logo

১৮ বছরের বুয়াদ্দির কাছে ধরা ব্রাজিলের মাঝমাঠ

১৮ বছরের বুয়াদ্দির কাছে ধরা ব্রাজিলের মাঝমাঠ
আইয়ুব বুয়াদ্দি। ছবি: সংগৃহীত

ফুটবল বিশ্বকাপের ব্রাজিল-মরক্কোর ১-১ ড্র ম্যাচে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের গোল যেমন আলোচনায়, তেমনি আলো কেড়েছে ম্যাচে খেলা আরেক ফুটবলার। তিনি হলেন মরোক্কার মিডফিল্ডার আয়ুব বুয়াদ্দি। কখনো কাসেমিরো, কখনো রাফিনিয়া, কখনো লুকাস পাকেতা—ব্রাজিলের অভিজ্ঞ তারকাদের সামনে থেকেও বল পায়ে স্থির ছিলেন মরক্কোর ১৮ বছরের মিডফিল্ডার আইয়ুব বুয়াদ্দি।

১১ জুন মেক্সিকোতে বিশ্বকাপ শুরু হলেও বাংলাদেশের অনেক ফুটবলপ্রেমীর কাছে যেন আসল উত্তেজনা শুরু হলো ১৪ জুন ভোর ৪টা থেকে, ব্রাজিল-মরক্কো ম্যাচ দিয়ে। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম থেকে বাংলাদেশের টিএসসি, কোটি চোখ ছিল এই ম্যাচে। স্কোরলাইন, গোলদাতা, আনচেলত্তির উদ্বেগ—সবই এরই মধ্যে জানা। তবে আলাদা করে নজর কাড়ার মতো একজন ছিলেন বুয়াদ্দি।

আগে দেখা যাক, ব্রাজিলের বিপক্ষে কী করেছেন ১৮ বছর বয়সি এই মিডফিল্ডার। পুরো ৯০ মিনিট খেলেছেন তিনি। পাসিংয়ে দেখিয়েছেন অসাধারণ স্থিরতা। ৬৬ পাসের মধ্যে ৬০টি সফল, অ্যাকুরেসি প্রায় ৯১ শতাংশ। আরও লক্ষণীয় ব্যাপার, তার পাস শুধু নিরাপদ অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল না। ৬৬ পাসের ৩৩টি ছিল নিজেদের অর্ধে, ৩৩টি ব্রাজিলের অর্ধে।

নিজেদের অর্ধে মাত্র দুটি পাস ভুল করেছেন বুয়াদ্দি। অর্থাৎ চাপের মধ্যেও বল ধরে রাখা ও খেলা বের করার ক্ষেত্রে তার পরিণত ভাব স্পষ্ট। ব্রাজিলের অর্ধেও তার সফল পাসের হার ছিল ৮৮ শতাংশের কাছাকাছি। একজন ১৮ বছরের মিডফিল্ডারের জন্য, সেটিও ব্রাজিলের মতো দলের বিপক্ষে বিশ্বকাপের মঞ্চে, পরিসংখ্যানটি বিশেষ কিছুই।

শুধু পাসিং নয়, ট্যাকেল, ক্লিয়ারেন্স, ব্লক, ডুয়েল—সব জায়গাতেই বুয়াদ্দি দেখিয়েছেন মুন্সিয়ানা। কখনো কাসেমিরোর সামনে শরীর ব্যবহার করেছেন, কখনো পাকেতার পাসিং লেন বন্ধ করেছেন, কখনো রাফিনিয়ার দিকে সাহায্য করতে গিয়ে ব্রাজিলের আক্রমণের গতি কমিয়ে দিয়েছেন। তাকে দেখে মনে হয়নি, এটাই তার প্রথম বিশ্বকাপ কিংবা সিনিয়র আন্তর্জাতিক ফুটবলে এখনো খুব বেশি ম্যাচ খেলা হয়নি।

ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল মাঝমাঠে। কাসেমিরো ও ব্রুনো গিমারায়েস ম্যাচের প্রথমার্ধে মরক্কোর চাপ সামলাতে পারেননি। পাকেতাও নিয়মিতভাবে খেলার গতি বদলাতে পারেননি। সেই জায়গাতেই বুয়াদ্দি ও তার সতীর্থরা ব্রাজিলকে অস্বস্তিতে ফেলেছেন। মরক্কো শুধু রক্ষণ করে পয়েন্ট নেয়নি; তারা ব্রাজিলের মাঝমাঠে চোখে চোখ রেখে লড়েছে।

বুয়াদ্দির গল্পটা আরও আকর্ষণীয় তার পরিচয়ের কারণেও। বাবা-মা মরক্কোর বংশোদ্ভূত হলেও তার জন্ম ফ্রান্সের সেনলিসে। ফরাসি ক্লাব লিলের এই মিডফিল্ডার ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক দলেও খেলেছেন। অনূর্ধ্ব-২১ পর্যায় পর্যন্ত ফ্রান্স তাকে ভবিষ্যতের বড় সম্পদ হিসেবেই দেখছিল।

কিন্তু বিশ্বকাপের আগে বড় সিদ্ধান্ত নেন বুয়াদ্দি। ফ্রান্স নয়, তিনি বেছে নেন নিজের শিকড়ের দেশ মরক্কোকে। পারিবারিক ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের টানেই তার এই সিদ্ধান্ত। আর ব্রাজিলের বিপক্ষে প্রথম বড় মঞ্চেই যেন প্রমাণ করে দিলেন, মরক্কোর জন্য এই সিদ্ধান্ত কতটা মূল্যবান।

ফ্রান্সের বিশ্বকাপ দলে হয়তো ১৮ বছরের এক তরুণের জায়গা পাওয়া কঠিন হতো। মরক্কো তাকে শুধু দলে নেয়নি, বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে ব্রাজিলের বিপক্ষে দায়িত্বও দিয়েছে। বুয়াদ্দি সেই বিশ্বাসের মর্যাদা দিয়েছেন মাঠে।

ব্রাজিলের সঙ্গে ১-১ ড্র মরক্কোর জন্য বড় ফল। কিন্তু এই ম্যাচ মরক্কোর ভবিষ্যতের জন্য আরও বড় বার্তাও দিয়ে গেল। আশরাফ হাকিমি, ব্রাহিম দিয়াস, ইসমাইল সাইবারি, আজ্জেদিন উনাহিদের সঙ্গে এখন আলোচনায় বুয়াদ্দির নামও থাকবে। শুধু বয়সের জন্য নয়, খেলার মানের জন্য।

বিশ্বকাপে অনেক তরুণ আসে, আলো দেখে আবার হারিয়েও যায়। বুয়াদ্দির শুরুটা অন্যরকম। কারণ তিনি শুধু সম্ভাবনা দেখাননি, ব্রাজিলের মতো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নিজের স্নায়ু, টেকনিক ও ম্যাচ বোঝার ক্ষমতাও দেখিয়েছেন।

ব্রাজিল-মরক্কো ম্যাচের স্কোরলাইন ছিল ১-১। কিন্তু মাঝমাঠের গল্পে, অন্তত এই রাতে, ১৮ বছরের আইয়ুব বুয়াদ্দিই ছিলেন সবচেয়ে বড় বিস্ময়।