logo

বাংলাদেশ থেকে বিশ্বকাপ দেখতে গেলে খরচ কত

বাংলাদেশ থেকে বিশ্বকাপ দেখতে গেলে খরচ কত
স্টেডিয়ামে বসে গলা ফাঁটাতে চাইলে বেশ অর্থ খরচাতে হবে। ছবি: সংগৃহীত

টিভির সামনে বসে বিশ্বকাপ দেখা একরকম। আর গ্যালারিতে বসে সেই ম্যাচ দেখা একেবারেই অন্য অভিজ্ঞতা। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে কেউ যদি সত্যিই ২০২৬ বিশ্বকাপের একটি ম্যাচ দেখতে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চান, তাহলে কত টাকা থাকতে হবে?

উত্তরটা সহজ নয়। কারণ খরচ নির্ভর করবে কোন শহরে যাচ্ছেন, কোন দল খেলছে, টিকিট কোথা থেকে কিনছেন, কত রাত থাকছেন, আগে থেকে ভিসা আছে কি না—এসবের ওপর। তবে একটি সাধারণ হিসাব করা যায়। ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে একটি গ্রুপ পর্বের ম্যাচ দেখে তিন রাত থেকে ফিরতে চাইলে একজন বাংলাদেশি দর্শকের খরচ পড়তে পারে সাড়ে ৪ লাখ থেকে ৭ লাখ টাকার মধ্যে। আর ফাইনাল দেখতে চাইলে খরচ ১০ লাখ টাকার অনেক ওপরে চলে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।

প্রথমেই আসবে ভিসা। যুক্তরাষ্ট্রে যেতে বাংলাদেশি দর্শকের বি১/বি২ ভিসা লাগবে। ভিসা আবেদন ফি ১৮৫ ডলার, বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২৩ হাজার টাকা। তবে এখানেই শেষ নয়। বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ডের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ভিসা অনুমোদনের পর আবেদনকারীকে ৫ হাজার, ১০ হাজার বা ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ফেরতযোগ্য বন্ড দিতে বলা হতে পারে। এটি সরাসরি খরচ নয়; নিয়ম মেনে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়লে টাকা ফেরত পাওয়ার কথা। কিন্তু ভ্রমণের আগে এত বড় অঙ্কের অর্থ জমা দেওয়ার সামর্থ্য থাকতে হবে। ৫ হাজার ডলার মানে প্রায় ৬ লাখ ১৫ হাজার টাকা, আর ১৫ হাজার ডলার মানে প্রায় ১৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকা।

তবে বিশ্বকাপ দর্শকদের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম আছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করা কিছু ফিফা বিশ্বকাপ টিকিটধারীর ক্ষেত্রে ভিসা বন্ড মওকুফ হতে পারে। বিশেষ করে যারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফিফার টিকিট কিনেছেন এবং ফিফার অগ্রাধিকারভিত্তিক ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই ছাড় প্রযোজ্য হতে পারে। তাই ভিসা বন্ডকে `নিশ্চিত খরচ' না ধরে “সম্ভাব্য বড় নগদ বাধা” হিসেবে দেখা ভালো।

এবার আসি বিমান ভাড়ায়। ঢাকা থেকে নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, মায়ামি বা যুক্তরাষ্ট্রের অন্য বড় শহরে যাওয়া-আসার টিকিট সময়ভেদে অনেক ওঠানামা করে। বর্তমান বাজারে ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় শহরগুলোতে ইকোনমি ক্লাসে যাওয়া-আসার ভাড়া সাধারণত দেড় লাখ থেকে তিন লাখ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। বিশ্বকাপের সময়, ম্যাচের শহর, বুকিংয়ের সময় এবং ট্রানজিটভেদে এই খরচ আরও বাড়তে পারে। নিরাপদ হিসাব করতে গেলে বিমানভাড়ার জন্য অন্তত ২ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা ধরে রাখা উচিত।

এরপর সবচেয়ে বড় ধাক্কা ম্যাচের টিকিট। ছোট দল বা কম চাহিদার গ্রুপ ম্যাচ হলে তুলনামূলক কম দামে টিকিট পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু বাস্তব বাজারে অনেক ম্যাচেই ৩০০ ডলারের নিচে টিকিট পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশি টাকায় সেটি প্রায় ৩৭ হাজার টাকা। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র বা বড় শহরের ম্যাচ হলে টিকিটের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। অনেক ম্যাচে ৬০০-৭০০ ডলার, অর্থাৎ ৭৫ হাজার থেকে ৮৫ হাজার টাকা ধরে প্রস্তুত থাকাই বাস্তবসম্মত। নিউইয়র্ক, মায়ামি বা বড় ম্যাচ হলে ১ হাজার ডলার, অর্থাৎ প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার টাকাও লাগতে পারে।

হোটেল খরচও কম নয়। বিশ্বকাপের সময় যুক্তরাষ্ট্রের অনেক আয়োজক শহরে হোটেল ভাড়া বেড়েছে। তুলনামূলক কম খরচের শহরে ২৫০-৩০০ ডলার রাতপ্রতি হোটেল ধরলেও তিন রাতের জন্য খরচ হবে প্রায় ১ লাখ টাকা। লস অ্যাঞ্জেলেসে সেই হিসাব ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার কাছাকাছি যেতে পারে। নিউইয়র্ক/নিউ জার্সি এলাকায় তিন রাতের হোটেল খরচ ২ লাখ টাকারও বেশি হতে পারে। ফাইনালের সপ্তাহে এই খরচ আরও অনেক বেশি।

খাবারের হিসাবও ছোট নয়। যুক্তরাষ্ট্রে দিনে তিন বেলা সাধারণ খাবার, পানি, কফি বা হালকা খাবার মিলিয়ে ৫০-৮০ ডলার খরচ খুব স্বাভাবিক। চার দিনের ভ্রমণ ধরলে খাবারে লাগতে পারে ২৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা। স্টেডিয়ামের ভেতরে খাবার-পানীয় কিনলে খরচ আরও বাড়বে।

স্থানীয় যাতায়াতের জন্য আলাদা বাজেট রাখতে হবে। বিমানবন্দর থেকে হোটেল, হোটেল থেকে স্টেডিয়াম, ম্যাচ শেষে ফেরার ভাড়া—সব মিলিয়ে ১৫০-২৫০ ডলার ধরে রাখা ভালো। বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৮ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা। বড় শহরে অ্যাপভিত্তিক গাড়ি বা ম্যাচের দিন বিশেষ যাতায়াত ব্যবহার করলে খরচ আরও বেশি হতে পারে।

এর বাইরে থাকবে ভ্রমণ বিমা, মোবাইল সিম বা রোমিং, ভিসা ফটো, ডকুমেন্ট প্রিন্ট, ছোটখাটো জরুরি খরচ, শহর ঘোরা, হয়তো একটি জার্সি বা স্মারক কেনা। এসব মিলিয়ে আরও ৩০-৫০ হাজার টাকা ধরে রাখা নিরাপদ।

তাহলে মোট হিসাব দাঁড়াচ্ছে কত?

যদি কেউ তুলনামূলক কম খরচের শহরে একটি সাধারণ গ্রুপ ম্যাচ দেখতে যান, ৩ রাত থাকেন, সস্তা কিন্তু নিরাপদ হোটেল নেন, বড় দল নয় এমন ম্যাচের টিকিট কিনেন—তাহলে মোট খরচ পড়তে পারে প্রায় ৪ লাখ ২৫ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকার মধ্যে।

যদি ম্যাচটি বড় দল বা বড় শহরের হয়, যেমন ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড বা যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচ, আর শহর হয় নিউইয়র্ক/নিউ জার্সি, মায়ামি বা লস অ্যাঞ্জেলেস—তাহলে বাস্তবসম্মত বাজেট হবে ৬ লাখ থেকে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

আর যদি লক্ষ্য হয় বিশ্বকাপ ফাইনাল, তাহলে সেটি একেবারেই অন্য হিসাব। শুধু ফাইনালের টিকিটই কয়েক হাজার ডলারে যেতে পারে। সরকারি ফেস ভ্যালুতেই ফাইনালের টিকিট ২ হাজার ডলারের বেশি থেকে শুরু হয়ে কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত যায়। গতিশীল মূল্যব্যবস্থার কারণে ভালো আসনের দাম আরও অনেক ওপরে উঠেছে। নিউইয়র্ক/নিউ জার্সিতে ফাইনাল সপ্তাহে হোটেলও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ঢাকা থেকে যাওয়া-আসা, ভিসা, টিকিট, হোটেল, খাবার ও যাতায়াত মিলিয়ে ফাইনাল ভ্রমণে খরচ ১০ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকার মধ্যে যেতে পারে, এমনকি তারও বেশি।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো “খরচ” আর “হাতে লাগবে”—দুটো এক নয়। ম্যাচ দেখে ফিরতে হয়তো ৫-৭ লাখ টাকা খরচ হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ড লাগলে ভ্রমণের আগে আরও ৬ লাখ থেকে ১৮ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরতযোগ্য জমা দিতে হতে পারে। আবার নির্দিষ্ট বিশ্বকাপ টিকিটধারীদের ক্ষেত্রে বন্ড ছাড়ও মিলতে পারে। তাই ব্যক্তিভেদে বাস্তবে দরকারি নগদ অঙ্ক অনেক বদলে যাবে।

এক কথায়, বাংলাদেশ থেকে বিশ্বকাপের একটি ম্যাচ দেখতে যাওয়া এখন আর শুধু ফুটবলপ্রেম নয়, পুরো একটি আর্থিক পরিকল্পনা। টিভির সামনে বসে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা দেখা প্রায় বিনা খরচের আনন্দ। কিন্তু গ্যালারিতে বসে একবার “গোল” বলে চিৎকার করতে চাইলে পকেটে কয়েক লাখ টাকা থাকা চাই।

সম্ভাব্য খরচের সংক্ষিপ্ত হিসাব

কম খরচের গ্রুপ ম্যাচ

  • ভিসা ফি: প্রায় ২৩ হাজার টাকা
  • বিমান ভাড়া: প্রায় ২-২.৫ লাখ টাকা
  • ম্যাচ টিকিট: প্রায় ৩৭-৬০ হাজার টাকা
  • হোটেল ৩ রাত: প্রায় ১ লাখ টাকা
  • খাবার: ২৫-৩০ হাজার টাকা
  • স্থানীয় যাতায়াত: ১৮-২৫ হাজার টাকা
  • বিমা, সিম ও অন্যান্য: ৩০-৪০ হাজার টাকা

  • মোট: প্রায় ৪.২৫-৫ লাখ টাকা

বড় দল বা বড় শহরের ম্যাচ

  • ভিসা ফি: প্রায় ২৩ হাজার টাকা
  • বিমান ভাড়া: প্রায় ২-৩ লাখ টাকা
  • ম্যাচ টিকিট: প্রায় ৮০ হাজার-১.২৫ লাখ টাকা
  • হোটেল ৩ রাত: প্রায় ১.৫-২.২৫ লাখ টাকা
  • খাবার: ৩৫-৪৫ হাজার টাকা
  • স্থানীয় যাতায়াত: ২৫-৩৫ হাজার টাকা
  • অন্যান্য: ৪০-৫০ হাজার টাকা

  • মোট: প্রায় ৬-৭.৫ লাখ টাকা

ফাইনাল দেখতে গেলে

  • শুধু টিকিট: প্রায় ২.৫ লাখ থেকে ১৩ লাখ টাকার বেশি
  • হোটেল ৩ রাত: প্রায় ৪-৫ লাখ টাকা বা তার বেশি
  • বিমানভাড়া: প্রায় ২-৩ লাখ টাকা
  • ভিসা, খাবার, যাতায়াত ও অন্যান্য: প্রায় ১-১.৫ লাখ টাকা

  • মোট: প্রায় ১০-২০ লাখ টাকা বা তার বেশি

আলাদা করে মাথায় রাখুন

যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ড লাগলে ৫ হাজার, ১০ হাজার বা ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ফেরতযোগ্য জমা দরকার হতে পারে। বাংলাদেশি টাকায় সেটি প্রায় ৬.১৫ লাখ, ১২.৩০ লাখ বা ১৮.৪৫ লাখ টাকা। এটি সরাসরি খরচ নয়, তবে ভ্রমণের আগে বড় অঙ্কের নগদ সক্ষমতা দরকার। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করা কিছু বিশ্বকাপ টিকিটধারীর ক্ষেত্রে এই বন্ড মওকুফও হতে পারে।