এক ম্যাচের সিদ্ধান্তে হাজার কোটির হিসাব, আর্থিক চাপে পিসিবি

ভারতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্তে আইসিসি ও বিসিসিআইকে চাপে ফেলার চেষ্টা করছে পাকিস্তান—এমন ধারণা থাকলেও বাস্তবে সবচেয়ে বড় আর্থিক ধাক্কাটা উল্টো পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডকেই (পিসিবি) বহন করতে হতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মহলে জোর গুঞ্জন—ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত না হলে আইসিসির আর্থিক শাস্তি ও রাজস্ব কাটছাঁটে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে মহসিন নকভি নেতৃত্বাধীন বোর্ড।
সংবাদ সংস্থা পিটিআই ও একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৪–২০২৭ অর্থচক্রে আইসিসির কাছ থেকে পাকিস্তানের মোট প্রাপ্য রাজস্ব প্রায় ১৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় (১ ডলার =১২২ টাকা হিসাবে) দাঁড়ায় প্রায় ১৭৫৬ কোটি টাকা। বার্ষিক হিসাবে এই অঙ্ক প্রায় ৩৮ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ৪৬৩ কোটি টাকার বেশি। এই অর্থই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পিসিবির আর্থিক স্থিতি মজবুত রাখার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, ভারত–পাকিস্তান ম্যাচটি না হলে সম্প্রচারকারী সংস্থাগুলোর বড় ধরনের বাণিজ্যিক ক্ষতি হতে পারে, যার প্রভাব সরাসরি পড়বে আইসিসির রাজস্ব বণ্টনে। ফলে আইসিসি চাইলে অংশগ্রহণ চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ তুলে পাকিস্তানের প্রাপ্য অর্থের একটি অংশ আটকে রাখা বা জরিমানা আরোপের পথ বেছে নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে চলতি অর্থচক্রে পিসিবির বড় অঙ্কের রাজস্ব ঝুঁকির মুখে পড়বে।
ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সবচেয়ে বেশি দর্শকপ্রিয় ও বাণিজ্যিকভাবে মূল্যবান লড়াই হিসেবে বিবেচিত। একটি বিশ্বকাপ ম্যাচ থেকেই সম্প্রচার ও বিজ্ঞাপন মিলিয়ে আয় দাঁড়াতে পারে ২৫০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩০৫০ কোটি টাকা। এই ম্যাচগুলোই মূলত আইসিসির বৈশ্বিক আয়ের বড় অংশ নিশ্চিত করে। ফলে ম্যাচ বাতিল হলে শুধু ক্রীড়াগত নয়, অর্থনৈতিক চাপও তৈরি হয়।
আইসিসি রাজস্ব ছাড়াও পিসিবির বড় আয়ের জায়গা পাকিস্তান সুপার লিগ (পিএসএল)। নতুন দুটি ফ্র্যাঞ্চাইজি যুক্ত হওয়ায় পিএসএল থেকে বার্ষিক ফ্র্যাঞ্চাইজি ফি বাবদ বোর্ডের আয় ধরা হচ্ছে প্রায় ৪২ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ৫১২ কোটি টাকারও বেশি। সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ ও টিকিট বিক্রির আয়ের একটি বড় অংশও ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর সঙ্গে ভাগ করে নেয় বোর্ড।
তবে ব্যয়ের দিকটাও কম নয়। ঘরোয়া ক্রিকেট পরিচালনা, খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফের বেতন, প্রশাসনিক খরচ এবং প্রায় ৭০০–৮০০ কর্মচারীর বেতন-ভাতা মেটাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয় পিসিবিকে। ফলে আইসিসি রাজস্বে বড় ধরনের কাটছাঁট হলে বোর্ডের সামগ্রিক আর্থিক ভারসাম্যে চাপ পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
শাস্তির ঝুঁকি কতটা বাস্তব?
ক্রিকেট ইতিহাসে নিরাপত্তা বা রাজনৈতিক কারণে ম্যাচ ফরফিটের নজির থাকলেও নির্দিষ্ট কোনো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলতে অস্বীকৃতির ঘটনা বিরল। আইসিসি যদি এটিকে অংশগ্রহণ চুক্তি ভঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করে, তবে জরিমানা, ভবিষ্যৎ রাজস্ব আটকে দেওয়া কিংবা অন্যান্য প্রশাসনিক কড়াকড়ি আসতে পারে। যদিও এসব সিদ্ধান্ত সাধারণত তাৎক্ষণিক হয় না, তবু নজির তৈরি হলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।
সব মিলিয়ে ভারত ম্যাচ বয়কটের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টির কৌশল পাকিস্তানের জন্য কূটনৈতিক বার্তা বয়ে আনলেও অর্থনৈতিক দিক থেকে এটি ‘নিজের পায়ে কুড়াল মারা’ সিদ্ধান্তে পরিণত হতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন বেশি করে উচ্চারিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে।
সূত্র : এনডিটিভি