পারছিলাম না কী করব। অধিনায়কের সঙ্গে কথা বলি, সে বলে আক্রমণ করতে। আমি নিজের শক্তির জায়গায় ভরসা রাখার চেষ্টা করেছি।’
তবে শুরুতে আক্রমণ করলেও পরে পরিস্থিতি বুঝে ব্যাটিংয়ের ধরন বদলান লিটন। তিনি বলেন, ‘দুইটা বাউন্ডারি মারার পর মনে হলো, এটা টেস্ট ক্রিকেট, আমাকে সময় নিতে হবে। বৃষ্টির সম্ভাবনা ছিল। ভাবছিলাম, যদি ১০-১৫ ওভার ব্যাট করতে পারি, ম্যাচের ছবিটাই বদলে যাবে।’
লেজের ব্যাটসম্যানদের সঙ্গে ব্যাটিংয়ের সময় সিঙ্গেল না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছেন লিটন। তার ভাষায়, ‘হ্যাঁ, তবে যদি সিঙ্গেল নিতাম, হয়তো আমার রান পঞ্চাশেই থাকত। আমি নিজেকে ধরে রেখেছিলাম, বেশি বল খেলতে চেয়েছিলাম। ওরা নিরাপদ থাকলে আমিও নিরাপদ থাকি।’
নিজের ইনিংসটিকে ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা বলেও মনে করছেন লিটন। তিনি বলেন, ‘সম্ভবত এটা আমার ক্যারিয়ারের সেরা সেঞ্চুরি। টেলএন্ডারদের সঙ্গে ব্যাটিং সহজ নয়। সব ফিল্ডার বাইরে থাকে। প্রথম দিনের উইকেটও সহজ ছিল না, আউটফিল্ড ছিল ধীর।’
