logo
বিশ্বকাপের বাকি ১৬ দিন

যে রাতে পেনাল্টি শুটআউট বিশ্বকাপের সবচেয়ে নিষ্ঠুর পরীক্ষা হয়ে উঠল

যে রাতে পেনাল্টি শুটআউট বিশ্বকাপের সবচেয়ে নিষ্ঠুর পরীক্ষা হয়ে উঠল
১৯৮২ সালেই প্রথম দেখা যায় বিশ্বকাপে পেনাল্টি শুটআউট। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপের ইতিহাসে কিছু ম্যাচ শুধু স্কোরলাইনে আটকে থাকে না। সময়ের সঙ্গে সেগুলো হয়ে ওঠে স্মৃতি, দুঃস্বপ্ন, শিক্ষা। ১৯৮২ সালের ৮ জুলাই সেভিয়ায় ফ্রান্স ও পশ্চিম জার্মানির সেমিফাইনালও তেমনই এক ম্যাচ। কেউ সেটিকে বলে ফুটবলের মহাকাব্য, কেউ বলে ট্র্যাজেডি। আবার কারও কাছে সেটি সেই রাত, যেদিন বিশ্বকাপ প্রথমবার বুঝেছিল, ১২০ মিনিটের লড়াই শেষেও ফুটবল মানুষকে আরও নিষ্ঠুর এক পরীক্ষার সামনে দাঁড় করাতে পারে।

সেই পরীক্ষার নাম পেনাল্টি শুটআউট।

সেভিয়ার রামন সানচেজ পিজুয়ান স্টেডিয়ামে ম্যাচটি শুরু হয়েছিল দুই ইউরোপীয় শক্তির লড়াই হিসেবে। কিন্তু শেষ হতে হতে এটি হয়ে যায় বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় রাত। নির্ধারিত সময়ে ম্যাচ ১-১। অতিরিক্ত সময়ে চার গোল। শেষ পর্যন্ত স্কোর ৩-৩। তারপর টাইব্রেকার। বিশ্বকাপের মঞ্চে এর আগে এমন দৃশ্য দেখা যায়নি। পেনাল্টি শুটআউটের নিয়ম আগে থেকেই ছিল, কিন্তু বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচের ভাগ্য এর আগে কখনো এভাবে নির্ধারিত হয়নি।

ম্যাচের শুরুতে এগিয়ে যায় পশ্চিম জার্মানি। পিয়ের লিটবার্সকির গোলে ১৭ মিনিটে লিড নেয় তারা। ২৭ মিনিটে পেনাল্টি থেকে সমতা ফেরান মিশেল প্লাতিনি। প্রথমার্ধেই ম্যাচের ভিত তৈরি হয়ে যায়, কিন্তু তখনও কেউ জানত না, রাতটি কতটা দীর্ঘ হতে যাচ্ছে।

match pic
match pic

সেভিয়ার সেই রাতের সবচেয়ে অস্বস্তিকর দৃশ্য আসে দ্বিতীয়ার্ধে। ফ্রান্সের প্যাট্রিক ব্যাটিস্টন গোলের সুযোগে এগিয়ে গেলে জার্মান গোলরক্ষক হারাল্ড শুমাখারের সঙ্গে ভয়ংকর সংঘর্ষ হয় তাঁর। ব্যাটিস্টন অচেতন হয়ে পড়েন, দাঁত ভাঙে, মাঠ ছাড়তে হয়। কিন্তু শুমাখারের বিরুদ্ধে কোনো ফাউল দেওয়া হয়নি। সেই সিদ্ধান্ত আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত মুহূর্তগুলোর একটি। ফিফার স্মৃতিচারণাতেও শুমাখার-ব্যাটিস্টন সংঘর্ষকে ওই ম্যাচের অবিচ্ছেদ্য নাটকীয়তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই ঘটনা ম্যাচের আবহ বদলে দেয়। ফ্রান্সের কাছে এটি আর শুধু সেমিফাইনাল ছিল না, হয়ে ওঠে ক্ষোভ, যন্ত্রণা ও ন্যায়ের প্রশ্ন। পশ্চিম জার্মানির কাছে ছিল টিকে থাকার লড়াই। ৯০ মিনিট শেষে স্কোর ১-১। তারপর শুরু হয় অতিরিক্ত সময়, আর সেখানেই ম্যাচ ফুটবল ইতিহাসের মহাকাব্যে ঢুকে পড়ে।

germany vs france winning penalty
germany vs france winning penalty

অতিরিক্ত সময়ে ফ্রান্স যেন ফাইনালের দরজা খুলে ফেলেছিল। মারিয়ুস ত্রেজর গোল করলেন। এরপর আলাঁ জিরেসের গোলে ফ্রান্স এগিয়ে গেল ৩-১ ব্যবধানে। প্লাতিনির দল তখন ইতিহাসের খুব কাছে। কিন্তু জার্মান ফুটবলের এক পুরোনো স্বভাব আছে, তারা শেষ বাঁশির আগে মরতে জানে না। কার্ল-হাইঞ্জ রুমেনিগে ব্যবধান কমালেন। এরপর ক্লাউস ফিশারের দুর্দান্ত বাইসাইকেল কিকে স্কোর হয়ে গেল ৩-৩। ম্যাচ আবার শূন্যে ফিরে গেল, কিন্তু খেলোয়াড়দের শরীর তখন আর শূন্য থেকে শুরু করার মতো ছিল না।

১২০ মিনিট শেষে দাঁড়িয়ে রইল শুধু ক্লান্তি, উত্তেজনা আর ভয়। তারপর এলো সেই মুহূর্ত, যা বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎ বদলে দিল। প্রথমবার কোনো বিশ্বকাপ ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হবে পেনাল্টিতে। পাঁচটি করে শট, কয়েক কদম দৌড়, এক গোলরক্ষক, এক শুটার, আর পুরো জাতির নিঃশ্বাস আটকে থাকা।

ফ্রান্স শুরুতে এগিয়েছিল। জার্মানির উলি স্টিলিকের শট ঠেকিয়ে দেন ফরাসি গোলরক্ষক জ্যঁ-লুক এতোরি। কিন্তু সেই সুবিধা ধরে রাখতে পারেনি ফ্রান্স। দিদিয়ের সিক্সের শট রুখে দেন শুমাখার। এরপর চাপ আরও বেড়ে যায়। শেষ দিকে ম্যাক্সিম বোসির শটও ঠেকান শুমাখার। হোর্স্ট হ্রুবেশ শেষ পেনাল্টি গোল করলে পশ্চিম জার্মানি জেতে ৫-৪ ব্যবধানে এবং ফাইনালে উঠে যায়।

france penalty miss
france penalty miss

টাইব্রেকারকে অনেকে লটারি বলেন। কিন্তু সেভিয়ার সেই রাত দেখিয়েছিল, এটি শুধু ভাগ্য নয়; এটি স্নায়ু, ক্লান্তি, অপরাধবোধ, অপেক্ষা, ভয় এবং শারীরিক সীমার শেষ পরীক্ষা। ১২০ মিনিটের ফুটবল শেষে একজন খেলোয়াড়কে বলা হয়, এখন কয়েক সেকেন্ডে সিদ্ধান্ত নাও, তোমার দেশ কাঁদবে নাকি উদ্‌যাপন করবে।

ফ্রান্সের জন্য রাতটি ছিল ভীষণ নির্মম। তারা ম্যাচে সুন্দর ফুটবল খেলেছিল, এগিয়েছিল, ফাইনালের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। তবু শেষ পর্যন্ত বাদ পড়ল। প্লাতিনির প্রজন্মের সেই দলটি বিশ্বকাপ জিততে পারেনি, কিন্তু সেভিয়ার ম্যাচ তাদের ইতিহাসে অমর করে রাখে। কারণ কখনো কখনো পরাজয়ও এত বড় হয় যে, সেটি বিজয়ের মতোই স্মরণীয় হয়ে থাকে।

germany wins
germany wins

পশ্চিম জার্মানির জন্য এটি ছিল টিকে থাকার মহাকাব্য। ব্যাটিস্টন-ঘটনার বিতর্ক, ১-৩ পিছিয়ে পড়া, তারপর ফিরে আসা, শেষে টাইব্রেকারে জয়, সব মিলিয়ে তারা ফাইনালে গেল। যদিও ফাইনালে ইতালির কাছে হেরে যায় জার্মানি, সেভিয়ার রাত তাদের ইতিহাসে আলাদা জায়গা নিয়েই থাকে।

আজকের ফুটবলে পেনাল্টি শুটআউট খুব পরিচিত দৃশ্য। বিশ্বকাপ, ইউরো, কোপা আমেরিকা, চ্যাম্পিয়নস লিগ, বড় টুর্নামেন্টের নকআউটে এটি প্রায় স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু ১৯৮২ সালের আগে বিশ্বকাপের দর্শক এমন নিষ্ঠুর সমাপ্তি দেখেনি। সেভিয়া প্রথমবার দেখিয়েছিল, ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে একটি ম্যাচ শেষ হতে পারে এমন এক জায়গায়, যেখানে কৌশল মিলেমিশে যায় মানসিক শক্তির সঙ্গে।

২০২৬ বিশ্বকাপে দল বেড়েছে, নকআউট ম্যাচও বাড়বে। ফলে টাইব্রেকারের সম্ভাবনাও বাড়বে। নতুন প্রজন্মের কেউ হয়তো আবার রাতারাতি নায়ক হবে, কেউ আবার এক শটে ভেঙে পড়বে। কিন্তু পেনাল্টি শুটআউটের এই বিশ্বকাপ-ভয়, এই নিঃশ্বাস আটকে থাকা নাটকের প্রথম বড় অধ্যায় লেখা হয়েছিল সেভিয়ায়।