Advertisement

জীবনের সেরা রাতে মাকে পাশে পেলেন না ভোজিনিয়া

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
জীবনের সেরা রাতে মাকে পাশে পেলেন না ভোজিনিয়া
ভোজিনিয়া। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপে অভিষেক ম্যাচেই স্পেনকে রুখে ইতিহাস লিখেছে কেপ ভার্দে। কিন্তু সেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নায়ক ভোজিনিয়ার চোখে ছিল জল। ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক জোসিমার জোসে এভোরা দিয়াস, যিনি ভোজিনিয়া নামেই পরিচিত, ম্যাচ শেষে কাঁদছিলেন। শুধু আনন্দে নয়, অপূর্ণতার বেদনাতেও।

আটলান্টায় স্পেনের বিপক্ষে ০-০ ড্রয়ের ম্যাচে ৭টি সেভ করে ম্যাচসেরা হন ভোজিনিয়া। ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ও বর্তমান ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন ২৭টি শট নিয়েও কেপ ভার্দের গোল ভাঙতে পারেনি। ফেরান তোরেসের শট ক্রসবারে লাগে, মিকেল ওয়ারজাবাল, লাপোর্তে, ফাবিয়ান রুইস, কুকুরেয়াদের চেষ্টা বারবার থামিয়ে দেন ভোজিনিয়া। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় রাতটিতে তাঁর মা ছিলেন না স্টেডিয়ামে।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রক্রিয়ার খরচের কারণে ভোজিনিয়ার মা ম্যাচ দেখতে আসতে পারেননি। চলতি বছরে কেপ ভার্দেকে এমন দেশের তালিকায় রাখা হয়, যেখানকার নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে যেতে ভিসা ফির পাশাপাশি সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ফেরতযোগ্য বন্ড দেখাতে হতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় অঙ্কটি প্রায় ১৮ লাখ টাকারও বেশি। সেই খরচের বাধায় ভোজিনিয়ার মা সময়মতো আবেদন সম্পন্ন করতে পারেননি।

ম্যাচ শেষে ভোজিনিয়া বলেন, তিনি কেঁদেছেন কারণ তাঁর দাদা-দাদি আর বেঁচে নেই। ছোটবেলায় তাঁদের কাছেই বড় হয়েছেন তিনি। তাঁর জীবনে তাঁরা ছিলেন সবকিছু। জীবনের সবচেয়ে বড় ফুটবল মুহূর্তে তাঁদের পাশে না পাওয়ার কষ্ট ছিল। একই সঙ্গে মাকে মাঠে না পাওয়ার আক্ষেপও তাঁকে ভেঙে দেয়।

ভোজিনিয়ার কথায়, ভিসার জন্য যে অর্থ দিতে হতো, সেই কারণেই তাঁর মা আসতে পারেননি। তিনি চেয়েছিলেন মা যেন এই মুহূর্তটি নিজের চোখে দেখেন। কিন্তু তা হয়নি। তবু তিনি বলেছেন, তিনি খুব খুশি, কারণ এই ম্যাচ ছিল তাঁর সারা জীবনের পরিশ্রমের ফল।

ভোজিনিয়ার গল্প এমনিতেই রূপকথার মতো। বয়স ৪০। বাজারমূল্য মাত্র ৫০ হাজার ইউরো। বড় ক্লাবের আলো নেই, চ্যাম্পিয়নস লিগের অভিজ্ঞতা নেই, ফুটবলের বাণিজ্যিক দুনিয়ায় তিনি কোনো বড় নামও নন। পর্তুগালের দ্বিতীয় স্তরের ক্লাব জিডি শাভেসের এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক তবু বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন এক রাত উপহার দিলেন, যা তাঁর দেশের ইতিহাসে থেকে যাবে।

ভোজিনিয়া বলেছেন, তিনি সারা জীবন এই মুহূর্তের জন্য কাজ করেছেন। ২৫ বছর বয়সে পেশাদার ফুটবল শুরু করেছিলেন। মাঝপথে ফুটবল ছাড়ার কথাও ভেবেছিলেন। কিন্তু বিশ্বকাপের স্বপ্ন তাঁকে ধরে রেখেছিল। সেই স্বপ্নই তাঁকে আটলান্টার মঞ্চে এনে দাঁড় করায়, যেখানে তাঁর গ্লাভসে আটকে যায় স্পেন।

ম্যাচসেরা হলেও নিজের কৃতিত্ব একা নিতে চাননি কেপ ভার্দের গোলরক্ষক। তিনি বলেছেন, এই পুরস্কার তাঁর সব সতীর্থের। তাঁদের ছাড়া কিছুই সম্ভব ছিল না। তিনি কেপ ভার্দে ও দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যেতে চান।

স্পেনের বিপক্ষে কেপ ভার্দের ড্র শুধু একটি ফল নয়। এটি ছিল ফুটবলের অসম লড়াইয়ের এক নিখুঁত উদাহরণ। একদিকে কৌশলগতভাবে পরিণত, বল দখলনির্ভর, তারকায় ভরা স্পেন। অন্যদিকে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে আসা ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। কিন্তু মাঠে কেপ ভার্দে দেখিয়েছে, সংগঠন, শৃঙ্খলা ও মানসিক দৃঢ়তা দিয়ে বড় প্রতিপক্ষকেও থামানো যায়।

ভোজিনিয়া নিজেও বলেছেন, কেপ ভার্দের সবচেয়ে বড় শক্তি ঐক্য। তাঁর ভাষায়, তাঁরা পরিবারকে যেভাবে দেখেন, সেটিই তাঁদের শক্তি। অনেকেই ভেবেছিল, কেপ ভার্দে শুধু বিশ্বকাপ উপভোগ করতে এসেছে। কিন্তু তারা জানত, তাদের এমন একটি দল আছে, যাকে সম্মান করা দরকার।