লাল কার্ডের ম্যাচের পর আলোচনায় ফিফার নতুন কার্ডনীতি

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেই তিনটি লাল কার্ড দেখে ফুটবলপ্রেমীরা চমকে গেছেন। মেক্সিকো-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে ব্রাজিলিয়ান রেফারি উইলটন সাম্পাইও তিনজনকে মাঠ থেকে বের করে দেন। তবে লাল কার্ডের এই কঠোর শুরু সত্ত্বেও ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের শুধু হলুদ কার্ড জমে ফাইনাল মিস করার আশঙ্কা আগের তুলনায় কমে গেছে।
কারণ, এবারের বিশ্বকাপে হলুদ কার্ডের ক্ষেত্রে বাড়তি মওকুফের নিয়ম চালু করেছে ফিফা। এর ফলে শুধু একটি হলুদ কার্ডের বোঝা নিয়ে পুরো টুর্নামেন্ট এগিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমবে।
বিশ্বকাপ বা বড় টুর্নামেন্টে সাধারণ নিয়ম হলো, আলাদা দুই ম্যাচে দুটি হলুদ কার্ড দেখলে একজন খেলোয়াড়কে এক ম্যাচ নিষিদ্ধ থাকতে হয়। অতীতে এই নিয়ম অনেক বড় হৃদয়ভাঙা গল্প তৈরি করেছে।
২০০২ বিশ্বকাপে জার্মানির মাইকেল ব্যালাক সেমিফাইনালে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে হলুদ কার্ড দেখেছিলেন। সেটি ছিল টুর্নামেন্টে তাঁর দ্বিতীয় হলুদ কার্ড। ফলে ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাইনালে খেলতে পারেননি জার্মানির মাঝমাঠের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। ব্যালাককে ছাড়া জার্মানি সেই ফাইনাল ২-০ গোলে হেরেছিল।
১৯৯০ বিশ্বকাপেও এমন ঘটনা ঘটেছিল আর্জেন্টিনার ক্লদিও কানিজিয়ার সঙ্গে। ইতালির বিপক্ষে সেমিফাইনালে গোল করে আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে ফিরিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু একই ম্যাচে হলুদ কার্ড দেখে ফাইনাল থেকে ছিটকে যান। পরে জার্মানির কাছে ফাইনাল হারে আর্জেন্টিনা।
২০১০ বিশ্বকাপ থেকে ফিফা নিয়ম বদলায়। কোয়ার্টার ফাইনালের পর হলুদ কার্ডের হিসাব মুছে দেওয়া শুরু হয়। এতে সেমিফাইনালে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখলেও কোনো খেলোয়াড় শুধু কার্ড জমার কারণে ফাইনাল মিস করতেন না।
২০২৬ বিশ্বকাপে ফিফা আরও এক ধাপ এগিয়েছে। এবার হলুদ কার্ডের হিসাব দুই দফা মুছে যাবে। প্রথমবার গ্রুপ পর্ব শেষে। কোনো খেলোয়াড় গ্রুপ পর্ব শেষে একটি হলুদ কার্ড নিয়ে থাকলে নকআউট পর্বে তিনি নতুনভাবে শুরু করবেন। তাঁর সেই একক হলুদ কার্ড আর বহন করা হবে না।
দ্বিতীয়বার হিসাব মুছে যাবে কোয়ার্টার ফাইনালের পর। ৪৮ দলের নতুন ফরম্যাটে নকআউট পর্ব শুরু হবে শেষ ৩২ দিয়ে। সেই হিসাবে কোয়ার্টার ফাইনাল হবে তৃতীয় নকআউট ধাপ। কোয়ার্টারের পর আবার হলুদ কার্ডের হিসাব মুছে গেলে সেমিফাইনালের আগে খেলোয়াড়দের ওপর ফাইনাল মিসের চাপ অনেকটাই কমে যাবে।
তবে এর মানে এই নয় যে, কার্ডের শাস্তি উঠে যাচ্ছে। লাল কার্ড দেখলে এখনো স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্তত এক ম্যাচ নিষেধাজ্ঞা থাকবে। গুরুতর ফাউল বা সহিংস আচরণের ক্ষেত্রে ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি শাস্তি বাড়াতেও পারে।
একইভাবে, কোনো খেলোয়াড় গ্রুপ পর্বের মধ্যেই দুটি হলুদ কার্ড দেখলে তিনি নিষিদ্ধ হবেন। আবার শেষ ৩২ থেকে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দুটি হলুদ কার্ড পেলেও নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। নতুন নিয়ম মূলত একটি হলুদ কার্ডের ভার পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে বহন করার ঝুঁকি কমাবে।
২০২৬ বিশ্বকাপ প্রথমবার ৪৮ দল নিয়ে হচ্ছে। ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৪-এ। দলগুলোকে শিরোপা জিততে আগের চেয়ে বেশি ম্যাচ খেলতে হবে। এমন দীর্ঘ টুর্নামেন্টে কার্ড জমার ঝুঁকিও বেশি। তাই ফিফার নতুন নিয়ম খেলোয়াড় ও দলগুলোর জন্য স্বস্তি হয়ে আসতে পারে।
মেক্সিকো-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে তিন লাল কার্ড দেখে মনে হতে পারে এবারের বিশ্বকাপ কার্ডের দিক থেকে কঠোর হতে যাচ্ছে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে পুরো টুর্নামেন্টে যত লাল কার্ড দেখা গিয়েছিল, উদ্বোধনী ম্যাচেই তার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে ২০২৬ বিশ্বকাপ।
তবে হলুদ কার্ডের ক্ষেত্রে ফিফা এবার তুলনামূলক নমনীয় পথ নিয়েছে। উদ্দেশ্য পরিষ্কার—ব্যালাক বা কানিজিয়ার মতো বড় খেলোয়াড়দের শুধু কার্ড জমার কারণে ফাইনাল থেকে ছিটকে যাওয়ার সম্ভাবনা কমানো।
