প্রতিবাদের মধ্যেও সব ইরানির জন্য খেলতে চান তারেমিরা

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচের আগে ইরান ফুটবল দলের সংবাদ সম্মেলন সাধারণ ফুটবল আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে কোচ আমির গালেনোই ও দলের বড় তারকা মেহদি তারেমির কথায় উঠে এসেছে যুদ্ধের আবহ, প্রবাসী ইরানিদের ক্ষোভ, ভিসা জটিলতা, নিরাপত্তা এবং জাতীয় দলের অস্বস্তিকর অবস্থান। এত কিছুর মধ্যেও তাদের বার্তা পরিষ্কার, ইরান দল খেলতে চায় সব ইরানির জন্য।
লস অ্যাঞ্জেলেসে গ্রুপ ‘জি’র প্রথম ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হবে ইরান। কিন্তু ম্যাচের আগে আলোচনার কেন্দ্র শুধু ফুটবল নয়। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা, ইরান সরকারের বিরুদ্ধে প্রবাসীদের প্রতিবাদ এবং বিশ্বকাপ ঘিরে রাজনৈতিক চাপ ইরানের প্রস্তুতিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে তারেমি বলেন, ইরান দল দেশের ভেতরে থাকা ইরানিদের যেমন সম্মান করে, তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসী ইরানিদেরও সম্মান করে। তার কথায়, বহু বছর ধরে ইরান একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি, আর বিশ্বকাপের মঞ্চে সেই ঐক্যই দেখাতে চান তারা।
তারেমির বার্তাটি ছিল আবেগঘন। তিনি বলেন, ইরান দল বিশ্বকাপে এসেছে ইরানিদের আনন্দ দেওয়ার জন্য, তারা যেখানেই থাকুন। মাঠের বাইরে রাজনৈতিক বিভাজন যতই থাকুক, ফুটবল দল নিজেদের দেশের মানুষের জন্য খেলতে চায় বলেই জানালেন তিনি।
কোচ গালেনোইও একই সুরে কথা বলেছেন। কঠিন পরিস্থিতিকে সুযোগে বদলে নেওয়ার অভ্যাস ইরানিদের আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, দল অন্য কিছু ভাবছে না; তাদের লক্ষ্য মানুষকে আনন্দ দেওয়া। বাকিটা আল্লাহর হাতে।
তবে এই বিশ্বকাপ ইরানের জন্য স্বাভাবিক নয়। সাধারণত বিশ্বকাপ মানে উৎসব, রং, গান, পতাকা, সমর্থকদের মিলনমেলা। কিন্তু ইরান দলের ক্ষেত্রে সেই আনন্দ অনেকটাই চাপা। দল যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছে এমন এক সময়ে, যখন সামরিক উত্তেজনা, শান্তি উদ্যোগের খবর এবং প্রবাসী ইরানিদের প্রতিবাদ একসঙ্গে সামনে এসেছে।
লস অ্যাঞ্জেলেসে ইরানের ম্যাচ ঘিরে প্রতিবাদের সম্ভাবনা আগেই ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের এই শহরে ইরানের বাইরে সবচেয়ে বড় ইরানি কমিউনিটির বাস। তাদের একটি অংশ ইরান সরকারের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষুব্ধ। ম্যাচের আগে স্টেডিয়ামের আশপাশে প্রতিবাদ হয়েছে, ম্যাচের দিনও স্টেডিয়ামের বাইরে ও ভেতরে প্রতিবাদ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিবাদকারীদের অনেকে ইরানের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছেন। কেউ কেউ জাতীয় দলের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়েও আপত্তি তুলছেন। তাদের দাবি, ইরান সরকার ফুটবলকে নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষার উপায় হিসেবে ব্যবহার করছে। আবার প্রবাসী ইরানিদের আরেক অংশ দলকে সমর্থন জানাতে চায়, কারণ তাদের কাছে জাতীয় দল দেশের মানুষের আবেগের প্রতীক।
এই দ্বন্দ্বই ইরান দলের অবস্থানকে জটিল করে তুলেছে। একদিকে তারা দেশের প্রতিনিধিত্ব করছে, অন্যদিকে সেই দেশের শাসনব্যবস্থা নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন। তারেমি ও গালেনোই তাই সরাসরি রাজনৈতিক মন্তব্যে না গিয়ে ‘সব ইরানি’ শব্দটির ওপর জোর দিয়েছেন। তাদের বার্তায় ছিল বিভক্তির বদলে ঐক্যের আবেদন।
ইরানের প্রস্তুতিতেও বাধা কম ছিল না। দলকে যুক্তরাষ্ট্রে পূর্ণ সময় থাকতে দেওয়া হচ্ছে না। ম্যাচের মাঝের সময় তাদের বেস ক্যাম্প রাখতে হচ্ছে মেক্সিকোতে। কিছু স্টাফ যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারেননি। ফলে যাতায়াত, নিরাপত্তা এবং ম্যাচ প্রস্তুতি—সব কিছুতেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ ফুটবল আলোচনা অনেকটাই পেছনে চলে গেছে। একাদশ, খেলার ছক, প্রতিপক্ষ বিশ্লেষণ, খেলোয়াড়দের ফিটনেস—এসব নিয়েও কথা হয়েছে, তবে সংবাদ সম্মেলনের বড় অংশ জুড়ে ছিল রাজনৈতিক আবহ ও দলের মানসিক অবস্থা।
তবু মাঠের লড়াই ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তারা কখনো বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব পার হতে পারেনি। এবার গ্রুপে আছে নিউজিল্যান্ড, মিসর ও বেলজিয়াম। কাগজে-কলমে বেলজিয়াম সবচেয়ে শক্তিশালী দল। তাই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে জয় না পেলে ইরানের নকআউট স্বপ্ন শুরুতেই কঠিন হয়ে যাবে।
ইরানের জন্য আরেক বড় আলোচনার বিষয় সর্দার আজমুনের অনুপস্থিতি। ৯১ ম্যাচে ৫৭ গোল করা এই ফরোয়ার্ড চূড়ান্ত দলে নেই। তাঁর অনুপস্থিতি ইরানের আক্রমণভাগে বড় শূন্যতা তৈরি করেছে। ফলে তারেমির ওপর দায়িত্ব আরও বেড়েছে। তিনি শুধু দলের বড় নাম নন, এখন এই রাজনৈতিক চাপের মাঝেও মাঠে নেতৃত্ব দেওয়ার মুখ।
গালেনোইকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, স্টেডিয়ামে প্রাক্-বিপ্লবী ইরানের পতাকা বা সরকারবিরোধী স্লোগান দেখা গেলে দল খেলা থামানোর কথা ভাববে কি না। তিনি সরাসরি উত্তর দেননি। বরং বলেছেন, তাঁর খেলোয়াড়েরা মনোযোগ সরিয়ে নেওয়ার মতো বিষয়গুলো উপেক্ষা করতে জানে।
এই উত্তরই ইরান দলের অবস্থান বুঝিয়ে দেয়। তারা বিতর্কে ঢুকতে চায় না। তারা মাঠে খেলতে চায়। কিন্তু এই বিশ্বকাপে ইরানের পক্ষে মাঠের বাইরের বাস্তবতা থেকে পুরোপুরি দূরে থাকা প্রায় অসম্ভব।
নিউজিল্যান্ড ম্যাচ তাই শুধু তিন পয়েন্টের লড়াই নয়। এটি ইরান দলের জন্য নিজেদের অবস্থান জানানোর ম্যাচ। তারা কি রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও ফুটবলে মনোযোগ রাখতে পারবে? প্রবাসী ইরানিদের একাংশের ক্ষোভের মাঝেও কি সমর্থন পাবে? মাঠের ফল কি অন্তত কিছু সময়ের জন্য বিভক্তির ওপর আনন্দের আবরণ দিতে পারবে?
