কঙ্গোর ধাক্কার পরও পর্তুগালকে আশা দেখাচ্ছে যে কারণগুলো

কার্লো আনচেলত্তি ব্রাজিলের হতাশাজনক শুরুর পর বলেছিলেন, প্রথম ম্যাচ দিয়েই বিশ্বকাপ জেতা যায় না। কথাটা ব্রাজিলের জন্য বলা হলেও পর্তুগাল সমর্থকেরাও এখন সেটিতে সান্ত্বনা খুঁজতে পারেন। ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ ড্র নিঃসন্দেহে অস্বস্তির। তবে এটি এখনও বিপর্যয় নয়।
পর্তুগালের শুরুটা খারাপ ছিল না। ম্যাচের ৬ মিনিটেই জোয়াও নেভেসের গোলে এগিয়ে যায় রবার্তো মার্তিনেজের দল। তখন মনে হচ্ছিল, অভিজ্ঞতা ও মানের পার্থক্য কাজে লাগিয়ে ম্যাচটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেবে পর্তুগাল। কিন্তু সেটি হয়নি। বরং ডিআর কঙ্গো ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরে আসে। শরীরী শক্তি, সংগঠিত রক্ষণ, মাঝমাঠে লড়াই এবং সুযোগ পেলে দ্রুত আক্রমণে ওঠার মানসিকতা দিয়ে তারা পর্তুগালকে অস্বস্তিতে ফেলে।
কঙ্গোকে তাই পূর্ণ কৃতিত্ব দিতেই হবে। ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে তারা ভয় পায়নি। ইয়োয়ান উইসার গোল শুধু সমতা নয়, ডিআর কঙ্গোর বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম গোলও। সেড্রিক বাকাম্বুর শট পোস্টে না লাগলে পর্তুগালের জন্য রাতটা আরও খারাপ হতে পারত। ড্রটি কঙ্গোর লড়াইয়ের পুরস্কার, আর পর্তুগালের জন্য সতর্কবার্তা।
সমস্যাটা কোথায় ছিল, সেটাও স্পষ্ট। পর্তুগাল বলের দখল রেখেছে, কিন্তু খেলায় যথেষ্ট গতি ছিল না। আক্রমণ অনেক সময় স্থির হয়ে গেছে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে ঘিরে খেলা তৈরি করতে গিয়ে ব্রুনো ফার্নান্দেজ ও বার্নার্দো সিলভার প্রভাব কমে গেছে। রোনালদো এখনও বক্সে বিপজ্জনক, কিন্তু পর্তুগালের দরকার শুধু তার জন্য খেলা নয়; দরকার পুরো আক্রমণভাগকে সচল রাখা।
এখানেই আশার জায়গা। এই দলে মানের ঘাটতি নেই। ব্রুনো, বার্নার্দো, পেদ্রো নেতো, রাফায়েল লিয়াও, ভিতিনিয়া, জোয়াও নেভেস, পর্তুগালের হাতে এখনো ম্যাচ ঘোরানোর মতো যথেষ্ট অস্ত্র আছে। সমস্যা প্রতিভার নয়, ভারসাম্যের। মার্তিনেজ যদি আক্রমণের গতি বাড়াতে পারেন, রোনালদোর ভূমিকা আরও কার্যকরভাবে নির্ধারণ করতে পারেন এবং মাঝমাঠ থেকে দ্রুত বল ছাড়ার ব্যবস্থা করেন, পর্তুগাল দ্রুতই ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
আরেকটি বড় কারণ হলো নতুন ফরম্যাট। ৪৮ দলের বিশ্বকাপে গ্রুপের সেরা দুই দল সরাসরি শেষ ৩২-এ যাবে। এর বাইরে সেরা আট তৃতীয় দলও নকআউটে উঠবে। ফলে প্রথম ম্যাচে এক পয়েন্ট পাওয়া কোনোভাবেই শেষ কথা নয়। জয়ের সুযোগ হারানো হয়েছে, কিন্তু পর্তুগাল এখনও নিজের ভাগ্য নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
সামনে পর্তুগালের দুই ম্যাচ উজবেকিস্তান ও কলম্বিয়ার বিপক্ষে। এই পথটাই এখন আসল। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জয় পেলে পর্তুগালের পয়েন্ট হবে ৪। তখন নকআউটের দরজা অনেকটাই খুলে যাবে। তবে এই ম্যাচ সহজ ভাবার সুযোগ নেই। কলম্বিয়ার বিপক্ষে ৩-১ হারলেও উজবেকিস্তান দ্বিতীয়ার্ধে লড়াই করেছে, গোল করেছে, চাপ তৈরি করেছে। ফাবিও ক্যানাভারোর দল অভিষিক্ত হলেও ভয় পায় না। পর্তুগাল যদি আবার ধীর ছন্দে খেলে, বিপদে পড়তে পারে।
শেষ ম্যাচে কলম্বিয়া। গ্রুপে পর্তুগালের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা সম্ভবত সেটিই। লুইস দিয়াস, জেমস রদ্রিগেজ, জন আরিয়াসদের কলম্বিয়া প্রথম ম্যাচে উজবেকিস্তানকে হারিয়ে গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। তবে তাদের খেলাতেও দুর্বলতা ছিল। উজবেকিস্তান গোল করেছে, ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করেছে, দ্বিতীয়ার্ধে চাপও তৈরি করেছে। অর্থাৎ কলম্বিয়া শক্তিশালী, কিন্তু অজেয় নয়।
পর্তুগালের জন্য হিসাব পরিষ্কার। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জিতলে চাপ কমবে। কলম্বিয়ার বিপক্ষে অন্তত ড্র করলেও শেষ ৩২-এর পথ অনেকটাই নিরাপদ হতে পারে। কিন্তু উজবেকিস্তানের বিপক্ষে পয়েন্ট হারালে শেষ ম্যাচটি হয়ে উঠবে প্রবল চাপের লড়াই।
তাই পর্তুগাল সমর্থকদের হতাশ হওয়ার কারণ আছে, কিন্তু আশা ছাড়ার কারণ নেই। প্রথম ম্যাচে সমস্যা ধরা পড়েছে, সেটিই বরং কাজে লাগতে পারে, যদি দল সঠিকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক বড় দল ধীর শুরু করে পরে ছন্দ পেয়েছে। প্রশ্ন হলো, পর্তুগাল কি সেই শিক্ষা নিতে পারবে?
কঙ্গোর বিপক্ষে ড্র পর্তুগালের অহংকারে ধাক্কা দিয়েছে। এখন সেটিই জাগরণের কারণ হতে হবে। রোনালদোর ব্যক্তিগত স্বপ্ন, দলের প্রজন্মগত প্রতিভা এবং মার্তিনেজের কৌশল, সবকিছু এখন এক জায়গায় মিলতে হবে। প্রথম ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ জেতা যায় না। কিন্তু প্রথম ম্যাচের ভুল থেকে না শিখলে বিশ্বকাপ হারিয়ে ফেলা যায়। পর্তুগালের সামনে এখন সেই শিক্ষার পরীক্ষা।
