Advertisement

ইরানকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
ইরানকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপ শুরুর আগেই ইরান দলকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়ছে। এবার লস অ্যাঞ্জেলেসে বিক্ষোভ করে ইরানকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন একদল ইরানি-আমেরিকান ও অধিকারকর্মী। তাঁদের অভিযোগ, ইরান সরকার বিশ্বকাপকে ব্যবহার করছে নিজেদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভাবমূর্তি আড়াল করার জন্য।

রয়টার্স জানিয়েছে, লস অ্যাঞ্জেলেস সিটি হলের সামনে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেকেই ন্যাশনাল কাউন্সিল অব রেজিস্ট্যান্স অব ইরানের দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করেন। সংগঠনটি ফিফার কাছে ইরানকে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে স্থগিত বা বহিষ্কারের আহ্বান জানিয়েছে।

বিক্ষোভস্থলে ইরানের সাবেক ক্রীড়াবিদদের ছবি প্রদর্শন করা হয়, যাঁদের অনেকের মৃত্যু হয়েছে সরকারি হেফাজতে বা সরকারবিরোধী অবস্থানের কারণে—এমন দাবি করেন আয়োজকেরা। কয়েকজন সাবেক ইরান জাতীয় দলের ফুটবলারও সেখানে বক্তব্য দেন।

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ইরান দল আসলে দেশটির সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি নয়। তাঁদের দাবি, দলটি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির প্রভাবের বাইরে নয়। ১৯৭০ সালে ইরান জাতীয় দলে খেলা আসগর আদিবি বিক্ষোভে বলেন, এটি “আয়াতুল্লাহদের দল”। তাঁর ভাষায়, যে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ আছে, সেই ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্বকারী দলকে বিশ্বকাপে জায়গা দেওয়া ঠিক নয়।

তবে ইরান দলের খেলোয়াড়দের ভূমিকা নিয়ে বিক্ষোভকারীদের মধ্যেও একমত অবস্থান নেই। কেউ কেউ মনে করেন, খেলোয়াড়রা নিজেরাও চাপের মধ্যে থাকা ক্রীড়াবিদ, যাঁদের নীরব থাকতে হয়। আবার অন্যদের দাবি, সরকার শুধু অনুগত খেলোয়াড়দেরই দলে জায়গা দেয়, যাতে টুর্নামেন্টের সময় কোনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়।

রায়ান সালামি নামের ২১ বছর বয়সী এক ইরানি-আমেরিকান বিক্ষোভকারী রয়টার্সকে বলেন, ইরান দলকে বিশ্বকাপে খেলতে দেওয়া হলে বিশ্বের সামনে একটি শান্ত ও স্বাভাবিক ছবি তুলে ধরা হবে। অথচ তাঁর দাবি, ইরানের ভেতরে বাস্তবতা ভিন্ন—সেখানে দমন, মৃত্যুদণ্ড ও কষ্ট আছে।

আরেক বিক্ষোভকারী পেইমানে শাফি বলেন, খেলোয়াড়রা কোনো না কোনোভাবে শাসনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর মতে, নিহত বা নিপীড়িত ক্রীড়াবিদদের ছবিই ইরানের প্রকৃত ক্রীড়াজগতের প্রতীক।

বিক্ষোভকারীদের অনেকেই ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর ইরানে ভিন্নমত দমন, রাজনৈতিক বন্দি, প্রতিবাদকারীদের হত্যা এবং ক্রীড়াবিদদের নিপীড়নের অভিযোগ সামনে আনেন। তাঁদের ভাষায়, বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে ইরান সরকারের অধীনে থাকা দলকে খেলতে দেওয়া মানে সেই বাস্তবতাকে আড়াল করার সুযোগ দেওয়া।

রয়টার্স জানিয়েছে, এ বিষয়ে ফিফা ও ইরান জাতীয় দলের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

ইরান দলকে ঘিরে এই বিক্ষোভ এমন সময়ে হলো, যখন দলটি আগেই বিশ্বকাপে পতাকা ও স্লোগান ইস্যুতে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ইরানের ক্রীড়ামন্ত্রী আহমাদ দুনিয়ামালি বলেছেন, বিশ্বকাপে ইরানের ম্যাচে অননুমোদিত পতাকা দেখানো হলে বা জাতীয় দলকে লক্ষ্য করে স্লোগান দেওয়া হলে দলীয় ম্যানেজার ম্যাচ থামানোর দায়িত্ব নেবেন। বিষয়টি ফিফাকে জানানো হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।


ইরান বর্তমানে মেক্সিকোর তিহুয়ানায় অনুশীলন করছে। যুক্তরাষ্ট্রে তাদের তিনটি গ্রুপ ম্যাচ রয়েছে। ১৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ খেলবে ইরান। এরপর ২১ জুন একই শহরে বেলজিয়ামের মুখোমুখি হবে তারা। ২৬ জুন সিয়াটলে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে প্রতিপক্ষ মিসর।

ভিসা ও যাতায়াত জটিলতাও ইরান দলের প্রস্তুতিকে প্রভাবিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি জানিয়েছে, ইরানি ফুটবলাররা প্রতিটি ম্যাচের আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবেন। তবে ইরান ফুটবল ফেডারেশনের অভিযোগ, তাদের কয়েকজন প্রশাসনিক ও সাপোর্ট স্টাফ ভিসা পাননি।

সব মিলিয়ে ইরানের বিশ্বকাপ অভিযান মাঠের ফুটবলের চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঘেরা হয়ে উঠছে। একদিকে বিক্ষোভকারীদের বহিষ্কারের দাবি, অন্যদিকে ইরানের পতাকা-স্লোগান নিয়ে ম্যাচ থামানোর হুঁশিয়ারি। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই ইরানের ম্যাচগুলো নিরাপত্তা, মতপ্রকাশ, অভিবাসন ও রাজনীতির জটিল পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।