logo

তিউনিসিয়ার বিপক্ষে গোল করেও কেন উদযাপন করেননি আয়ারি?

তিউনিসিয়ার বিপক্ষে গোল করেও কেন উদযাপন করেননি আয়ারি?
গোলের পর আয়ারি। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপ অভিষেকে এর চেয়ে ভালো শুরু খুব কম ফুটবলারেরই হয়। সুইডেনের জার্সিতে প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলতে নেমে তিউনিসিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করেছেন ইয়াসিন আয়ারি। তার গোলেই শুরু, তার গোলেই শেষ। তিউনিসিয়াকে ৫-১ গোলে উড়িয়ে দেওয়া ম্যাচে সুইডেনের বড় নায়ক তিনিই। কিন্তু প্রথম গোলের পর তার উদ্‌যাপন ছিল অস্বাভাবিকভাবে সংযত। কেন?

উত্তরটা লুকিয়ে আয়ারির শিকড়ে। ২২ বছর বয়সি এই মিডফিল্ডার সুইডেনে জন্মেছেন, সুইডেনের বয়সভিত্তিক দলে খেলেছেন, এখন সুইডেন জাতীয় দলের ফুটবলার। কিন্তু তার বাবা তিউনিসীয়, মা মরক্কান। অর্থাৎ যাদের বিপক্ষে তিনি বিশ্বকাপে প্রথম গোল করলেন, সেই তিউনিসিয়ার সঙ্গেই আছে তার পরিবারের গভীর সম্পর্ক।

মন্টেরেতে গ্রুপ ‘এফ’-এর ম্যাচে ৭ মিনিটেই গোল করেন আয়ারি। তিউনিসিয়ার রক্ষণে ভুলের পর বল পেয়ে জোরালো শটে জাল খুঁজে নেন তিনি। বিশ্বকাপ অভিষেকে গোল, স্বাভাবিকভাবে একজন তরুণ ফুটবলারের দৌড়ে গিয়ে উল্লাস করার কথা। কিন্তু আয়ারি তা করেননি। তিনি দুহাত তুলে সংযত ভঙ্গিতে জানিয়ে দেন, এই গোল তিনি বড় কোনো উদ্‌যাপনে রূপ দিতে চান না।

গোলের পর সংযত ছিলেন আইয়ারি
গোলের পর সংযত ছিলেন আইয়ারি

এটি ছিল বাবার দেশের প্রতি সম্মানের প্রকাশ। তিউনিসিয়ার বিপক্ষে গোল করেও তিনি যেন জানিয়ে দিলেন, এই ম্যাচ তার জন্য শুধু ফুটবল ছিল না; ছিল পরিচয়, শিকড় ও সিদ্ধান্তের জটিল আবেগও।

আয়ারি চাইলে তিউনিসিয়ার হয়েও খেলতে পারতেন। তার বাবা আজুজ আয়ারি সুইডিশ সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, তিউনিসিয়ার পক্ষ থেকে আগ্রহ ছিল। তবে বাবা-ছেলে কেউই সেটিকে বাস্তব বিকল্প হিসেবে দেখেননি। আজুজের যুক্তি ছিল, তার ছেলে সুইডেনেই বড় হয়েছে, সুইডেনই তাকে সুযোগ দিয়েছে। তাই আয়ারির উচিত ছিল সেই দেশকেই প্রতিনিধিত্ব করা।

আয়ারি নিজেও সিদ্ধান্তটিকে স্বাভাবিক বলেছেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি সুইডেনের বয়সভিত্তিক দলে খেলেছেন। তাই জাতীয় দল বেছে নেওয়ার সময় তার কাছে সুইডেনের জার্সি পরাই ছিল ধারাবাহিকতার পথ। তবু বিশ্বকাপের ড্রয়ে যখন সুইডেন ও তিউনিসিয়া একই গ্রুপে পড়ে, তখন বিষয়টি তার কাছেও বিশেষ হয়ে ওঠে। কারণ বাবার শিকড়ের দেশের বিপক্ষেই হতে যাচ্ছিল তার বিশ্বকাপ অভিষেক।

আয়ারির ফুটবল-যাত্রা শুরু সুইডেনের সোলনার স্থানীয় ক্লাব রাসুন্দায়। সাত বছর বয়সে ফুটবল শুরু করেন তিনি। এরপর যোগ দেন সুইডেনের বড় ক্লাব এআইকে-তে। ২০২০ সালে এআইকের সিনিয়র দলে অভিষেক হয় তার। প্রতিভা দ্রুত নজর কাড়ে ইউরোপের বড় লিগের ক্লাবগুলোর।

ইয়াসিন আয়ারি।
ইয়াসিন আয়ারি।

২০২৩ সালে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ব্রাইটন অ্যান্ড হোভ অ্যালবিয়নে যোগ দেন আয়ারি। একই বছর সুইডেন জাতীয় দলেও অভিষেক হয় তার। মাঝমাঠে তার বড় শক্তি বল এগিয়ে নেওয়া, দূরপাল্লার শট, দেরিতে বক্সে ঢোকা এবং টেকনিক্যাল ভারসাম্য। তিউনিসিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে এসব গুণই চোখে পড়েছে।

প্রথম গোলের পর সংযত থাকলেও ম্যাচের শেষ দিকে দ্বিতীয় গোলের পর তিনি উদ্‌যাপন করেছেন। যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে দারুণ শটে গোল করেন আয়ারি। তখন সুইডেনের জয় নিশ্চিত, ম্যাচের আবেগ অন্য পর্যায়ে। সেই গোলের পর সতীর্থদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেন তিনি।

তিউনিসিয়ার বিপক্ষে সুইডেনের ৫-১ জয় শুধু আয়ারির গল্প নয়, তবে তার গল্পই ম্যাচটিকে আলাদা আবেগ দিয়েছে। আলেকজান্ডার ইসাক গোল করেছেন, ভিক্টর ইয়োকেরেস গোল করেছেন, মাটিয়াস সভানবেরি বদলি নেমে গোল করেছেন। কিন্তু শিরোনামে থাকবেন আয়ারি—কারণ তিনি শুধু জোড়া গোল করেননি, গোলের পর তার আচরণও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ফুটবলে এমন মুহূর্ত নতুন নয়। দ্বৈত পরিচয়, অভিবাসী পরিবার, শিকড়ের দেশের বিপক্ষে খেলা—আধুনিক আন্তর্জাতিক ফুটবলে এসব ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে সেই আবেগ আরও বড় হয়ে ওঠে। আয়ারির জন্যও তাই তিউনিসিয়ার বিপক্ষে গোল করা ছিল দ্বিমুখী অনুভূতি। একদিকে সুইডেনের জন্য গর্ব, অন্যদিকে বাবার দেশের প্রতি শ্রদ্ধা।

সুইডেনের জন্য আয়ারির পারফরম্যান্স বড় প্রাপ্তি। গ্রুপ ‘এফ’-এ নেদারল্যান্ডস ও জাপান ২-২ ড্র করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে তিউনিসিয়াকে ৫-১ গোলে হারিয়ে সুইডেন শুধু তিন পয়েন্টই পায়নি, গোল ব্যবধানেও বড় সুবিধা নিয়েছে। আর আয়ারি দেখিয়েছেন, বিশ্বকাপের চাপ সামলানোর মতো পরিণত মানসিকতা তাঁর আছে।

তিউনিসিয়ার জন্য রাতটি ছিল কঠিন। বাবার দেশের বিপক্ষে গোল করা আয়ারি প্রথম গোলের পর উল্লাস করেননি। কিন্তু ফুটবল নির্মম। সম্মান দেখালেও মাঠে কাজ থামাননি তিনি। দ্বিতীয় গোল করে সুইডেনের বড় জয় পূর্ণ করেন।