logo

বিশ্বকাপে বড় অঘটন, অভিষেকেই স্পেনকে রুখে দিল কেপ ভার্দে

বিশ্বকাপে বড় অঘটন, অভিষেকেই স্পেনকে রুখে দিল কেপ ভার্দে
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপ শুরুর আগে স্পেন ছিল শিরোপার অন্যতম দাবিদার। দলে তারুণ্য, মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণে গতি, বেঞ্চে লামিনে ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসের মতো অস্ত্র। কিন্তু আটলান্টায় বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই সেই স্পেনকে থামিয়ে দিল অভিষিক্ত কেপ ভার্দে। স্কোরলাইন ০-০। সংখ্যায় স্পেনের একতরফা দাপট, মাঠে অস্বস্তি আর শেষে বড় প্রশ্ন—এটাই কি বিশ্বকাপ জয়ের ফেভারিট দল?

পরিসংখ্যান বলছে, ম্যাচটা স্পেনের হওয়া উচিত ছিল। বল দখল ৭৪.২ শতাংশ। মোট শট ২৭টি। লক্ষ্যে ছিল ৭টি। প্রত্যাশিত গোল ২.২৯। সম্পন্ন পাস ৮০১। শেষ তৃতীয়াংশে পাস ৪৪৩। কেপ ভার্দের বল দখল মাত্র ২৫.৮ শতাংশ, প্রত্যাশিত গোল ০.৩০, সম্পন্ন পাস ২৭৯। কিন্তু ফুটবলে সব সংখ্যা শেষ পর্যন্ত স্কোরবোর্ডে গিয়ে থামে। আর সেখানে স্পেনের পাশে ছিল শূন্য।

দে লা ফুয়েন্তের দল ম্যাচ শুরু করেছিল বল দখল করেই। কিন্তু শুরু থেকেই স্পেনের খেলায় সেই স্বাভাবিক ছন্দ ছিল না। বল এক পাশ থেকে আরেক পাশে গেছে, পাসের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু কেপ ভার্দের নিচু রক্ষণ ভাঙার মতো গতি বা সৃজনশীলতা ছিল না। অনেক সময় আইমেরিক লাপোর্তের লম্বা বলের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে স্পেনকে—যা স্পেনের স্বাভাবিক ফুটবল-পরিচয়ের সঙ্গে খুব মানানসই নয়।

গাভিকে বাঁ প্রান্তে ব্যবহার করার সিদ্ধান্তও প্রশ্ন তুলেছে। গাভির শক্তি চাপ প্রয়োগ, তীব্রতা, মাঝমাঠের আগ্রাসন। কিন্তু উইংয়ে গিয়ে তিনি কাঙ্ক্ষিত প্রভাব রাখতে পারেননি। কেপ ভার্দের রক্ষণ ছিল নিচু, ঘন এবং শারীরিকভাবে শক্তিশালী। এমন রক্ষণ ভাঙতে দরকার ছিল দ্রুত বল ঘোরানো বা একক নৈপুণ্য। স্পেনের খেলায় দুটিরই ঘাটতি ছিল।

প্রথম আধঘণ্টায় কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়াকে খুব বেশি পরীক্ষা দিতে হয়নি। স্পেন বল রেখেছে, কিন্তু বিপজ্জনক হয়নি। একসময় সতর্ক সংকেতও দেখা যায়। রদ্রি, যাঁকে সাধারণত নিরাপত্তার প্রতীক বলা যায়, প্রথম দিকেই কয়েকবার বল হারান। সেই অস্বস্তি যেন পুরো দলের খেলাতেই ছড়িয়ে পড়ে।

স্পেনের সবচেয়ে বড় সুযোগ আসে প্রথমার্ধের শেষ দিকে। কুকুরেয়ার দারুণ উঠে এসে হেডে বল নামিয়ে দেওয়া থেকে ফেরান তোরেস প্রায় গোল করেই ফেলেছিলেন। কিন্তু তাঁর কাছ থেকে নেওয়া শট লাগে ক্রসবারে। ফিরতি বলে মিকেল ওয়ারজাবালের হেডও ঠেকিয়ে দেন ভোজিনিয়া। পরে ফেরান ও লাপোর্তেও সুযোগ পান, কিন্তু গোল আর আসে না।

ভোজিনিয়া হয়ে ওঠেন কেপ ভার্দের দেয়াল। শুধু সেভ নয়, তাঁর উপস্থিতিই স্পেনের আক্রমণভাগকে অস্থির করে তোলে। পেদ্রির শট, লাপোর্তের হেড, ফাবিয়ান রুইসের চেষ্টা, ওয়ারজাবালের সুযোগ—সবকিছুর সামনে কখনো ভোজিনিয়া, কখনো পিকো লোপেস, কখনো কেপ ভার্দের রক্ষণের শরীর।

দ্বিতীয়ার্ধে স্পেনের অস্থিরতা আরও বাড়ে। পাসের ভুল, একই জায়গায় একাধিক খেলোয়াড়, শেষ তৃতীয়াংশে সিদ্ধান্তহীনতা—সব মিলিয়ে ম্যাচটা ধীরে ধীরে কেপ ভার্দের পছন্দের দিকে যেতে থাকে। তারা আরও নিচে নামে, জায়গা বন্ধ করে, প্রতিটি বলের জন্য লড়াই করে। ড্রয়ের সম্ভাবনা যত বাস্তব হয়, তাদের আত্মবিশ্বাসও তত বাড়ে।

৭১ মিনিটে দে লা ফুয়েন্তে নামান লামিনে ইয়ামালকে। সঙ্গে আসেন মিকেল মেরিনো। গাভি ও ফাবিয়ান রুইস উঠে যান। একটি দেশের প্রত্যাশা যেন তখন ১৮ বছর বয়সী এক ফুটবলারের কাঁধে। ইয়ামাল মাঠে নামতেই গ্যালারিতে উচ্ছ্বাস আসে, স্পেনের খেলাতেও কিছুটা গতি ফেরে। কিন্তু তাও যথেষ্ট হয়নি।

ইয়ামাল প্রথম দিকেই একটি আক্রমণ তৈরি করেন। তাঁর মুভ থেকে লরেন্তে বল ফেরান মেরিনোর দিকে, কিন্তু শট ভোজিনিয়ার হাতে যায়। পরে নিকো উইলিয়ামসও নামেন। দানি ওলমোও আসেন। কিন্তু কেপ ভার্দের রক্ষণ ভাঙার মতো শেষ মুহূর্তের মুন্সিয়ানা কেউ দেখাতে পারেননি।

ওয়ারজাবালের রাতটি স্পেনের হতাশার প্রতীক হয়ে থাকবে। ম্যাচের শুরুর দীর্ঘ সময় তিনি প্রায় খেলার বাইরে ছিলেন। পরে সুযোগ পেলেও ফিনিশিংয়ে ব্যর্থ। এএসের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়, প্রথম ৩০ মিনিটে তিনি বল স্পর্শই করতে পারেননি—একজন স্ট্রাইকারের জন্য যা ভয়াবহ সংকেত।

শেষ দিকে কুকুরেয়ার নিচু হেড ভোজিনিয়া ধরে ফেলেন। রদ্রির শট বাইরে যায়। ৮৮ মিনিটে দানি ওলমোর ক্রসে ওয়ারজাবাল প্রায় গোলের সামনে পৌঁছে গিয়েছিলেন, কিন্তু পিকো লোপেস আবারও কেপ ভার্দেকে বাঁচান। শেষ বাঁশি বাজার পর কেপ ভার্দের খেলোয়াড়দের উল্লাসই বলে দিচ্ছিল, তাদের কাছে এই ড্র জয়ের সমান।

স্পেনের জন্য এটি শুধু দুই পয়েন্ট হারানো নয়। এটি আত্মবিশ্বাসে ধাক্কা। বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে প্রথম ম্যাচ সব সময় চাপের। কিন্তু কাগজে-কলমে অনেক পিছিয়ে থাকা কেপ ভার্দের বিপক্ষে ২৭ শট নিয়েও গোল না পাওয়া বড় সতর্কবার্তা। বিশেষ করে সামনে যখন সৌদি আরব ও উরুগুয়ের মতো ভিন্ন ধাঁচের প্রতিপক্ষ আছে।

কেপ ভার্দে দেখাল, বিশ্বকাপে নবাগত মানেই দুর্বল নয়। প্রথম বিশ্বকাপ, প্রথম ম্যাচ, সামনে স্পেন—তবু তারা ভয় পায়নি। নিজেদের সীমাবদ্ধতা বুঝে খেলেছে, রক্ষণে শৃঙ্খলা রেখেছে, গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার অনুপ্রেরণাদায়ী পারফরম্যান্সে ইতিহাস লিখেছে।

স্পেনের প্রশ্ন এখন অনেক। গাভিকে উইংয়ে ব্যবহার করা কি ভুল ছিল? ইয়ামালকে শুরু থেকে খেলানো উচিত ছিল কি? ওয়ারজাবাল কি এই ম্যাচের জন্য সঠিক পছন্দ ছিলেন? ৮০১ পাস করেও যদি গোল না আসে, তাহলে বল দখলভিত্তিক ফুটবলের কার্যকারিতা কোথায়?

প্রথম ম্যাচেই স্পেন বুঝে গেল, বিশ্বকাপ কাগজের হিসাব মানে না। ফেভারিট তকমা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পূর্বাভাস, স্কোয়াডের বাজারমূল্য—সবকিছু মাঠে এসে নতুন করে প্রমাণ করতে হয়।

আটলান্টায় স্পেন বল রেখেছে, পাস দিয়েছে, শট নিয়েছে। কিন্তু কেপ ভার্দে ইতিহাস লিখেছে।