৪৮ দলের বিশ্বকাপে প্রযুক্তির পাঁচ নতুন সংযোজন

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ অনেক দিক থেকেই ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করতে যাচ্ছে। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল, ৩টি আয়োজক দেশ, ১০৪টি ম্যাচ এবং ৩৯ দিনের এক বিশাল ফুটবল উৎসবের সাক্ষী হতে যাচ্ছে বিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার যৌথ আয়োজনে হতে যাওয়া এই আসর শুধু আকারেই বড় নয়, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে এটি হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে উন্নত সংস্করণ।
ফুটবল মাঠে প্রযুক্তির ছোঁয়া নতুন কিছু নয়। গোললাইন টেকনোলজি, ভিএআর (VAR), সেমি-অটোমেটেড অফসাইডের মতো উদ্ভাবনগুলো গত এক দশকে খেলার চরিত্র বদলে দিয়েছে। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রযুক্তির এই অনুপ্রবেশ ঘটছে আরও গভীরে। চিপযুক্ত ম্যাচ বল থেকে শুরু করে ফুটবলারদের ত্রিমাত্রিক (3D) ডিজিটাল অবতার, রেফারিদের বডি ক্যামেরা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) ভিত্তিক অফসাইড সিস্টেম, এমনকি স্টেডিয়ামের নিরাপত্তায় রোবট কুকুর—সব মিলিয়ে এবারের বিশ্বকাপ রূপ নিতে যাচ্ছে প্রযুক্তি ও ফুটবলের এক মহাপরীক্ষাগারে।
সেন্সরযুক্ত ম্যাচ বল ‘ত্রিয়েন্দা’
২০২৬ বিশ্বকাপের অফিশিয়াল ম্যাচ বলের নাম রাখা হয়েছে ‘ত্রিয়েন্দা’ (Trienda)। স্প্যানিশ শব্দ থেকে নেওয়া এই নামের অর্থ ‘তিন ঢেউ’, যা মূলত তিন আয়োজক দেশের প্রতীকী ইঙ্গিত বহন করে। তবে এই বলের আসল আকর্ষণ লুকিয়ে আছে এর ভেতরে।
বলটির ভেতরে বসানো থাকবে একটি ছোট ইনার্শিয়াল মেজারমেন্ট ইউনিট বা ‘আইএমইউ’ (IMU) সেন্সর চিপ। এই চিপ প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার বলের গতি, ঘূর্ণন এবং ত্রিমাত্রিক অবস্থান সম্পর্কিত নিখুঁত ডেটা পাঠাবে। সহজ কথায়, মাঠে বলটি ঠিক কোন মুহূর্তে কোথায় আছে, তা রিয়াল টাইমে জানা যাবে। এই ডেটা সরাসরি যুক্ত থাকবে ভিএআর সিস্টেমের সঙ্গে। ফলে অফসাইডের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পাসের সঠিক মুহূর্তটি মিলি সেকেন্ডের সুক্ষ্মতায় চিহ্নিত করা সম্ভব হবে, যা রেফারিদের কাজ অনেকটাই সহজ করে দেবে।
এআই প্রযুক্তিতে খেলোয়াড়দের থ্রিডি অবতার
এই বিশ্বকাপে শুধু বল নয়, খেলোয়াড়দের শরীরও হয়ে উঠবে প্রযুক্তির অংশ। ফিফা ও লেনোভোর যৌথ উদ্যোগে এবার ব্যবহৃত হচ্ছে ‘এআই-এনাবলড থ্রিডি প্লেয়ার অ্যাভাটার’। বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া প্রতিটি ফুটবলারকে মাত্র এক সেকেন্ডে ডিজিটাল স্ক্যান করে তৈরি করা হবে তাঁদের হুবহু ত্রিমাত্রিক ডিজিটাল প্রতিরূপ বা মডেল।
এই মডেলের মাধ্যমে তীব্র গতির দৌড়, জটলার ভেতর খেলোয়াড়দের অবস্থান কিংবা জটিল মুভমেন্টের সময়ও নিখুঁত ট্র্যাকিং করা যাবে। এটি মূলত সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তিকে শতভাগ নির্ভুল করতে সাহায্য করবে। শুধু রেফারি বা মাঠের কর্মকর্তারা নন, গ্যালারি ও টিভির দর্শকরাও স্টেডিয়ামের জায়ান্ট স্ক্রিনে এই থ্রিডি অ্যানিমেশনের মাধ্যমে অফসাইডের সিদ্ধান্তগুলো আরও স্পষ্ট ও আকর্ষণীয়ভাবে দেখতে পাবেন।
রেফারির চোখে ম্যাচ দেখার রোমাঞ্চ
২০২৬ বিশ্বকাপের ১০৪টি ম্যাচেই রেফারিদের শরীরে বিশেষ 'বডি ক্যামেরা' ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। বিভিন্ন শীর্ষ লিগে পরীক্ষামূলক ব্যবহারের পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপের মতো মহোৎসবে এটি দেখা যাবে।
রেফারির এই ক্যামেরা দর্শকদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতা নিয়ে আসবে। মাঠে কোনো ফাউল, খেলোয়াড়দের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় বা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহূর্তে রেফারি ঠিক কী দেখছেন, তা দর্শকরা সরাসরি টিভি পর্দায় দেখতে পাবেন। এতে ফুটবল সম্প্রচার আরও জীবন্ত ও রোমাঞ্চকর হয়ে উঠবে।
নিরাপত্তার দায়িত্বে রোবট কুকুর

মেক্সিকোর মনতেরেই অঞ্চলের স্টেডিয়াম ও আশপাশের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যুক্ত হচ্ছে চার পায়ের রোবট কুকুর (Animaloid Robot)। মেক্সিকোর গুয়াদালুপে শহর কর্তৃপক্ষ প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার ডলার ব্যয়ে এই বিশেষ রোবট ইউনিট প্রস্তুত করেছে। এগুলো মূলত মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বা সংকীর্ণ এলাকায় ঢুকে লাইভ ভিডিও পাঠাতে সক্ষম। বিশ্বকাপ চলাকালীন কোনো গণ্ডগোল বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে মাঠের পুলিশ সদস্যদের ব্যাকআপ দিতে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের কাজ করবে এই যান্ত্রিক কুকুরগুলো।
আরও নিখুঁত সেমি-অটোমেটেড অফসাইড
অফসাইড নিয়ে বিতর্ক ফুটবলের চিরন্তন অনুষঙ্গ। আধুনিক প্রযুক্তি এবার সেই বিতর্ককে প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে। কাতার বিশ্বকাপের চেয়েও উন্নত সংস্করণের সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি দেখা যাবে এই বিশ্বকাপে।

আগের সিস্টেমে সাধারণত ৫০ সেন্টিমিটার বা তার বেশি অফসাইড থাকলে দ্রুত সংকেত মিলত। এবার মাত্র ১০ সেন্টিমিটারের ব্যবধান থাকলেও সিস্টেমটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধরে ফেলবে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, মাঠের রেফারিরা সরাসরি তাঁদের ইয়ারপিসে রিয়াল-টাইম অডিও অ্যালার্ট পেয়ে যাবেন। ফলে সহকারী রেফারিদের আর দীর্ঘক্ষণ অফসাইডের পতাকা নামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। তবে এই প্রযুক্তি শুধু খেলোয়াড়দের অবস্থানের (Positional Offside) হিসাব দেবে; সেই খেলোয়াড়টি খেলায় সক্রিয় প্রভাব (Active Play) ফেলেছেন কি না, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি কিন্তু রক্ত-মাংসের রেফারিকেই নিতে হবে।
বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন বিরতি

উত্তর আমেরিকার কড়া গ্রীষ্মে এবারের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হওয়ায় ফুটবলারদের ক্লান্তি ও গরম বড় চিন্তার কারণ। তাই খেলোয়াড়দের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে আবহাওয়া যেমনই হোক না কেন, ম্যাচের প্রতি অর্ধে বাধ্যতামূলক ৩ মিনিটের ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ বা পানি পানের বিরতি রাখা হয়েছে। সাধারণত প্রতি অর্ধে খেলা ২২ মিনিটে গড়ালে রেফারি এই বিরতির বাঁশি বাজাবেন।
সেন্সরযুক্ত বল, এআই অবতার, বডি ক্যামেরা কিংবা রোবট কুকুর—২০২৬ বিশ্বকাপকে যতই প্রযুক্তির চাদরে ঢাকা হোক না কেন, ফুটবলের আসল সৌন্দর্য কিন্তু তার চিরায়ত আবেগেই মিশে থাকবে। প্রযুক্তি হয়তো ভুল কমাতে পারে, নিখুঁত সিদ্ধান্ত দিতে পারে; কিন্তু মাঠের দুর্দান্ত গোল, চোখধাঁধানো পাস, রেফারির মানবিক ভুল, ডাগআউটের কোচের মাথায় হাত আর গ্যালারির কোটি সমর্থকের কান্না-হাসির যে নাটক, তার স্ক্রিপ্ট কেবল মানুষই লিখতে পারে। প্রযুক্তির এই মহাসমারোহের মাঝেও তাই ফুটবলই থাকবে স্বমহিমায়, অনন্য।