logo
বিশ্বকাপের বাকি ৯ দিন

যে ম্যাচে রেফারির সিদ্ধান্ত পাল্টে দিয়েছিলেন এক রাজপুত্র

যে ম্যাচে রেফারির সিদ্ধান্ত পাল্টে দিয়েছিলেন এক রাজপুত্র
ম্যাচের সেই বিতর্কিত মুহূর্ত। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপে রেফারির ভুল নতুন কিছু নয়। অফসাইড নিয়ে বিতর্ক হয়েছে, পেনাল্টি নিয়ে ক্ষোভ হয়েছে, গোললাইন নিয়ে তর্ক হয়েছে, হাত দিয়ে গোল হয়েছে, হাত দিয়ে গোল বাঁচানোও হয়েছে। কিন্তু এমন ঘটনা খুব কমই আছে, যেখানে গ্যালারি থেকে একজন কর্মকর্তা নেমে এলেন মাঠে, রেফারির সঙ্গে তর্ক করলেন, দল তুলে নেওয়ার হুমকি দিলেন, আর শেষ পর্যন্ত গোলই বাতিল হয়ে গেল।

১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপে ফ্রান্স-কুয়েত ম্যাচে ঠিক সেটিই ঘটেছিল। ঘটনাটি এতটাই অদ্ভুত যে, আজকের ভিএআর যুগে দাঁড়িয়ে তা প্রায় অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু তখন বিশ্বকাপ দেখেছিল এক বিরল দৃশ্য: রেফারির সিদ্ধান্ত মাঠের ফুটবল নয়, মাঠের বাইরের প্রভাবেও বদলে যেতে পারে।

ম্যাচটি ছিল গ্রুপ পর্বে। ফ্রান্স ছিল শক্তিশালী দল, মিশেল প্লাতিনির প্রজন্ম তখন ইউরোপীয় ফুটবলে বড় শক্তি হয়ে উঠছে। অন্যদিকে কুয়েত খেলছিল নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ। ফুটবল ইতিহাসে সেই উপস্থিতিই তাদের জন্য বড় অর্জন ছিল। কিন্তু ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত তাদের ফুটবলের জন্য নয়, এক অবিশ্বাস্য বিতর্কের জন্য অমর হয়ে থাকে।

ফ্রান্স তখন ৩-১ গোলে এগিয়ে। ম্যাচের ৮০ মিনিটের দিকে আলাঁ জিরেস বল পেয়ে কুয়েতের স্থির হয়ে থাকা রক্ষণের সামনে দিয়ে সহজেই গোল করেন। ফরাসিরা উদ্‌যাপন শুরু করে। কিন্তু কুয়েতের খেলোয়াড়রা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করেন। তাঁদের দাবি, গ্যালারি থেকে বাঁশির শব্দ এসেছিল, সেটিকে রেফারির বাঁশি ভেবে তাঁরা খেলা থামিয়ে দিয়েছিলেন। সেই সুযোগেই ফ্রান্স গোল করেছে।

প্রথমে রেফারি মিরোস্লাভ স্তূপার গোল দিয়েছিলেন। স্বাভাবিক নিয়মে সেটিই থাকার কথা। দর্শকের বাঁশি শুনে খেলোয়াড় থেমে গেলে দায় রেফারির নয়; খেলা চলতে থাকলে খেলতে হয়। কিন্তু এখানেই ম্যাচটি সাধারণ বিতর্ক থেকে বিশ্বকাপের অদ্ভুত ইতিহাসে ঢুকে যায়।

কুয়েত ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শেখ ফাহাদ আল-আহমাদ আল-সাবাহ গ্যালারি থেকে নেমে আসেন মাঠে। তিনি ছিলেন তৎকালীন কুয়েতি আমিরের ভাইও। মাঠে এসে তিনি রেফারির সঙ্গে তর্ক করেন এবং খেলোয়াড়দের মাঠ ছাড়ার ইঙ্গিত দেন। বিবিসির বিবরণ অনুযায়ী, দীর্ঘ বিরতির পর রেফারি নিজের সিদ্ধান্ত পাল্টে গোল বাতিল করেন। পরে ফ্রান্স অবশ্য আরেকটি গোল করে ম্যাচ জেতে ৪-১ ব্যবধানে।

match is remembered for this bizzare antic
match is remembered for this bizzare antic

এই সিদ্ধান্তে ফরাসিরা ক্ষুব্ধ হয়েছিল, হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ মাঠে গোল হয়েছে, রেফারি প্রথমে গোল দিয়েছেন, তারপর বাইরের একজন কর্মকর্তা এসে প্রতিবাদ করলেন, আর সিদ্ধান্ত বদলে গেল। বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে এমন দৃশ্য ছিল প্রায় অকল্পনীয়।

আরব নিউজের বিবরণেও ঘটনাটিকে কুয়েতের ফুটবল স্মৃতির এক দুঃস্বপ্ন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে; সেখানে বলা হয়েছে, জিরেসের গোল বাতিল হলেও ম্যাচের শেষ দিকে ফ্রান্স আবার গোল করে ৪-১ জয় নিশ্চিত করে।

ঘটনাটির সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিক ছিল ক্ষমতার উপস্থিতি। মাঠে ২২ জন খেলোয়াড়, একজন রেফারি, সহকারী রেফারি, নিয়ম সবই ছিল। কিন্তু এক মুহূর্তে মনে হলো, গ্যালারির এক প্রভাবশালী ব্যক্তি নেমে এসে ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন। ফুটবলের ভেতরে রাজনীতি, প্রভাব, মর্যাদা সবকিছু যেন কয়েক মিনিটের মধ্যে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

রেফারি স্তূপারের জন্যও এটি ছিল বড় ধাক্কা। বিভিন্ন বিবরণে এসেছে, এই ঘটনার পর তাকে আর বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়নি। শেখ ফাহাদকেও জরিমানা করা হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ আছে। কিন্তু এসব শাস্তির পরও ঘটনাটির অস্বস্তি মুছে যায়নি। কারণ গোল বাতিল হয়ে যাওয়ার মুহূর্তটি টিকে থাকে ফুটবল স্মৃতিতে।

কুয়েতের দিক থেকেও বিষয়টি পুরোপুরি সরল নয়। তারা ছিল বিশ্বকাপের নতুন দল, বড় মঞ্চে চাপ ছিল প্রবল। গ্যালারি থেকে বাঁশির শব্দে খেলোয়াড়দের বিভ্রান্ত হওয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু ফুটবলের মৌলিক শিক্ষা হলো, রেফারির বাঁশি না শোনা পর্যন্ত খেলা চালিয়ে যেতে হয়। কুয়েত সেই ভুল করেছিল। এরপর তাদের কর্মকর্তা মাঠে নেমে সেটিকে আরও বড় বিতর্কে পরিণত করেন।

ফ্রান্সের জন্য ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত বড় ক্ষতির কারণ হয়নি। তারা জিতেছে, এগিয়েছে, পরে সেই বিশ্বকাপে সেমিফাইনালেও উঠেছে। কিন্তু এই ম্যাচের গল্প তাদের জয়ের গল্প নয়। এটি এমন এক মুহূর্তের গল্প, যখন বিশ্বকাপের নিয়ম, শৃঙ্খলা ও কর্তৃত্ব কয়েক মিনিটের জন্য অদ্ভুতভাবে নরম হয়ে গিয়েছিল।