ইরানের ম্যাচে প্রাক-বিপ্লবী পতাকা, জাতীয় সংগীতের সময় দুয়ো

মাঠে ইরান-নিউজিল্যান্ড ম্যাচ শেষ হয়েছে ২-২ ড্রয়ে। কিন্তু লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে ইরানের বিশ্বকাপ শুরু শুধু ফুটবলের গল্প হয়ে থাকেনি। ম্যাচের আগে ও চলাকালে গ্যালারিতে দেখা গেছে প্রাক-বিপ্লবী ইরানি পতাকা, জাতীয় সংগীতের সময় শোনা গেছে দুয়ো, আর নানা ব্যানারে উঠে এসেছে রাজনৈতিক বার্তা।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকালের ইরান ও নিউজিল্যান্ডের ম্যাচের আগে থেকেই এই ম্যাচ ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনার আভাস ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ইরানি প্রবাসীদের একটি অংশ ইরানের বর্তমান সরকারের বিরোধিতা জানাতে স্টেডিয়ামের বাইরে বিক্ষোভ করে। তাদের অনেকের হাতে ছিল ইরানের প্রাক-বিপ্লবী সিংহ-সূর্য পতাকা।
ফিফা এই ধরনের পতাকা ও প্রতীক স্টেডিয়ামে আনার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। ফিফার যুক্তি ছিল, এগুলো রাজনৈতিক বার্তা বহন করতে পারে এবং স্টেডিয়ামে বিশৃঙ্খলার কারণ হতে পারে। ম্যাচের দিন সকালে লস অ্যাঞ্জেলেসের আদালতে এ নিয়ে জরুরি শুনানিও হয়। এক ইরানি সমর্থক দাবি করেছিলেন, এমন নিষেধাজ্ঞা তাঁর মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে। তবে আদালত ফিফার অবস্থানই বহাল রাখে।
তারপরও স্টেডিয়ামে প্রাক-বিপ্লবী পতাকা দেখা গেছে। ম্যাচ শুরুর আনুষ্ঠানিকতার সময় মাঠে ইরানের বর্তমান রাষ্ট্রীয় পতাকা প্রদর্শনের বিপরীতে গ্যালারির সামনের সারিতে কয়েকজন সমর্থক সিংহ-সূর্য পতাকা তুলে ধরেন। আদালতের সিদ্ধান্তের পরও পতাকা দেখা যাওয়ায় বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে।

তবে সবাই এত সহজে ঢুকতে পারেননি। কয়েকজন সমর্থক প্রাক-বিপ্লবী পতাকার প্রতীকযুক্ত সাদা টি-শার্ট পরে স্টেডিয়ামে ঢোকার চেষ্টা করলে নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের আটকে দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে তাদের টি-শার্ট ঢেকে বা উল্টো করে পরে ঢুকতে দেওয়া হয়।
একজন সমর্থক বলেন, তারা এই প্রতীক পরেছিলেন কারণ তাদের কাছে এটিই ইরানের প্রকৃত পরিচয়ের প্রতীক। আরেক তরুণ সমর্থকের ভাষায়, এর অর্থ স্বাধীনতা।
স্টেডিয়ামে অবশ্য ইরানের বর্তমান পতাকাও ছিল অনেক। অধিকাংশ ইরানি সমর্থক দলকে সমর্থন করছিলেন। কিন্তু একই সঙ্গে কিছু সমর্থক জাতীয় সংগীতের সময় দুয়ো দেন। কেউ কেউ মুখ ফিরিয়েও দাঁড়ান। নিউজিল্যান্ড শুরুতেই গোল করলে সেই অংশের কিছু সমর্থক উল্লাসও করেন।
ম্যাচ চলাকালে আরেকটি ব্যানারও দৃষ্টি কাড়ে। গোলপোস্টের পেছনে সামনের সারিতে কয়েকজন সমর্থক আলাদা আলাদা ব্যানার তুলে “MINAB168” লিখে ধরেন। দ্য অ্যাথলেটিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের একটি স্কুলে নিহত শিশুদের স্মরণে দেওয়া বার্তা। ইরান দলও বিশ্বকাপের আগে মেক্সিকোয় পৌঁছানোর সময় “#168” পিন পরে ওই ঘটনার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছিল।
তবে বিরতির আগে স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষ ওই ব্যানারগুলো সরিয়ে নেয়। ব্যানারধারী কয়েকজন সমর্থক পরে জানান, তাদের কাছে ব্যানার নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করা হয়নি। তাদের দাবি, উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সাধারণ মানুষ ও নিহত শিশুদের স্মরণ করা।
গ্যালারিতে আরও রাজনৈতিক বার্তা দেখা যায়। একাধিক সমর্থক ‘ইরান ম্যাসাকার’ লেখা ব্যানার ধরেন। এসব বার্তা ছিল ইরান সরকারবিরোধী প্রতিবাদের অংশ। তবে এমন সংখ্যাগত দাবি ও ঘটনার ব্যাখ্যা বিভিন্ন পক্ষের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে জড়িত হওয়ায় সেগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।
মাঠের ভেতরেও ম্যাচটি ছিল নাটকীয়। নিউজিল্যান্ডের এলাইজা জাস্ট ৬ ও ৫৪ মিনিটে গোল করে দুইবার দলকে এগিয়ে দেন। ইরানের হয়ে রামিন রেজায়েয়ান ৩১ মিনিটে প্রথম সমতা ফেরান। এরপর ৬৩ মিনিটে মোহাম্মদ মোহেব্বির হেডে আবার ম্যাচে ফেরে ইরান। শেষ পর্যন্ত ২-২ ড্রয়ে পয়েন্ট ভাগাভাগি করে দুই দল।
কিন্তু ফলের বাইরেই এই ম্যাচের বড় গল্প থেকে গেল গ্যালারিতে। প্রবাসী ইরানিদের একাংশের প্রতিবাদ, ফিফার নিষেধাজ্ঞা, আদালতের সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা তল্লাশি, জাতীয় সংগীতে দুয়ো—সব মিলিয়ে ইরানের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হলো রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্য দিয়ে।
২০২২ বিশ্বকাপেও ইরান দলের ম্যাচগুলো রাজনৈতিক আলোচনায় ঘেরা ছিল। এবার যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ হওয়ায় সেই উত্তাপ আরও বেশি দৃশ্যমান। বিশেষ করে লস অ্যাঞ্জেলেসে বড় ইরানি প্রবাসী জনগোষ্ঠী থাকায় ইরানের ম্যাচ শুধুই ফুটবল ম্যাচ হয়ে থাকেনি।
ইরানের সামনে এখন মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি মানসিক চাপ সামলানোর চ্যালেঞ্জও আছে। প্রথম ম্যাচে তারা দুইবার পিছিয়ে পড়েও ড্র করেছে। কিন্তু গ্যালারির বার্তা পরিষ্কার এই বিশ্বকাপে ইরানের প্রতিটি ম্যাচে ফুটবলের সঙ্গে রাজনীতিও পাশাপাশি চলতে পারে।
