বিশ্বকাপে না গেলে বাংলাদেশের কী হবে

১৯৯৯ বিশ্বকাপের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ মঞ্চে দেখা যাবে না বাংলাদেশকে। নিরাপত্তা শঙ্কায় ভারতে অনুষ্ঠিতব্য আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেলার সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় বড় ধরনের কূটনৈতিক ও ক্রীড়াগত সংকটে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেট। সরকারের কড়া অবস্থানের ফলে শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অবস্থান নিয়েও প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকায় বিসিবি, জাতীয় দলের ক্রিকেটার ও সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি)) স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে বাংলাদেশ ভারতে খেলবে না।
ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, এটি সরকারের সিদ্ধান্ত এবং এতে পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই।
আইসিসি ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে জানিয়ে দিয়েছে, তারা যদি ভারতে যেতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে অন্য দলকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। অর্থাৎ, বিশ্বকাপ থেকে সরাসরি বাদ পড়ার সন্নিকটে বাংলাদেশ।
কেন এই অবস্থান?
সরকার ও বিসিবির দাবি, সম্প্রতি আইপিএলে মুস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স স্কোয়াড থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনা তাদের নিরাপত্তা উদ্বেগকে বাস্তব ভিত্তি দিয়েছে। ক্রীড়া উপদেষ্টার বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) নিজস্ব লিগেই যদি একজন বাংলাদেশি খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে বাংলাদেশের খেলোয়াড়, সমর্থক ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে সে বিষয়ে তাদের আস্থা নেই।
বাংলাদেশ চায় ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়া হোক। তবে আইসিসি সেই প্রস্তাব নাকচ করেছে এবং মুস্তাফিজ ইস্যুকে ‘একটি বিচ্ছিন্ন ও টুর্নামেন্টের সঙ্গে সম্পর্কহীন ঘটনা’ বলে উল্লেখ করেছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে গেল না সেক্ষেত্রে কী হতে পারে?
বিশ্বকাপে না খেললে কী ক্ষতি হতে পারে?
১. ক্রীড়াগত ক্ষতি
বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়া মানে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট থেকে বড় ধাক্কা। র্যাঙ্কিং, অভিজ্ঞতা এবং বড় মঞ্চে পারফরম্যান্সের সুযোগ হারাবে বাংলাদেশ।
২. আর্থিক ক্ষতি
আইসিসি টুর্নামেন্ট থেকে রাজস্ব, সম্প্রচার আয় ও বোনাসের একটি বড় অংশ আসে। বিশ্বকাপে অংশ না নিলে বিসিবি ও খেলোয়াড়দের আর্থিকভাবে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।
৩. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ ভেন্যু রাজনীতি
আইসিসির সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কোনো অনুরোধ বা নিরাপত্তাসংক্রান্ত দাবিকে গুরুত্ব দেওয়া নাও হতে পারে। এতে ভবিষ্যৎ টুর্নামেন্ট আয়োজনে বা ভেন্যু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দুর্বল অবস্থানে পড়তে পারে।
৪. খেলোয়াড়দের মনোবল ও ক্যারিয়ার প্রভাব
বিশ্বকাপ খেলতে না পারা তরুণ ও প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেটারদের জন্য বড় মানসিক ধাক্কা হতে পারে। আন্তর্জাতিক দৃশ্যপটে নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ হারাবেন অনেকেই।
খেলোয়াড়দের অবস্থান
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক জাতীয় দলের ক্রিকেটারের মনোভাব ছিল তারা বিশ্বকাপে খেলতে চান এমনটাই দাবি করেছে একাধিক সংবাদমাধ্যম। তবে সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে তাদের পক্ষে কিছু করার সুযোগ নেই। ফলে মাঠের ক্রিকেটারদের ইচ্ছা ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের মধ্যে স্পষ্ট দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে?
বর্তমান অবস্থান অনুযায়ী, যদি আইসিসি শেষ মুহূর্তে ভেন্যু পরিবর্তনে রাজি না হয়, তাহলে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে থাকছে না। এটি হবে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে অন্যতম বড় কূটনৈতিক ও ক্রীড়াগত সংকট।
এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়—বাংলাদেশ ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক অবস্থান, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা আলোচনার দৃষ্টান্ত এবং আইসিসির সঙ্গে সম্পর্ক—সবকিছুর ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।