Advertisement

বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়কে যেভাবে দেখছে ভারত-পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়কে যেভাবে দেখছে ভারত-পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম
ভারত-পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমেও গুরুত্ব পেয়েছে বাংলাদেশের জয়। ছবি কোলাজ: এশিয়া পোস্ট

ডারউনে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারানোর পর বাংলাদেশের উল্লাস ছড়িয়ে পড়েছে সীমান্তের বাইরেও। বিশ্বের এক নম্বর টেস্ট দলকে তাদের মাঠে হারানোর ঘটনাকে ভারত ও পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম শুধু অঘটন হিসেবে দেখেনি। নির্বাচিত বড় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনের মূল সুর, চার দিন ধরে ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিংয়ে সেরা দল হয়েই জিতেছে বাংলাদেশ।

Advertisement

তবে দুই দেশের সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছু পার্থক্যও রয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশের পেস-বিপ্লব, অস্ট্রেলিয়ার ব্যর্থতা ও বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতের সম্ভাবনা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশের অর্জনকে দেখেছে এশিয়ার ক্রিকেট ইতিহাস এবং নিজেদের কিংবদন্তি পেসারদের সঙ্গে তুলনার আলোকে।

‘২৩ বছর টেস্ট খেলতে না দিয়ে রাখা হয়েছিল, এবার অস্ট্রেলিয়াকে ডুবিয়ে ডারউনে ইতিহাস বাংলাদেশের’, এমন শিরোনাম করেছে ইন্ডিয়া টুডে। সংবাদমাধ্যমটি এই জয়কে বাংলাদেশের জন্য ‘মুক্তি’ বা ঘুরে দাঁড়ানোর উপলক্ষ হিসেবে দেখেছে।

ইন্ডিয়া ট্যুডের প্রতিবেদন
ইন্ডিয়া ট্যুডের প্রতিবেদন

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে গিয়ে প্যাট কামিন্সের পূর্ণ শক্তির দলকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। জয়টিকে কোনো আকস্মিক ঘটনা না বলে অস্ট্রেলিয়ার ওপর বাংলাদেশের ‘সম্পূর্ণ আধিপত্য’ হিসেবে বর্ণনা করেছে তারা। মাত্র তিন ম্যাচের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম টেস্ট জিতে বাংলাদেশ এশিয়ার দ্রুততম দল হয়েছে, এই রেকর্ডও বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

হিন্দুস্তান টাইমস বাংলাদেশের জয়কে বলেছে অস্ট্রেলিয়ার জন্য ‘বাস্তবতা বুঝে নেওয়ার ধাক্কা’ এবং ‘ঘুম ভাঙানোর বার্তা’। তাদের বিশ্লেষণ, চার দিনের ম্যাচে বাংলাদেশ কোনো পর্যায়েই ভুল পদক্ষেপ নেয়নি। বিপরীতে নিজেদের মাঠে অস্ট্রেলিয়াকে অপ্রস্তুত ও দিশাহীন দেখিয়েছে।

হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন।
হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন।

একটি পৃথক প্রতিবেদনে ডারউনের ফল ভারতের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনায় কী প্রভাব ফেলতে পারে, সেটিও বিশ্লেষণ করেছে হিন্দুস্তান টাইমস। অস্ট্রেলিয়ার হারে প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য সুযোগ তৈরি হলেও ভারতকে নিজেদের বাকি ম্যাচে ভালো খেলতে হবে বলে উল্লেখ করেছে তারা। অর্থাৎ বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়কে ভারতীয় ক্রিকেটের সমীকরণেও বসানো হয়েছে।

টাইমস অব ইন্ডিয়া এই হারকে অস্ট্রেলিয়ার ১৪৯ বছরের টেস্ট ইতিহাসে নিজেদের মাঠে অন্যতম বিব্রতকর ফল হিসেবে দেখেছে। তাদের ম্যাচ প্রতিবেদনে মেহেদী হাসান মিরাজের অলরাউন্ড নৈপুণ্য, তানজিদ হাসান তামিমের শতক এবং হাসান মাহমুদের নয় উইকেটকে বাংলাদেশের আধিপত্যের মূল ভিত্তি বলা হয়েছে।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন।

সংবাদমাধ্যমটি আরও এক ধাপ এগিয়ে আলাদা বিশ্লেষণের শিরোনাম করেছে, ‘বিরাট কোহলির টেমপ্লেট অনুসরণ করে যেভাবে অস্ট্রেলিয়াকে হারাল বাংলাদেশ’। তাদের যুক্তি, ২০১৯ সালের কলকাতা টেস্টের পর কোহলির টেস্ট ক্রিকেট, খেলোয়াড়দের চুক্তি ও পেস বোলিং নিয়ে দেওয়া বক্তব্য বাংলাদেশের পরিবর্তনের ভাবনায় প্রভাব ফেলেছিল।

প্রতিবেদনটিতে অবশ্য বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্যোগের কথাও বিস্তারিতভাবে এসেছে। মুমিনুল হকের সময় ঘরোয়া ক্রিকেটে বেশি ঘাসের উইকেট, তিন পেসার খেলানোর বাধ্যবাধকতা এবং পেসারদের দীর্ঘ স্পেল করানোর সিদ্ধান্তকেই বর্তমান সাফল্যের ভিত্তি হিসেবে দেখেছে টাইমস অব ইন্ডিয়া। তাদের ভাষায়, সেই ‘পেস-বিপ্লবের’ ফল এখন হাসান মাহমুদদের বোলিংয়ে পাওয়া যাচ্ছে।

ভারতের বাংলা ভাষার সংবাদমাধ্যমও বেশ উচ্ছ্বসিত। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলার শিরোনাম, ‘বাঘেদের হাতে বধ ক্যাঙারু ব্রিগেড, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইতিহাস বাংলাদেশের’। বাংলাদেশের নয় উইকেটের জয়, তানজিদের শতক এবং হাসান-মিরাজের বোলিংকে তারা ইতিহাস গড়ার প্রধান উপাদান হিসেবে তুলে ধরেছে।

পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমেও বাংলাদেশের দাপটই সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে। ডন বাংলাদেশকে ‘দুর্দমনীয়’ উল্লেখ করে অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম টেস্ট জয়ের খবর প্রকাশ করেছে। এক্সপ্রেস ট্রিবিউন ও এআরওয়াই নিউজে প্রকাশিত এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই জয়ের ব্যবধান ক্রিকেট বিশ্বে বড় ধরনের আলোড়ন তুলবে।

ডনের প্রতিবেদন
ডনের প্রতিবেদন

এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের প্রতিবেদনের ভাষায়, বাংলাদেশ প্রতিটি সেশনেই অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছে। ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং, তিন বিভাগেই নিজেদের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিষ্ঠিত প্রতিপক্ষের তুলনায় ভালো ছিল তারা। প্রস্তুতি ম্যাচে ৫৪ রানে অলআউট হওয়ার পরও মূল টেস্টে পূর্ণ শক্তির অস্ট্রেলিয়াকে এমনভাবে হারানোর বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পাকিস্তানের জিও সুপার শিরোনাম করেছে, ‘এশিয়ার পরাশক্তিদের পেছনে ফেলে অস্ট্রেলিয়ায় দ্রুততম টেস্টজয়ী বাংলাদেশ’। মাত্র তৃতীয় ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। পাকিস্তানের লেগেছিল সাত ম্যাচ, ভারতের ১২। শ্রীলঙ্কা ১৫ ম্যাচ খেলেও এখনো অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট জিততে পারেনি।

জিও ‍সুপারের প্রতিবেদন।
জিও ‍সুপারের প্রতিবেদন।

হাসান মাহমুদকে নিয়েও আলাদা প্রতিবেদন করেছে জিও সুপার। অস্ট্রেলিয়ায় নিজের প্রথম টেস্টে ১১১ রানে ৯ উইকেট নিয়ে পাকিস্তানের কিংবদন্তি পেসার ওয়াসিম আকরামের সঙ্গে একটি বিশেষ তালিকায় জায়গা পেয়েছেন হাসান। অস্ট্রেলিয়ায় নিজের প্রথম টেস্টে ওয়াসিম নিয়েছিলেন ১৬০ রানে ১১ উইকেট। ‘ওয়াসিম আকরামের অভিজাত তালিকায় হাসান মাহমুদ’, এমন শিরোনামেই কীর্তিটি তুলে ধরেছে পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমটি।

আজ নিউজ গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শীর্ষে থাকা অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর বিষয়টিতে। তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের চতুর্থ স্থানে উঠে আসা, প্রস্তুতি ম্যাচের ৫৪ রানের বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়ানো এবং অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর ‘সব সংস্করণ মিলিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জয়’ মন্তব্যটি জায়গা পেয়েছে।

ভারত ও পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমের নির্বাচিত প্রতিবেদনগুলোর ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা হলেও একটি জায়গায় মিল রয়েছে। কেউই এই জয়কে শুধু অঘটন হিসেবে দেখেনি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের কাঠামোগত পরিবর্তন এবং বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের সমীকরণ খুঁজেছে। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম গুরুত্ব দিয়েছে এশিয়ার অন্য দলগুলোকে পেছনে ফেলা এবং হাসানের পেস বোলিংয়ের ঐতিহাসিক তাৎপর্যে।

ডারউনে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ ও ২৮৪ রানে অলআউট করে বাংলাদেশ। তানজিদের শতকে প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রান করার পর ৫৭ রানের লক্ষ্য এক উইকেট হারিয়ে পেরিয়ে যায় শান্তর দল। হাসান দুই ইনিংস মিলিয়ে নেন ৯ উইকেট, দ্বিতীয় ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেন মিরাজ। ভারত-পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমের মূল্যায়নও তাই একই জায়গায় এসে মিলেছে, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ ইতিহাস গড়েছে যোগ্যতর দল হিসেবেই।

বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়কে যেভাবে দেখছে ভারত-পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম