logo

প্রতিদিন দুই ম্যাচ দেখতে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে ইনফান্তিনোর বিশ্বকাপ দৌড়

প্রতিদিন দুই ম্যাচ দেখতে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে ইনফান্তিনোর বিশ্বকাপ দৌড়
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ছবি: সংগৃহীত

২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু দলগুলোর জন্যই নয়, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর জন্যও যেন এক মহাদেশ জোড়া দৌড়। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই তিনি সম্ভব হলে দিনে দুটি করে ম্যাচ দেখার চেষ্টা করছেন। আর সেই লক্ষ্য পূরণে ব্যবহার করছেন ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ।

যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার ১৬ শহরে ছড়িয়ে থাকা এবারের বিশ্বকাপ ভৌগোলিকভাবে ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্তৃত আসরগুলোর একটি। এক শহর থেকে আরেক শহরে যেতে কখনও কয়েকশ মাইল, কখনও হাজার মাইল পাড়ি দিতে হচ্ছে। সেই দূরত্ব সামলাতেই ইনফান্তিনোর যাতায়াতে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিফার স্পনসরশিপ চুক্তির অংশ হিসেবে কাতার এয়ারওয়েজের দেওয়া ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন ইনফান্তিনো। টুর্নামেন্টজুড়ে যত বেশি সম্ভব ম্যাচে উপস্থিত থাকার পরিকল্পনায় সেটিই তার দ্রুততম যাতায়াতের মাধ্যম হয়ে উঠছে।

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী দিন ১১ জুন মেক্সিকো সিটিতে মেক্সিকো-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে ছিলেন ইনফান্তিনো। সেদিনই পরে তিনি যান গুয়াদালাহারায়, দক্ষিণ কোরিয়া-চেকিয়ার ম্যাচ দেখতে। মেক্সিকো সিটি থেকে গুয়াদালাহারা আকাশপথে প্রায় ২৮৫ মাইল, উড়োজাহাজে সময় লাগে এক ঘণ্টার কিছু বেশি।

পরদিন তিনি ছিলেন লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে, যুক্তরাষ্ট্র-প্যারাগুয়ে ম্যাচে। সেখানে তাকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর পাশেও দেখা যায়। এরপর আবার দিনে দুই ম্যাচের সূচিতে ফেরেন ফিফা সভাপতি।

শনিবার বিকেলে সান ফ্রান্সিসকোতে কাতার-সুইজারল্যান্ড ম্যাচ দেখেন ইনফান্তিনো। সেখান থেকে পরে যান কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে, অস্ট্রেলিয়া-তুরস্ক ম্যাচে। এক দিনে দুই দেশ, দুই শহর, দুই ম্যাচ—২০২৬ বিশ্বকাপের ছড়ানো ফরম্যাটে ফিফা সভাপতির সফরসূচিই যেন টুর্নামেন্টের বাস্তবতা বোঝাচ্ছে।

রোববার তিনি ছিলেন মায়ামিতে ফিফা সামিটে। সাউথ বিচের রিটজ কার্লটনে সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোর বৈঠকে যোগ দেন তিনি। ফলে সেদিন কোনো ম্যাচে উপস্থিত ছিলেন না। তবে সেখান থেকেও তার সূচির ব্যস্ততা কমেনি।

সোমবার আবার শুরু হয় ম্যাচ সফর। প্রথমে সিয়াটলে বেলজিয়াম-মিসর ম্যাচে ছিলেন ইনফান্তিনো। এরপর রাতে লস অ্যাঞ্জেলেসে ইরান-নিউজিল্যান্ড ম্যাচে দেখা যায় তাকে।

ফিফার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ফিফা কর্মকর্তাদের ভ্রমণ নিয়ে নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। ফিফা সভাপতি টুর্নামেন্ট ও সংস্থার কাজের প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভ্রমণ করেন এবং সম্ভব হলে সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোর ম্যাচে উপস্থিত থাকার চেষ্টা করেন। কখনও বাণিজ্যিক ফ্লাইট, কখনও ব্যক্তিগত চার্টার ব্যবহার করা হয়—পরিস্থিতি অনুযায়ী যেটি বেশি কার্যকর ও সাশ্রয়ী হয়।

ফিফা আরও জানিয়েছে, ভ্রমণ খরচ ফিফাই বহন করে। সংস্থার সূত্রগুলোর যুক্তি, সভাপতি হিসেবে ইনফান্তিনোর যত বেশি সম্ভব ম্যাচে উপস্থিত থাকা গুরুত্বপূর্ণ। এবারের বিশ্বকাপ তিন দেশ ও ১৬ শহরে হওয়ায় দ্রুততম পথ হিসেবে আকাশপথ ব্যবহার ছাড়া বাস্তবসম্মত বিকল্পও কম।

তবে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনাও হচ্ছে। কারণ ফিফা নিজেই এবারের বিশ্বকাপে টেকসই আয়োজনের কথা বলছে। পরিবেশ সুরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতনতা এবং দায়িত্বশীল ভোগের বার্তা তাদের কৌশলপত্রে আছে। সেই প্রেক্ষাপটে প্রায় প্রতিদিন ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে শহর থেকে শহরে যাওয়া অনেকের চোখে সাংঘর্ষিক।

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর সমালোচনাও সেই জায়গাতেই। তাদের বক্তব্য, বিশ্বকাপের সময় চরম গরম ইতিমধ্যেই খেলোয়াড়, রেফারি ও দর্শকদের জন্য বড় বিষয় হয়ে উঠছে। এমন সময়ে ফুটবলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ ব্যবহার ফিফার পরিবেশ-বার্তার সঙ্গে যায় না।

২০২৬ বিশ্বকাপ এমনিতেই পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে প্রশ্নের মুখে। টুর্নামেন্টটি এবার ৪৮ দল ও ১০৪ ম্যাচে সম্প্রসারিত হয়েছে। ম্যাচ হচ্ছে উত্তর আমেরিকার বিশাল ভৌগোলিক অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা শহরগুলোতে। ফলে দল, সমর্থক, কর্মকর্তা ও সংবাদমাধ্যমকর্মীদের বারবার উড়োজাহাজে ভ্রমণ করতে হচ্ছে।

বিভিন্ন পরিবেশ-গবেষণা ও প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এবারের বিশ্বকাপ আগের আসরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি কার্বন নিঃসরণ তৈরি করতে পারে। দ্য গার্ডিয়ান নিউ ওয়েদার ইনস্টিটিউটের হিসাব উল্লেখ করে লিখেছে, এই বিশ্বকাপ প্রায় ৯০ লাখ টন কার্বন ডাইঅক্সাইড সমপরিমাণ নিঃসরণ তৈরি করতে পারে। এর বড় অংশই আসবে আকাশপথে ভ্রমণ থেকে।

২০২২ কাতার বিশ্বকাপে একই দেশের ভেতরে কম দূরত্বে ম্যাচ হওয়ায় ইনফান্তিনো সব ৬৪ ম্যাচেই উপস্থিত থাকতে পেরেছিলেন। ২০২৬ সালে সেটি প্রায় অসম্ভব। কারণ এবার ম্যাচের শহরগুলো চারটি সময় অঞ্চলে ছড়িয়ে। এক ভেন্যু থেকে আরেক ভেন্যুর দূরত্বও অনেক ক্ষেত্রে কয়েক হাজার মাইল।