মেসির হ্যাটট্রিক, ইতিহাস বলছে সতর্ক থাকুক আর্জেন্টিনা

লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে প্রায় সব রেকর্ডই ছিল। বাকি ছিল শুধু একটি হ্যাটট্রিক। আলজেরিয়ার বিপক্ষে সেই অপূর্ণতাও মুছে ফেললেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। ৩৮ বছর বয়সে এসে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম হ্যাটট্রিক করলেন, ছুঁয়ে ফেললেন মিরোস্লাভ ক্লোসের সর্বকালের বিশ্বকাপ গোলরেকর্ডও।
আর্জেন্টিনার জন্য রাতটা ছিল আনন্দের। কিন্তু ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে এই হ্যাটট্রিকের ভেতর লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত কৌতূহল। মেসির আগে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে যতবার কোনো ফুটবলার হ্যাটট্রিক করেছেন, কোনোবারই শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিততে পারেনি আলবিসেলেস্তেরা। কুসংস্কার নয়, তবে পরিসংখ্যানের এই মিলটাই এখন আলোচনার বিষয়।
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম হ্যাটট্রিক এসেছিল ১৯৩০ সালে। নায়ক ছিলেন গিলের্মো স্তাবিলে। মেক্সিকোর বিপক্ষে ৬-৩ গোলের জয়ে নিজের বিশ্বকাপ অভিষেকেই তিন গোল করেছিলেন তিনি। ফ্রান্সের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে তাঁর খেলা হয়নি। নিয়মিত স্ট্রাইকার রবার্তো চেরো মানসিক চাপে খেলতে না পারায় সুযোগ পান স্তাবিলে, আর সেই সুযোগকে ইতিহাসে পরিণত করেন।
অনেক বছর ধরে স্তাবিলের হ্যাটট্রিককেই বিশ্বকাপের প্রথম হ্যাটট্রিক মনে করা হতো। পরে ফিফার স্বীকৃতিতে জানা যায়, তাঁর দুই দিন আগে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ট প্যাটেনড হ্যাটট্রিক করেছিলেন। তবে আর্জেন্টিনার ইতিহাসে স্তাবিলের সেই ম্যাচের গুরুত্ব আলাদা জায়গায়ই আছে। ১৯৩০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ফাইনালেও উঠেছিল, কিন্তু উরুগুয়ের কাছে হেরে শিরোপা হাতছাড়া করে।
এরপর আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপে আরেকটি হ্যাটট্রিকের জন্য অপেক্ষা করতে হয় ৫৪ বছর। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে গ্রিসের বিপক্ষে গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা করেন তিন গোল। আর্জেন্টিনা ম্যাচটি জেতে ৪-০ ব্যবধানে। একই ম্যাচে গোল করেছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনাও। কিন্তু সেই বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনার জন্য শেষ পর্যন্ত সুখের হয়নি। ড্রাগ পরীক্ষায় পজিটিভ হওয়ায় ম্যারাডোনা নিষিদ্ধ হন, আর দ্বিতীয় রাউন্ডে রোমানিয়ার কাছে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা।
চার বছর পর আবারও বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক বাতিস্তুতার। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে জ্যামাইকার বিপক্ষে মাত্র দশ মিনিটের ব্যবধানে তিন গোল করেন তিনি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে দুই ভিন্ন আসরে হ্যাটট্রিক করা একমাত্র ফুটবলার এখনো বাতিস্তুতা। কিন্তু সেবারও আর্জেন্টিনার স্বপ্ন শেষ হয় অপূর্ণতায়। নেদারল্যান্ডসের কাছে হেরে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেয় তারা।
২০১০ বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার হয়ে পরের হ্যাটট্রিকটি করেন গঞ্জালো হিগুয়েইন। ৪-১ গোলের জয়ে তাঁর তিন গোল আর্জেন্টিনাকে গ্রুপ পর্বে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যায়। কিন্তু ডিয়েগো ম্যারাডোনার কোচিংয়ে সেই দলও শেষ পর্যন্ত বেশি দূর যেতে পারেনি। কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে ৪-০ গোলে হেরে বিদায় নিতে হয় আর্জেন্টিনাকে।
এবার সেই তালিকায় যোগ হলো মেসির নাম। আলজেরিয়ার বিপক্ষে তিন গোল করে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার পঞ্চম হ্যাটট্রিকটি করলেন তিনি। দল হিসেবে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার চেয়ে বেশি হ্যাটট্রিক আছে শুধু জার্মানির। কিন্তু আর্জেন্টিনার জন্য ইতিহাসের অস্বস্তিকর দিক হলো, আগের চার হ্যাটট্রিকের কোনোটাই শেষ পর্যন্ত শিরোপার পথে যায়নি।
তবে মেসির আর্জেন্টিনা এরই মধ্যে অনেক ইতিহাস বদলে দিয়েছে। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালে ফিনালিসিমা, এরপর কাতারে বিশ্বকাপ—এই দল জানে কীভাবে দীর্ঘ অপেক্ষা শেষ করতে হয়। তাই পুরোনো পরিসংখ্যানকে তারা ভয় পাবে, এমন নয়।
তবু ফুটবলে গল্পের মূল্য আছে। মেসির হ্যাটট্রিক আর্জেন্টিনাকে উজ্জীবিত করেছে, কিন্তু ইতিহাসের কাকতালীয় মিল মনে করিয়ে দিচ্ছে—শুরু যতই উজ্জ্বল হোক, বিশ্বকাপ শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ ও কঠিন পথ। আগের হ্যাটট্রিক-নায়কদের অপূর্ণতা এবার কি মেসি পূর্ণতায় বদলাতে পারবেন, উত্তর দেবে এই বিশ্বকাপই।



