লিংকডইন বার্তা থেকে যেভাবে বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের লোপেস

গল্পটা শুনলে সিনেমার চিত্রনাট্য মনে হতে পারে। ডাবলিনে জন্ম, ব্যাংকে ডেস্কে বসা চাকরি, আয়ারল্যান্ডের ঘরোয়া ফুটবলে খণ্ডকালীন ক্যারিয়ার, তারপর লিংকডইনে আসা এক অচেনা বার্তা। সেই বার্তাই বদলে দিল রবার্তো লোপেসের জীবন। এখন ৩৩ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডার নামতে যাচ্ছেন বিশ্বকাপের মঞ্চে, কেপ ভার্দের হয়ে, বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট স্পেনের বিপক্ষে।
কেপ ভার্দের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ। প্রতিপক্ষ ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন। মঞ্চের বিশালতা একদিকে, অন্যদিকে ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রের ইতিহাস। সেই ইতিহাসের অংশ হতে যাচ্ছেন ডাবলিনে জন্ম নেওয়া লোপেস, যাঁকে সবাই চেনেন ‘পিকো’ নামে।
লোপেসের ফুটবল-যাত্রা মোটেও সরল ছিল না। দশ বছর আগে তিনি ছিলেন সদ্য চাকরি পাওয়া এক ব্যাংক কর্মকর্তা। দিনের বড় অংশ কাটত ব্যাংকের চাকরিতে, আর ফুটবল ছিল খণ্ডকালীন। তখন তিনি খেলতেন আয়ারল্যান্ডের ক্লাব বোহেমিয়ানসে। নিজের ভাষায়, সেই ডেস্কে বসা চাকরি তিনি উপভোগ করছিলেন না। কিন্তু তখনও হয়তো জানতেন না, জীবনের সবচেয়ে বড় বাঁক অপেক্ষা করছে সামনে।
২০১৭ সালে শ্যামরক রোভার্স তাঁকে পূর্ণকালীন ফুটবলার হওয়ার সুযোগ দেয়। ডাবলিনের আরেক ক্লাবের সেই প্রস্তাবই তাঁকে অফিসের চেয়ারের জীবন থেকে পুরোপুরি ফুটবলে ফিরিয়ে আনে। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। শ্যামরক রোভার্সের হয়ে তিনি নিয়মিত খেলেছেন, শিরোপা জিতেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন তখনও অনেক দূরের মনে হতো।
তারপর আসে লিংকডইনের সেই বার্তা।
কেপ ভার্দের তখনকার কোচ রুই আগুয়াস জানতে পারেন, লোপেসের বাবা কার্লোস কেপ ভার্দের মানুষ। আটলান্টিক মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রের হয়ে খেলার যোগ্যতা আছে তাঁর। আগুয়াস তাঁকে লিংকডইনে পর্তুগিজ ভাষায় বার্তা পাঠান। কিন্তু লোপেস সেটি পড়ে গুরুত্ব দেননি। তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো অপ্রয়োজনীয় বার্তা।
প্রায় নয় মাস পর আবার বার্তা আসে। এবার লোপেস বুঝতে পারেন, বিষয়টি সত্যি হতে পারে। তিনি আগের বার্তাটি গুগল অনুবাদে দেন। অনুবাদে বোঝেন, কেপ ভার্দে জাতীয় দলে নতুন খেলোয়াড় নেওয়া হচ্ছে, তিনি আগ্রহী কি না জানতে চাওয়া হয়েছিল। তখন আর দেরি করেননি। উত্তর ছিল সরাসরি, হ্যাঁ, শতভাগ আগ্রহী।
২০১৯ সালে কেপ ভার্দে জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক হয় লোপেসের। এরপর ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন নীল হাঙরদের নিয়মিত মুখ। গত কয়েক বছরে কেপ ভার্দের রক্ষণভাগে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এখন সেই যাত্রা এসে থামছে না, বরং পৌঁছে যাচ্ছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে।

কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ-অভিযান নিজেই এক রূপকথা। প্রায় ৫ লাখ ২৫ হাজার মানুষের দেশ। আটলান্টিকের ১০টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত সাবেক পর্তুগিজ উপনিবেশ। ফিফায় যোগ দিয়েছে ১৯৮৬ সালে। একসময় র্যাঙ্কিংয়ে ছিল ১৮২ নম্বরে। এখন সেই দেশ বিশ্বকাপে। অনেকের কাছে এটি স্বাধীনতার পর দেশের সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলোর একটি।
কেপ ভার্দের ফুটবল কাঠামো বড় নয়। সম্পদ সীমিত, জনসংখ্যা কম, ইউরোপ-আফ্রিকা-আমেরিকায় ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী ফুটবলারদের ওপর নির্ভরতা বেশি। কিন্তু স্বপ্নের আকার কখনো ছোট ছিল না। আফ্রিকান নেশনস কাপে তারা কয়েকবার নিজেদের পরিচয় তৈরি করেছে। এবার সেই পরিচয় বিশ্বকাপে।
লোপেসের কাছে বিষয়টি আরও ব্যক্তিগত। তাঁর বাবা কেপ ভার্দের মানুষ। সেই শিকড়ের দেশকে বিশ্বকাপে প্রতিনিধিত্ব করা তাঁর কাছে শুধু ফুটবল নয়, পরিবারের নাম বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার সুযোগ। বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে নিজের পরিবারের ইতিহাসও যেন তাঁর সঙ্গে মাঠে নামবে।
এই সময়টা লোপেসের ব্যক্তিগত জীবনেও বিশেষ। কেপ ভার্দেকে বিশ্বকাপে তুলতে সাহায্য করার পরদিনই প্রথমবার বাবা হয়েছেন তিনি। স্ত্রী লিয়া জন্ম দিয়েছেন তাঁদের ছেলে দিয়েগোকে। ফুটবলারের জীবনে এমন মুহূর্ত খুব কম আসে—একদিকে সন্তান জন্মের আনন্দ, অন্যদিকে বিশ্বকাপের স্বপ্নপূরণ।

কেপ ভার্দের জন্য বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচটি সহজ নয়। প্রতিপক্ষ স্পেন। গ্রুপে আরও আছে উরুগুয়ে ও সৌদি আরব। কাগজে-কলমে কেপ ভার্দে পিছিয়ে থাকা দল। কিন্তু বিশ্বকাপের সৌন্দর্য এখানেই, ছোট দলও একদিন বড় গল্প লিখে ফেলে। কেপ ভার্দে সেই স্বপ্ন নিয়েই এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে থাকা কেপ ভার্দীয় কমিউনিটির মধ্যেও উৎসবের আবহ। বিশেষ করে ম্যাসাচুসেটসের বোস্টন অঞ্চলে, যেখানে বহু কেপ ভার্দীয় বসবাস করেন। কেউ আটলান্টার ম্যাচে যাবেন, কেউ নিজেদের এলাকায় বড় পর্দায় খেলা দেখবেন। যারা হয়তো নিয়মিত ফুটবল দেখে না, তারাও এখন জানতে চাইছে, ম্যাচ কখন, কোথায় দেখা যাবে, আমরা কি একসঙ্গে দেখতে পারি?
এই হলো ফুটবলের শক্তি। একটি ছোট দেশ, হাজার মাইল দূরের প্রবাসী মানুষ, একটি লিংকডইন বার্তা, আর বিশ্বকাপের মঞ্চ—সব এক সুতায় বাঁধা পড়ে গেছে।
রবার্তো লোপেসের গল্প তাই শুধু একজন ফুটবলারের গল্প নয়। এটি সুযোগ চিনে নেওয়ার গল্প, শিকড়ের ডাকে সাড়া দেওয়ার গল্প, এবং বিশ্বাস করার গল্প যে অস্বাভাবিক পথও বিশ্বকাপে নিয়ে যেতে পারে।
কখনো যে বার্তাকে তিনি অপ্রয়োজনীয় বার্তা ভেবেছিলেন, সেটিই তাঁকে এনে দিয়েছে জীবনের সবচেয়ে বড় ম্যাচের সামনে। স্পেনের বিপক্ষে মাঠে নামার সময় লোপেসের পেছনে থাকবে কেপ ভার্দে, ডাবলিন, তাঁর পরিবার, আর সেই অদ্ভুত লিংকডইন বার্তার স্মৃতি।
বিশ্বকাপ এমন গল্পের জন্যই বড়।
