লর্ডসে ২০০ পেরোতেই নেই ১৬ উইকেট

মেঘলা আকাশ, সিম সহায়ক উইকেট আর লর্ডসের চিরাচরিত ঢাল—ব্যাটসম্যানদের জন্য দিনটা শুরু থেকেই সহজ হওয়ার কথা ছিল না। শেষ পর্যন্ত হলোও সেটিই। ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ড প্রথম টেস্টের উদ্বোধনী দিনটি রীতিমতো পেসারদের দখলে চলে গেল। প্রথম দিনেই পড়েছে ১৬টি উইকেট, আর রান উঠেছে মাত্র ২০১।
লর্ডসে বৃহস্পতিবার দুই দলের মধ্যকার টেস্টের প্রথম দিনে টস হেরে আগে ব্যাট করতে নেমে ১৪০ রানে অলআউট হয় ইংল্যান্ড। জবাবে দিন শেষে নিউজিল্যান্ডের অবস্থাও স্বস্তিদায়ক নয়। ৬ উইকেটে ৬১ রান তুলে প্রথম দিনের খেলা শেষ করেছে সফরকারীরা। ইংল্যান্ডের প্রথম ইনিংস থেকে এখনো ৭৯ রানে পিছিয়ে আছে তারা।
দিনের বড় দুই চরিত্র কাইল জেমিসন ও অলি রবিনসন। দুজনই ফিরেছেন টেস্ট ক্রিকেটে দীর্ঘ বিরতির পর। দুজনেরই সর্বশেষ টেস্ট ছিল ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ফেরার দিনেই বল হাতে নিজেদের উপস্থিতি জোরালোভাবে জানান দিলেন তাঁরা।
টস জিতে নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক টম ল্যাথাম আগে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নেন। মেঘলা আবহাওয়া ও সিম মুভমেন্টের সুবিধা নিতে চার পেসার নিয়ে মাঠে নামা কিউইদের পরিকল্পনা দ্রুতই সফল হয়। জেমিসন বাড়তি বাউন্স ও ধারালো সিম মুভমেন্টে ইংল্যান্ডের ব্যাটিং অর্ডার গুঁড়িয়ে দেন।
অভিষিক্ত এমিলিও গে শুরুতে ফুলটস থেকে বাউন্ডারি মেরে টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম রান পেলেও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। জেমিসনের সোজা হয়ে যাওয়া বলে স্লিপে ড্যারিল মিচেলের হাতে ক্যাচ দেন তিনি। ইংল্যান্ডের ‘বাজবল’ ব্যাটিংয়ের পরিচিত আগ্রাসনও দেখা যায়নি শুরুতে। প্রথম ১০ ওভারে আসে মাত্র ২৪ রান।
বৃষ্টির কারণে আগেভাগে মধ্যাহ্নভোজে যেতে হয় দুই দলকে। বিরতির পর নিউজিল্যান্ড শিবিরে বড় ধাক্কা আসে ম্যাট হেনরির পিঠের সমস্যায় মাঠে না নামায়। কিন্তু পেস আক্রমণ তিনজনে নেমে এলেও তা কম ভয়ংকর ছিল না। বেন ডাকেট ও জ্যাকব বেথেল দুজনই এলবিডব্লিউ হয়ে ফেরেন। ডাকেটকে নাথান স্মিথ ও বেথেলকে উইলিয়াম ও'রুর্ক বিদায় করেন। এরপর ও'রুর্কের বাড়তি বাউন্সে উইকেটকিপারের হাতে ক্যাচ দিয়ে মাত্র ১ রানে ফেরেন জো রুট। ইংল্যান্ড তখন ৩৩ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে চরম বিপর্যয়ে।
হ্যারি ব্রুক শুরুতে কিছুটা রক্ষণাত্মক ছিলেন, রান খাতা খুলতেই খেলেন ১১ বল। তবে জীবন পেয়ে পরে পাল্টা আক্রমণে যান তিনি। ডেভন কনওয়ে পয়েন্টে তাঁর সহজ ক্যাচ ছাড়েন তখন তিনি মাত্র ৮ রানে। এরপর উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান জেমি স্মিথকেও ফিরিয়ে দেন জেমিসন; ইনসুইং করে ভেতরে ঢোকা বলে অফ স্টাম্প উড়ে যায় তাঁর।
বেন স্টোকস কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেছিলেন, ব্রুকও বাউন্ডারিতে রানের গতি বাড়াচ্ছিলেন। কিন্তু জেমিসন আবার আঘাত হানেন। স্টোকসের ব্যাটের কানায় লেগে বল যায় স্লিপে, যেখানে ডানদিকে ঝাঁপিয়ে দারুণ এক হাতে ক্যাচ নেন কেন উইলিয়ামসন। ব্রুক ৪৫ রানে আরেকবার জীবন পেলেও শেষ পর্যন্ত ৫৬ রানে থামেন। গাস অ্যাটকিনসনকেও এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেন জেমিসন।
আলো কমে যাওয়া ও বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট বিরতির পর ফিরে এসে নিজের পাঁচ উইকেট পূর্ণ করতে বেশি সময় নেননি জেমিসন। অলি রবিনসনের ব্যাটের ভেতরের কানায় লেগে বল উইকেটকিপারের গ্লাভসে জমা পড়লে সফল রিভিউয়ে উইকেট পায় নিউজিল্যান্ড। শেষ উইকেটে শোয়েব বশির ও জশ টাং ২২ রান যোগ করায় ইংল্যান্ডের সংগ্রহ পৌঁছায় ১৪০ রানে। জেমিসনের বোলিং ফিগার ৫/৬২। নাথান স্মিথ নেন ৩ উইকেট আর ও'রুর্ক পান ২টি।
ইংল্যান্ডের জবাব ছিল আরও ধারালো। নিজের প্রথম ওভারেই ম্যাচের রং পাল্টে দেন অলি রবিনসন। নিখুঁত ওবল সিম ব্যবহার করে কনওয়েকে অস্বস্তিতে ফেলেন তিনি। কয়েক বলের মধ্যেই শর্ট লেগ ও লেগ গালি এনে ফাঁদ পাতেন অধিনায়ক স্টোকস। কনওয়ে এলবিডব্লিউ হন। এরপর প্রথম বলেই বিপদে পড়েন উইলিয়ামসন; ভেতরের কানায় লেগে বল প্যাড ছুঁয়ে যায় শর্ট লেগে। এমিলিও গে ক্যাচ ধরলে শূন্য রানেই ফেরেন কিউই ব্যাটিংয়ের মূল ভরসা।
রবিনসনের ওভার তখনও শেষ হয়নি। রাচিন রবীন্দ্রকে গোল্ডেন ডাকের স্বাদ দিয়ে ফেরান তিনি। বল ট্র্যাকিংয়ে দেখা যায়, বল সরাসরি স্টাম্পে আঘাত করত। এক ওভারে তিন উইকেট, তাও আবার মেডেন—রবিনসনের প্রত্যাবর্তন এর চেয়ে নাটকীয় হতে পারত না।
এরপর গাস অ্যাটকিনসন এলবিডব্লিউ করেন অধিনায়ক ল্যাথামকে। ড্যারিল মিচেল কিছুটা জবাব দেওয়ার চেষ্টা করলেও রবিনসনের করিডোরে রাখা বল ছেড়ে দিয়ে বোল্ড হন; বল লাগে অফ স্টাম্পের মাথায়। জশ টাং পরে টম ব্লান্ডেলের অফ স্টাম্প উড়িয়ে নিজের ৫০তম টেস্ট উইকেট পূর্ণ করেন। নিউজিল্যান্ড তখন ২৯ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে চরম ব্যাটিং বিপর্যয়ে ধুঁকছে।
এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে একা পাল্টা লড়াই শুরু করেন গ্লেন ফিলিপস। ইংল্যান্ড পেসাররা একটু খাটো বা লেগ সাইডে বল করলেই রান তুলেছেন তিনি। নাথান স্মিথকে নিয়ে সপ্তম উইকেটে অবিচ্ছিন্ন ৩২ রানের জুটি গড়ে নিউজিল্যান্ডকে দলীয় পঞ্চাশ পার করান ফিলিপস। শেষ পর্যন্ত আলো কমে এলে দিনের খেলা সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। ফিলিপস অপরাজিত আছেন ৩১ রানে।
প্রথম দিনের শেষে ম্যাচের পাল্লা কোন দিকে, তা বলা মুশকিল। ইংল্যান্ড ১৪০ রানে থমকে গেছে ঠিকই, কিন্তু বল হাতে নিউজিল্যান্ডকেও তারা ৬১ রানে ৬ উইকেটে নামিয়ে এনেছে। লর্ডসের সিম সহায়ক উইকেটে দ্বিতীয় দিনের প্রথম সেশনই এখন ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
ইংল্যান্ড ১ম ইনিংস: ১৪০ (হ্যারি ব্রুক ৫৬; কাইল জেমিসন ৫/৬২, নাথান স্মিথ ৩/৩৮, উইলিয়াম ও'রুর্ক ২/২৫)।
নিউজিল্যান্ড ১ম ইনিংস: ৬১/৬ (গ্লেন ফিলিপস ৩১*; অলি রবিনসন ৪/১০, গাস অ্যাটকিনসন ১/৮)।
(নিউজিল্যান্ড এখনো ৭৯ রানে পিছিয়ে)


