Advertisement

স্পেনকে রুখে রাতারাতি ইনস্টাগ্রাম তারকা ভোজিনিয়া

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
স্পেনকে রুখে রাতারাতি ইনস্টাগ্রাম তারকা ভোজিনিয়া
ভোজিনিয়া। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপে এক রাতই অনেক সময় একটি জীবন বদলে দেয়। কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক জোসিমার জোসে এভোরা দিয়াস, যিনি ফুটবল দুনিয়ায় ভোজিনিয়া নামেই বেশি পরিচিত, সেটিই এখন বুঝছেন সবচেয়ে ভালোভাবে। স্পেনের ২৭ শট সামলে, ৭ সেভে কেপ ভার্দেকে ঐতিহাসিক ড্র এনে দিয়ে তিনি শুধু মাঠের নায়কই হননি, রাতারাতি হয়ে উঠেছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচিত মুখ।

আটলান্টায় বিশ্বকাপ অভিষেকের ম্যাচে কেপ ভার্দে ০-০ গোলে রুখে দেয় ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনকে। ম্যাচের আগে হিসাব ছিল একরকম, মাঠে গল্প লেখা হলো আরেকভাবে। বল দখল ৭৪ শতাংশের বেশি, ৮০১ সম্পন্ন পাস, ২৭ শট, ২.২৯ প্রত্যাশিত গোল—সবই ছিল স্পেনের পক্ষে। শুধু গোলটাই ছিল না। কারণ কেপ ভার্দের গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন ভোজিনিয়া।

স্পেনের জন্য রাতটি ছিল হতাশার। ফেরান তোরেসের শট ক্রসবারে লাগে, ওয়ারজাবালের হেড ঠেকান ভোজিনিয়া, লাপোর্তে, ফাবিয়ান, মেরিনো, কুকুরেয়া—অনেকেই চেষ্টা করেন। লামিনে ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস, দানি ওলমো—সব অস্ত্র নামিয়েও গোল পায়নি দে লা ফুয়েন্তের দল। কিন্তু কেপ ভার্দের জন্য রাতটি ছিল ইতিহাসের। আর সেই ইতিহাসের মুখ হয়ে ওঠেন ভোজিনিয়া।

৪০ বছর বয়সী এই গোলরক্ষকের বাজারমূল্য মাত্র ৫০ হাজার ইউরো, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭১ লাখ টাকা। বড় ক্লাবের ক্যারিয়ার নেই, ইউরোপীয় আলোয় দীর্ঘ সময় কাটানো নামও নন। পর্তুগালের দ্বিতীয় স্তরের ক্লাব জিডি শাভেসের এই গোলরক্ষক তবু বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে প্রমাণ করলেন, গল্প লিখতে সব সময় বড় বাজারমূল্য লাগে না।

ভোজিনিয়ার ক্যারিয়ার ছড়িয়ে আছে নানা দেশে। কেপ ভার্দের ক্লাব ফুটবল থেকে শুরু করে আঙ্গোলা, মলদোভা, পর্তুগাল, সাইপ্রাস, স্লোভাকিয়া—অনেক জায়গায় খেলেছেন তিনি। ক্লাব ফুটবলে হয়তো বিশ্বজোড়া খ্যাতি পাননি, কিন্তু জাতীয় দলে তাঁর জায়গা আলাদা। ২০১২ সাল থেকে কেপ ভার্দের হয়ে খেলছেন। স্পেন ম্যাচটি ছিল তাঁর ৮৯তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ।

মাঠের নায়ক হওয়ার পর তাঁকে ঘিরে শুরু হয় অনলাইনের উন্মাদনা। এই জায়গায় আসে কাজে টিভি। ব্রাজিলের জনপ্রিয় ডিজিটাল ক্রীড়া প্ল্যাটফর্মটি ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের দর্শকদের জন্য বড় সম্প্রচারমাধ্যম হয়ে উঠেছে। স্ট্রিমার কাসিমিরো মিগেলের নেতৃত্বে এই প্ল্যাটফর্ম বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোকে তরুণ দর্শকের কাছে আরও কথোপকথনধর্মী, অংশগ্রহণমূলক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমবান্ধব করে তুলেছে।

স্পেন-কেপ ভার্দে ম্যাচ চলাকালেই কাজে টিভির সম্প্রচারে ভোজিনিয়াকে নিয়ে উন্মাদনা তৈরি হয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য সানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাজে টিভি দর্শকদের ভোজিনিয়ার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট অনুসরণ করতে আহ্বান জানায়। এরপরই শুরু হয় অনুসারী বাড়ার বিস্ফোরণ। এক মিনিটেরও কম সময়ে তাঁর অনুসারী দুই লাখের বেশি বেড়ে যায় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

দ্য সানের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ম্যাচ চলার সময় তাঁর অনুসারীর সংখ্যা দ্রুত ২ লাখ ২০ হাজারে ওঠে, পরে ৩ লাখ ৫০ হাজার ছাড়ায়। শেষ বাঁশির সময় তা প্রায় ৩ লাখ ৮৯ হাজারে পৌঁছায়। আর ড্রেসিংরুমে ফেরার সময় সেটি ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মাঠে স্পেনের আক্রমণ ঠেকানো ভোজিনিয়া তাই একই রাতে অনলাইন দুনিয়াতেও আলোচনার কেন্দ্র হয়ে ওঠেন। এই প্রতিবেদন লেখার সময় তার ফলোয়ার হয়ে দাড়ায় ২.২ মিলিয়ন।

Screenshot 2026-06-16 022135
Screenshot 2026-06-16 022135

এই অনুসারী-উল্লম্ফন শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ঘটনা নয়। এটি আধুনিক বিশ্বকাপের নতুন বাস্তবতাও দেখায়। আগে একটি অসাধারণ সেভ, একটি নায়কোচিত পারফরম্যান্স বা একটি অঘটন সংবাদপত্রের পাতায় আটকে থাকত। এখন একটি ম্যাচের মাঝেই একজন গোলরক্ষক বৈশ্বিক আলোচনার চরিত্র, অনলাইন নায়ক এবং লাখো অনুসারীর ব্যক্তিত্ব হয়ে যেতে পারেন। কাজে টিভির মতো নির্মাতা-নির্ভর প্ল্যাটফর্ম সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রেই আছে।

ভোজিনিয়ার ক্ষেত্রে গল্পটি আরও মানবিক। বিশ্বকাপের আগে তিনি বৈশ্বিক দর্শকের কাছে পরিচিত নাম ছিলেন না। স্পেনের মতো দলের সামনে কেপ ভার্দের গোলরক্ষক হিসেবে তাঁর কাজ ছিল প্রায় অসম্ভব। কিন্তু একের পর এক সেভ তাঁকে শুধু ম্যাচসেরা আলোচনায় আনেনি, কেপ ভার্দের প্রথম বিশ্বকাপ পয়েন্টের প্রতীক বানিয়ে দিয়েছে।

স্পেনের বিপক্ষে তাঁর সেভগুলো ছিল শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতার ফল নয়; ছিল অভিজ্ঞতা, অবস্থান নেওয়ার দক্ষতা, আগাম ধারণা এবং মানসিক দৃঢ়তার ফল। ফেরান তোরেসের সুযোগের পর ওয়ারজাবালের হেড ঠেকানো, লাপোর্তের হেডে প্রতিক্রিয়া, কুকুরেয়ার নিচু হেড ধরে ফেলা—প্রতিটি মুহূর্তে তিনি স্পেনকে আরও অস্থির করেছেন।

একসময় স্পেনের খেলোয়াড়রা যেন গোলপোস্টকে ছোট দেখতে শুরু করে। ৮০১ পাস করেও, শেষ তৃতীয়াংশে ৪০০-এর বেশি পাস দিয়েও, ২৭ শট নিয়েও গোল না পাওয়া শুধু কেপ ভার্দের রক্ষণ নয়, ভোজিনিয়ার মানসিক প্রভাবেরও ফল। গোলরক্ষক যখন এমনভাবে ম্যাচে ঢুকে যান, তখন প্রতিপক্ষের প্রতিটি শটের সঙ্গে বাড়তি চাপ যুক্ত হয়।

কেপ ভার্দের রক্ষণভাগও অবশ্য তাঁকে একা ছাড়েনি। পিকো লোপেস শেষ দিকে ওয়ারজাবালের প্রায় নিশ্চিত সুযোগ ঠেকান। ডিফেন্ডাররা বারবার ব্লক করেছেন, শরীর ছুঁড়ে দিয়েছেন, লাইন ধরে রেখেছেন। কিন্তু সেই দেয়ালের সামনে সবচেয়ে বড় মুখ ছিলেন ভোজিনিয়া।

কেপ ভার্দের মতো ছোট দ্বীপরাষ্ট্রের জন্য এই ড্র শুধু ফুটবলীয় ফল নয়। এটি জাতির আত্মবিশ্বাসের মুহূর্ত। প্রথম বিশ্বকাপ, প্রথম ম্যাচ, প্রতিপক্ষ স্পেন—আর সেখানেই গোলশূন্য ড্র। এমন ফল বহু বছর ধরে বলা হবে। আর বলা হবে, সেই রাতে গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক ৪০ বছরের গোলরক্ষক, যার বাজারমূল্য মাত্র ৫০ হাজার ইউরো, কিন্তু যাঁকে ভাঙতে পারেনি স্পেন।

ভোজিনিয়ার গল্প তাই দুই মঞ্চের। মাঠে তিনি স্পেনকে রুখেছেন। অনলাইনে তিনি লাখ লাখ মানুষের মন জিতেছেন। একটি সেভ তাঁকে আলোচনায় এনেছে, আর কাজে টিভির এক আহ্বান তাঁকে ইনস্টাগ্রামের নতুন বিশ্বকাপ নায়ক বানিয়ে দিয়েছে।

বিশ্বকাপের সৌন্দর্য এখানেই। সবচেয়ে দামি ফুটবলাররা আলো পায়, বড় দলগুলো শিরোনাম বানায়। কিন্তু কখনো কখনো কম বাজারমূল্যের এক অভিজ্ঞ গোলরক্ষক সব হিসাব বদলে দেন।

আটলান্টায় সেই রাত ছিল ভোজিনিয়ার। স্পেন গোল পায়নি, কেপ ভার্দে ইতিহাস পেয়েছে, আর ফুটবল পেয়েছে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম বড় অনলাইন নায়ক।