বাংলাদেশ ইস্যুতে প্রশ্নের মুখে আইসিসির ধারাবাহিকতা

ভারতে অনুষ্ঠিতব্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে প্রতিবেশী দেশে টাইগারদের না যাওয়ার অবস্থানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ একাধিকবার ভেন্যু পরিবর্তনের দাবি জানালেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) সেই অনুরোধ নাকচ করেছে। বরং বাংলাদেশ সরে দাঁড়ালে স্কটল্যান্ডকে বিকল্প হিসেবে নেওয়ার সব প্রস্তুতিই সম্পন্ন করেছে সংস্থাটি। তবে অতীতের একাধিক নজির সামনে এনে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন– এ ক্ষেত্রে আইসিসির অবস্থান কি আদৌ ধারাবাহিক ও ন্যায়সংগত?
ক্রিকেট ইতিহাসে নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও নীতিগত কারণে ম্যাচ বা টুর্নামেন্ট বয়কটের ঘটনা নতুন নয়। ১৯৯৬ বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি দল সেখানে খেলতে অস্বীকৃতি জানায়, যার ফলে ভেন্যু ও পয়েন্ট বণ্টন নিয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়। ২০০৩ বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়ায় নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে একাধিক দল সফর বাতিল করে, যা টুর্নামেন্টের কাঠামো ও ফলাফলেও প্রভাব ফেলে।
সবচেয়ে বড় নজির আসে ২০০৯ সালে লাহোরে শ্রীলঙ্কা দলের ওপর হামলার পর। সেই ঘটনার পর প্রায় এক দশক পাকিস্তানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কার্যত বন্ধ থাকে এবং পাকিস্তান ঘরের মাঠের ম্যাচগুলো সংযুক্ত আরব আমিরাতে আয়োজন করতে বাধ্য হয়। একইভাবে, আফগানিস্তান টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পরও নিরাপত্তাজনিত কারণে নিজ দেশে আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন করতে পারেনি।
ভারত-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আইসিসি বারবার নমনীয়তা দেখিয়েছে। ভারত পাকিস্তানে যেতে অস্বীকৃতি জানালে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে ম্যাচ আয়োজন করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানও ভারতে খেলতে না চাওয়ায় তাদের ম্যাচ শ্রীলঙ্কা বা অন্য নিরপেক্ষ ভেন্যুতে সরানো হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের দাবি নতুন কিছু নয় বলেই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। তাদের যুক্তি এক্ষেত্রে যখন বড় বোর্ডগুলোর নিরাপত্তা বা রাজনৈতিক আপত্তিতে আইসিসি বারবার সূচি ও ভেন্যু বদলাতে রাজি হয়েছে, তখন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হঠাৎ করে কঠোর অবস্থান কেন?
এদিকে আইসিসির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এবার বিষয়টি ভিন্ন। সংস্থাটি স্বাধীন নিরাপত্তা মূল্যায়নের ভিত্তিতে ঝুঁকির মাত্রাকে ‘নিম্ন থেকে মাঝারি’ হিসেবে দেখেছে এবং তারা বলছে টুর্নামেন্টের সূচি, সম্প্রচার স্বত্ব ও লজিস্টিক চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকায় শেষ মুহূর্তে পরিবর্তন করা কঠিন। বোর্ড সভায় ১৪-২ ভোটে বাংলাদেশের প্রস্তাব নাকচ হওয়াও তাদের অবস্থানকে শক্ত করেছে।
তবে সমালোচকদের মতে, এই যুক্তি অতীতের অনেক সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা ভারত-পাকিস্তান ইস্যুতে আইসিসি যে নমনীয়তা দেখিয়েছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা হলে শ্রীলঙ্কার মতো নিরপেক্ষ ভেন্যুতে ম্যাচ সরানো খুব কঠিন হতো না।
এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে আইসিসি কি বড় বোর্ডগুলোর ক্ষেত্রে এক রকম এবং ছোট বোর্ডগুলোর ক্ষেত্রে আরেক রকম নীতি অনুসরণ করছে? নাকি শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত হওয়ায় বাংলাদেশকে কঠোর বাস্তবতার মুখে পড়তে হচ্ছে?
যাই হোক, ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের অবস্থানকে পুরোপুরি ব্যতিক্রম বলা কঠিন। বরং অতীতের বহু বয়কট ও ভেন্যু পরিবর্তনের নজির দেখিয়ে অনেকেই বলছেন, এই ক্ষেত্রে আইসিসির অনমনীয়তা সংস্থাটির নিরপেক্ষতা ও ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। অনেকেই বলছেন, আয়োজক ভারত না হয়ে অন্য কোনো দেশ হলে আইসিসি বাংলাদেশের দাবি মেনে নিত। এখন দেখার বিষয়– এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে ছোট বোর্ডগুলোর নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় কী বার্তা দেয়।