logo
Advertisement

ম্যারাডোনার দুই ঐতিহাসিক গোলের বলটি এখন কার কাছে

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
ম্যারাডোনার দুই ঐতিহাসিক গোলের বলটি এখন কার কাছে
আলোচিত সেই বলটি। ছবি: সংগৃহীত

একই ম্যাচ, একই বল, একই মানুষ। আর ফুটবল ইতিহাসে দুই বিপরীত অনুভূতির দুই গোল।

Advertisement

একটি গোল বিতর্কের, আরেকটি নিখাদ জাদুর। একটি গোল নিয়ে আজও তর্ক থামেনি, আরেকটি গোলকে বলা হয় শতাব্দীর সেরা। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দিয়েগো ম্যারাডোনার সেই দুই গোল শুধু আর্জেন্টিনাকে সেমিফাইনালে তোলেনি, ফুটবল ইতিহাসের গতিপথেও স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।

মেক্সিকো সিটির এস্তাদিও আজতেকা। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। ম্যাচটির রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক ও আবেগী প্রেক্ষাপট ছিল আলাদা। ফকল্যান্ড যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর দুই দেশের এই লড়াই ফুটবলের সীমানা ছাড়িয়ে আরও অনেক অর্থ বহন করছিল।

সেই ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধেই জন্ম নেয় ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তগুলোর একটি। ইংল্যান্ড গোলরক্ষক পিটার শিলটনের সঙ্গে লাফিয়ে ওঠেন ম্যারাডোনা। উচ্চতায় শিলটনের চেয়ে অনেক ছোট আর্জেন্টাইন অধিনায়ক মাথা নয়, হাতের স্পর্শে বল জালে পাঠান। রেফারি আলি বিন নাসের ঘটনাটি পরিষ্কার দেখতে পারেননি। সহকারী রেফারির কাছ থেকেও আপত্তির সংকেত না আসায় গোলটি দিয়ে দেন তিনি।

ম্যাচের পর ম্যারাডোনার বিখ্যাত মন্তব্য, গোলটি হয়েছে কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা দিয়ে, কিছুটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে। সেই থেকেই ফুটবল ইতিহাসে গোলটির নাম হয়ে যায় ‘হ্যান্ড অব গড’।

কিন্তু ম্যারাডোনার গল্প শুধু বিতর্কে আটকে থাকেনি। সেই গোলের মাত্র চার মিনিট পরই তিনি এমন কিছু করেন, যা বিতর্ককে ছাপিয়ে তাকে অমরত্ব দেয়। নিজেদের অর্ধ থেকে বল নিয়ে একের পর এক ইংলিশ খেলোয়াড়কে পেছনে ফেলেন তিনি। ড্রিবল করে এগিয়ে যান, প্রতিপক্ষের প্রতিরোধ ভেঙে ঢুকে পড়েন বক্সে, শেষে গোলরক্ষককেও কাটিয়ে বল পাঠান জালে।

এ গোলটিই পরে পরিচিতি পায় ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ নামে। হাতের গোলের পাশে তাই দাঁড়িয়ে যায় ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর একক নৈপুণ্যের গোল। একই ম্যাচে ম্যারাডোনা যেন নিজের দুই রূপ দেখিয়েছিলেন, চাতুর্য ও শিল্প, বিতর্ক ও প্রতিভা, মানবিক দুর্বলতা ও অতিমানবীয় দক্ষতা।

আর্জেন্টিনা সেই ম্যাচ জেতে ২-১ গোলে। পরে ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতে তারা। ম্যারাডোনা পুরো টুর্নামেন্টে পাঁচ গোল করেন, সতীর্থদের দিয়ে করান আরও পাঁচটি। কিন্তু ১৯৮৬ বিশ্বকাপ বললেই সবচেয়ে আগে ফিরে আসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই চার মিনিটের নাটক।

সেই নাটকের কেন্দ্রে ছিল যে বলটি, সেটির গল্পও কম আকর্ষণীয় নয়।

বহু বছর বলটি নিজের কাছে রেখে দেন ম্যাচের রেফারি আলি বিন নাসের। তিনি সেই মানুষ, যিনি ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলটি দিয়েছিলেন। তার কাছেই ছিল অ্যাডিডাসের সেই ম্যাচ বল, যেটি দিয়ে ম্যারাডোনা করেছিলেন দুটো ঐতিহাসিক গোল।

২০২২ সালে ম্যারাডোনার সেই ম্যাচে পরা জার্সি নিলামে ৭১ লাখ পাউন্ডের বেশি দামে বিক্রি হয়। এরপর আলোচনায় আসে বলটিও। আলি বিন নাসের সিদ্ধান্ত নেন, ফুটবল ইতিহাসের এই স্মারকও নিলামে তোলার সময় এসেছে। তার আশা ছিল, বলটি এমন কারও হাতে যাবে, যিনি এটিকে জনসমক্ষে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করবেন।

নিলাম ঘর বলটির আনুমানিক মূল্য ধরেছিল ২৫ থেকে ৩০ লাখ পাউন্ড। নিলামে দর উঠেছিল প্রায় ২০ লাখ পাউন্ড পর্যন্ত। কিন্তু সেটি রিজার্ভ প্রাইস ছুঁতে পারেনি। ফলে নিলামের দিন বলটি বিক্রি হয়নি।

এরপর আগ্রহী ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনার কথা জানানো হয়েছিল। তবে পরে প্রকাশ্যে নিশ্চিত কোনো বিক্রির তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই নির্ভরযোগ্যভাবে বলা যায়, নিলামে বলটির প্রত্যাশিত দাম ওঠেনি এবং সেদিন সেটি বিক্রি হয়নি।

ফুটবল ইতিহাসে অনেক বল আছে, অনেক গোল আছে। কিন্তু এমন বল খুব কম, যার গায়ে একই সঙ্গে লেগে আছে বিতর্ক, জাদু, রাজনীতি, আবেগ আর অমরত্বের গল্প। ম্যারাডোনার সেই বল তাই শুধু খেলার সরঞ্জাম নয়। এটি ১৯৮৬ সালের এক বিকেলের সাক্ষী, যেখানে এক মানুষ হাত দিয়ে লিখেছিলেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিতর্কগুলোর একটি, আর পা দিয়ে লিখেছিলেন সৌন্দর্যের মহাকাব্য।

ম্যারাডোনার দুই ঐতিহাসিক গোলের বলটি এখন কার কাছে