সাত গোলের সেই রাত, যা বিশ্বকাপ আজও ভুলেনি

কিছু ম্যাচ স্কোরলাইনের জন্য বিখ্যাত হয়। কিছু ম্যাচ বিখ্যাত হয় ট্রফির জন্য। আর কিছু ম্যাচ আছে, যেগুলো ফুটবলকে তার সীমা ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। যেখানে ৯০ মিনিট শেষ হয়, কিন্তু গল্প শেষ হয় না। যেখানে ক্লান্ত শরীর, ভাঙা কাঁধ, শেষ শক্তিটুকু, আর একের পর এক গোল মিলিয়ে তৈরি হয় এমন এক রাত, যাকে পরে ইতিহাস আলাদা নামে ডাকে।
১৯৭০ সালের ১৭ জুন, মেক্সিকো সিটির আজটেকা স্টেডিয়ামে ইতালি ও পশ্চিম জার্মানির বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল ছিল তেমনই এক রাত। নাম দেওয়া হয়েছিল, গেম অব দ্য সেঞ্চুরি। শতাব্দীর সেরা ম্যাচ। নামটা বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে, তবে ম্যাচটি সম্পর্কে জানলে এটি মানতে হবে। ৯০ মিনিট শেষে স্কোর ছিল ১-১। এরপর অতিরিক্ত সময়ে হলো আরও পাঁচ গোল। ১২০ মিনিট শেষে ইতালি জিতল ৪-৩ ব্যবধানে। কিন্তু শুধু ইতালি জেতেনি, ফুটবলও যেন নিজের নাটকীয়তার এক চূড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল।

ম্যাচের শুরুতেই ইতালি আঘাত করেছিল। মাত্র ৮ মিনিটে রবের্তো বনিনসেনিয়ার গোলে এগিয়ে যায় তারা। ইতালির ফুটবল তখন রক্ষণ, শৃঙ্খলা আর কৌশলের জন্য পরিচিত। এক গোলের লিড পাওয়ার পর তারা ম্যাচকে নিজেদের ছকে আটকে ফেলতে চেয়েছিল। পশ্চিম জার্মানি চেষ্টা করছিল, কিন্তু ইতালির রক্ষণ বারবার দেয়াল হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। মিনিট গড়াচ্ছিল, জার্মানির সময় ফুরিয়ে যাচ্ছিল।
তারপর এল ৯০তম মিনিট।
যে মুহূর্তে ইতালি প্রায় ফাইনাল ভাবতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই কার্ল-হাইঞ্জ শ্নেলিঙ্গার সমতা ফেরালেন পশ্চিম জার্মানির হয়ে। অদ্ভুত ব্যাপার, শ্নেলিঙ্গার তখন ক্লাব ফুটবল খেলতেন ইতালির এসি মিলানে। ইতালিয়ান ধারাভাষ্যে সেই গোলের পর বিখ্যাত হয়ে যায় বিস্ময়ের সুর, “শ্নেলিঙ্গার, শেষ পর্যন্ত তিনিও!”

এই শেষ মুহূর্তের গোল ম্যাচকে আবার শূন্যে ফিরিয়ে দেয়। ইতালির নিশ্চিত মনে হওয়া জয় ঠেলে গেল অতিরিক্ত সময়ে।
তারপর যা হলো, তা বিশ্বকাপ আগে কখনো দেখেনি।
অতিরিক্ত সময় শুরু হতেই ম্যাচ যেন তার সংযম হারিয়ে ফেলল। ৯৪ মিনিটে গার্ড মুলার গোল করে পশ্চিম জার্মানিকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। ইতালি, যে দল এতক্ষণ ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করছিল, হঠাৎ পিছিয়ে পড়ল। কিন্তু তারা ভাঙেনি। ৯৮ মিনিটে তারচিজিও বুরনিচ গোল করে সমতা ফেরালেন। ২-২। এরপর ১০৪ মিনিটে লুইজি রিভার সহায়তায় লুইজি রিভা গোল করলেন। ইতালি আবার এগিয়ে গেল ৩-২।
দর্শক তখন শুধু ম্যাচ দেখছিল না, নিঃশ্বাস আটকে ইতিহাস দেখছিল।
দ্বিতীয় অতিরিক্ত সময়েও নাটক থামেনি। ১১০ মিনিটে আবার গার্ড মুলার। স্কোর ৩-৩। জার্মানির অদম্য মানসিকতা আবার ফিরে এল। এত ক্লান্তি, এত দৌড়, এত চাপের পরও তারা ম্যাচ ছাড়ছিল না। কিন্তু জার্মানির আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। মাত্র এক মিনিট পর ইতালির জিয়ান্নি রিভেরা জয়সূচক গোল করলেন। ৪-৩।
আজটেকা স্টেডিয়াম বুঝে গেল, তারা এমন এক ম্যাচের সাক্ষী, যা শুধু সেদিনের নয়, বহু দশক ধরে বলা হবে।
এই ম্যাচের আরেকটি চিত্র ইতিহাসে আলাদা হয়ে আছে। ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার। জার্মানির তরুণ নেতা। ম্যাচে তার কাঁধে চোট লাগে, কিন্তু বদলির সুযোগ শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনি মাঠ ছাড়তে পারেননি। ডান হাত শরীরের সঙ্গে বেঁধে, কাঁধ ঝুলে থাকা অবস্থায় তিনি খেলা চালিয়ে যান। আধুনিক ফুটবলে এমন দৃশ্য প্রায় অকল্পনীয়। কিন্তু সেই রাতে বেকেনবাওয়ার হয়ে উঠেছিলেন জার্মান জেদের প্রতীক, শরীর ভেঙে গেলেও ম্যাচ ছেড়ে না যাওয়ার প্রতীক।
ইতালির জন্যও ম্যাচটি ছিল চরিত্রের পরীক্ষা। তারা শুধু রক্ষণাত্মক দল নয়, প্রয়োজন হলে আগুনের মধ্যে দাঁড়িয়ে পাল্টা আঘাত করতে পারে, সেটি দেখিয়েছিল এই সেমিফাইনাল। বনিনসেনিয়ার শুরু, বুরনিচের সমতা, রিভার গোল, রিভেরার শেষ আঘাত, সব মিলিয়ে ইতালি লিখেছিল নিজেদের সবচেয়ে বিখ্যাত বিশ্বকাপ রাতগুলোর একটি।

তবে এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো, এখানে কোনো একক নায়ক নেই। আছে একাধিক চরিত্র, একাধিক মোড়, একাধিক মৃত্যু ও পুনর্জন্ম। ইতালি এগোয়, জার্মানি ফেরে। জার্মানি এগোয়, ইতালি ফেরে। আবার জার্মানি ফেরে, আবার ইতালি আঘাত করে। যেন ম্যাচটি ঠিক করেছিল, কোনো সহজ সমাপ্তি দেবে না।
ফুটবলে অনেক সময় অতিরিক্ত সময় মানে ক্লান্ত পা, সতর্ক পাস, পেনাল্টির অপেক্ষা। কিন্তু ১৯৭০ সালের সেই রাতে অতিরিক্ত সময় হয়ে উঠেছিল গোলের বিস্ফোরণ। ৩০ মিনিটে পাঁচ গোল। বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের মতো মঞ্চে এমন উন্মাদনা অবিশ্বাস্য। যে কারণে আজও এই ম্যাচকে শুধু ইতালি বনাম পশ্চিম জার্মানি বলা হয় না, বলা হয় শতাব্দীর ম্যাচ।
১৯৭০ বিশ্বকাপের ফাইনালে ইতালি পরে ব্রাজিলের কাছে হেরে যায়। পেলের ব্রাজিল সেই আসরে অমর হয়ে ওঠে। তবু ইতালি-জার্মানির সেমিফাইনাল আলাদা আলোয় বেঁচে থাকে। কারণ ফাইনাল বলেছিল কে সেরা দল। সেমিফাইনাল দেখিয়েছিল ফুটবল কত দূর যেতে পারে।
২০২৬ বিশ্বকাপ সামনে। আবারও নকআউট ম্যাচে কেউ শেষ মিনিটে বাঁচবে, কেউ অতিরিক্ত সময়ে ভাঙবে, কেউ হয়তো টাইব্রেকারে ইতিহাস লিখবে। কিন্তু ফুটবল যখনই তার সবচেয়ে নাটকীয় রাতগুলোর তালিকা খুলবে, ১৯৭০ সালের মেক্সিকো সিটির সেই সেমিফাইনাল ফিরে আসবেই।
কারণ সেদিন ৯০ মিনিট ছিল শুধু ভূমিকা। আসল গল্প শুরু হয়েছিল যখন সবাই ভাবছিল, ম্যাচ প্রায় শেষ। আর সেই গল্পের শেষে স্কোরবোর্ডে লেখা ছিল ইতালি ৪, পশ্চিম জার্মানি ৩। কিন্তু ইতিহাসের ভাষায় লেখা ছিল আরও বড় কিছু।
ফুটবল থামতে চায়নি। আর মানুষ আজও সেই রাত ভুলতে পারেনি।
