logo
Advertisement

বিশ্বকাপে ইরানের পুরোনো পতাকা নিষিদ্ধই থাকল

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
বিশ্বকাপে ইরানের পুরোনো পতাকা নিষিদ্ধই থাকল
ইরানের বিপ্লব পূর্ববর্তী পতাকা। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপে ইরানের প্রথম ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগে লস অ্যাঞ্জেলেসে আদালত পর্যন্ত গড়াল পতাকা বিতর্ক। তবে শেষ পর্যন্ত ফিফার সিদ্ধান্তই বহাল থাকল। স্টেডিয়ামে ইসলামি বিপ্লব-পূর্ব ইরানের সিংহ-সূর্য চিহ্নের পতাকা নেওয়ার ওপর ফিফার নিষেধাজ্ঞা জরুরি শুনানির পর বহাল রেখেছেন লস অ্যাঞ্জেলেসের আদালত।

Advertisement

দ্য অ্যাথলেটিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান-নিউজিল্যান্ড ম্যাচের দিন সোমবার সকালে লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি সুপিরিয়র কোর্টে জরুরি শুনানি হয়। ম্যাচটি ক্যালিফোর্নিয়ার ইঙ্গলউডের সোফাই স্টেডিয়ামে হওয়ার কথা। শুনানিতে বিচারক কার্টিস এ কিন ফিফার নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার পক্ষে রায় দেন।

বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা পতাকাটি ইরানের বর্তমান জাতীয় পতাকার মতো সবুজ-সাদা-লাল হলেও মাঝখানে রয়েছে সিংহ ও সূর্যের প্রতীক। এই পতাকা ঐতিহাসিকভাবে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে শাহ-শাসিত ইরানের সঙ্গে যুক্ত। বিপ্লবের পর ইরানের রাষ্ট্রীয় পতাকা বদলে যায়। প্রবাসী ইরানিদের একটি অংশ এখনো পুরোনো সিংহ-সূর্য পতাকাকে নিজেদের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেন।

এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে মামলা করে ইনস্টিটিউট ফর ভয়েস অব লিবার্টি এবং স্যাম কেরমানিয়ান নামের এক ইরান সমর্থক, যিনি ইরান-নিউজিল্যান্ড ম্যাচে যেতে চেয়েছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, টিকিটধারী সমর্থকদের নিজেদের পতাকা নিয়ে ম্যাচে প্রবেশের অধিকার থাকা উচিত। কিন্তু আদালত জরুরি আবেদন খারিজ করে দেয়।

বিচারক কিন শুনানিতে বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সমাজের ভিত্তির অংশ হলেও তার সীমা আছে। তাঁর যুক্তি ছিল, স্টেডিয়ামটি কোনো উন্মুক্ত জনপরিসর নয়; এটি ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি, যেখানে টিকিট কিনে প্রবেশ করতে হয়। তাই স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষ ও আয়োজকদের নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ও আচরণবিধি প্রয়োগের সুযোগ আছে।

বিচারক আরও বলেন, ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগে দীর্ঘদিনের স্টেডিয়াম নিরাপত্তা নীতিতে পরিবর্তন আনা বড় চাপ তৈরি করতে পারে। প্রায় ২ হাজার ৫০০ কর্মী নিরাপত্তা নিয়ম বাস্তবায়নে যুক্ত থাকবেন। এমন অল্প সময়ে একটি স্টেডিয়ামে নিয়ম বদলালে অন্য ভেন্যুতেও একই প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

মামলাকারীদের আইনজীবী শাহরুখ মোখতারজাদেহ আদালতে পাল্টা যুক্তি দেন। তাঁর দাবি, কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গ্রাহককে টিকিটের শর্ত হিসেবে মতপ্রকাশের অধিকার ছাড়তে বাধ্য করতে পারে না। তিনি বলেন, বিশ্বকাপ যেহেতু ফিফা ও স্থানীয় সরকারি কাঠামোর সহযোগিতায় আয়োজিত হচ্ছে, তাই স্টেডিয়ামের চরিত্র আংশিকভাবে জনপরিসরের মতো বিবেচনা করা উচিত।

আইনজীবী আরও বলেন, লস অ্যাঞ্জেলেস ও ক্যালিফোর্নিয়ায় বড় ইরানি কমিউনিটি আছে। তাঁদের অনেকেই ইসলামিক রিপাবলিকের বর্তমান পতাকা নিয়ে স্টেডিয়ামে যেতে চান না। তাঁর বক্তব্য ছিল, পুরোনো সিংহ-সূর্য পতাকা তাঁদের কাছে শুধু রাজনৈতিক প্রতীক নয়, ব্যক্তিগত ও ঐতিহাসিক পরিচয়েরও প্রতীক।

ফিফার পক্ষের আইনজীবী যুক্তি দেন, ম্যাচটির কথা বহু মাস ধরেই জানা ছিল। তাই শেষ মুহূর্তে জরুরি নিষেধাজ্ঞা চাওয়া যথাযথ নয়। বিচারক এই যুক্তির সঙ্গেও একমত হন।

ফিফা সাধারণত স্টেডিয়ামে রাজনৈতিক, আক্রমণাত্মক বা বৈষম্যমূলক প্রতীক, ব্যানার, পোশাক ও অন্যান্য সামগ্রী নিষিদ্ধ রাখে। দ্য অ্যাথলেটিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিফার অবস্থান অনুযায়ী ইসলামি বিপ্লব-পূর্ব ইরানের পতাকাটিকে রাজনৈতিক প্রকৃতির হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে কোন নির্দিষ্ট বিধি ভঙ্গের কারণে নিষেধাজ্ঞা, সেটি ফিফা বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করেনি।

এখন প্রশ্ন হলো, মাঠে এই নীতি কীভাবে প্রয়োগ করা হবে। কারণ দ্য অ্যাথলেটিক জানিয়েছে, শনিবার কাতার-সুইজারল্যান্ড ম্যাচে সান্তা ক্লারার লেভাইস স্টেডিয়ামে একাধিক সমর্থককে এই ধরনের পতাকা খুলতে বলা হয়েছিল। অর্থাৎ নিয়ম থাকলেও প্রতিটি ভেন্যুতে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা কীভাবে তা বাস্তবায়ন করবেন, সেটি নজরে থাকবে।

ইরানের বিশ্বকাপ অভিযান এমনিতেই অস্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শুরু হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে বড় ইরানি প্রবাসী কমিউনিটি, সরকারবিরোধী প্রতিবাদ, দলকে ঘিরে নিরাপত্তা ও ভিসা জটিলতা—সব মিলিয়ে মাঠের বাইরে চাপ অনেক। ইরান দল যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচের সময় সীমিতভাবে অবস্থান করছে এবং বাকি সময় মেক্সিকোতে ঘাঁটি ব্যবহার করছে।

ইরান আজ গ্রুপ ‘জি’র প্রথম ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হবে। এরপর ২১ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসেই বেলজিয়ামের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচ খেলবে তারা। ২৬ জুন সিয়াটলে মিসরের বিপক্ষে গ্রুপের শেষ ম্যাচ।

ফুটবলের মাঠে ইরানের লক্ষ্য প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব পেরোনো। কিন্তু প্রথম ম্যাচের আগেই পরিষ্কার হলো, তাদের এই বিশ্বকাপ শুধু ফুটবল নয়; পতাকা, পরিচয়, প্রবাসী রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিতর্কও এই অভিযানের বড় অংশ হয়ে থাকবে।