logo

আজ থেকে এক মাস ফুটবলের দখলে পৃথিবী

আজ থেকে এক মাস ফুটবলের দখলে পৃথিবী
ছবি: সংগৃহীত

চার বছরের অপেক্ষার পর আবার সেই দিন। আবার সেই সোনালি ট্রফি, জাতীয় পতাকা, বুকের ভেতর কাঁপুনি ধরানো জাতীয় সংগীত, রাতজাগা সমর্থক, আর এক মাসের বেশি সময়ের জন্য পৃথিবীকে একই ভাষায় কথা বলানোর আয়োজন। উত্তর আমেরিকার তিন দেশ মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় আজ শুরু হচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬।

মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আসতেকায় উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হবে স্বাগতিক মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকা। ফিফার সূচিতে এই ভেন্যুর নাম মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম। বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টায় শুরু হবে ম্যাচটি। এই এক ম্যাচ দিয়েই শুরু হবে এমন এক বিশ্বকাপ, যা আগের সব আসরের চেয়ে বড়, জটিল এবং সম্ভবত সবচেয়ে বেশি আলোচিত।

কারণ ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু ফুটবল মাঠের গল্প নয়; এটি ফরম্যাটের বদল, নতুন ভূগোল, বাণিজ্যিক বিস্তার, রাজনৈতিক উত্তাপ, আবহাওয়ার চ্যালেঞ্জ এবং এক প্রজন্মের সম্ভাব্য বিদায়ের বিশ্বকাপ।

প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলছে ৪৮ দল। ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৪। তিন আয়োজক দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। ১৬টি আয়োজক শহর, তিন ভিন্ন ফুটবল সংস্কৃতি, তিন ভিন্ন প্রশাসনিক বাস্তবতা এবং উত্তর আমেরিকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এক টুর্নামেন্ট। এই বিশ্বকাপ তাই শুধু দল বাড়ানোর পরীক্ষা নয়, ফিফার সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী আয়োজনও।

ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি। ছবি: সংগৃহীত
ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপের সৌন্দর্য সব সময়ই ছিল এর বৈচিত্র্যে। তবে এবার সেই বৈচিত্র্য আরও বড়। ইউরোপ-দক্ষিণ আমেরিকার পরিচিত শক্তির পাশাপাশি আছে আফ্রিকা, এশিয়া, কনকাকাফ ও ছোট ফুটবল জাতির নতুন মুখ। ৪৮ দলের ফরম্যাটের সমালোচনা আছে—মান কমবে কি না, একপেশে ম্যাচ বাড়বে কি না, গ্রুপ পর্বের নাটক কমে যাবে কি না। কিন্তু আরেক দিকও আছে। বিশ্বকাপ এখন আরও বেশি দেশের স্বপ্ন দেখার জায়গা। যে দেশগুলো আগে দূর থেকে দেখত, তারা এবার মাঠে দাঁড়াবে।

মেক্সিকো-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচ দিয়ে শুরু হওয়াটাও প্রতীকী। ২০১০ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেও মুখোমুখি হয়েছিল এই দুই দল। সিফিওয়ে তশাবালালার সেই গোল আজও বিশ্বকাপ স্মৃতির অন্যতম ঝলমলে মুহূর্ত। এবারও দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে স্বাগতিকের গ্যালারি, উচ্চতা, চাপ আর ইতিহাস। অন্যদিকে মেক্সিকোর সামনে নিজেদের মাটিতে নতুন করে শুরু করার সুযোগ।

এই মাঠেই হবে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ
এই মাঠেই হবে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ

প্রথম ম্যাচের ভেন্যু এস্তাদিও আসতেকা নিজেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের অংশ। পেলে, ম্যারাডোনা, ১৯৭০, ১৯৮৬—সব মিলিয়ে এই মাঠে ফুটবল শুধু খেলা নয়, উত্তরাধিকার। এবার সেই মাঠই খুলে দিচ্ছে ২০২৬ বিশ্বকাপের দরজা।

তবে এই বিশ্বকাপের গল্প শুধু অতীতের রোমান্টিকতা নয়। এই আসর বর্তমান ফুটবলের কঠিন বাস্তবতাও সামনে আনছে। টিকিটের দাম নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় নাম দেখানোর মতো ছোট অভিজ্ঞতাকেও পণ্যে পরিণত করার অভিযোগ উঠেছে। ফিফা বলছে, উত্তর আমেরিকার বাজার বাস্তবতা এবং ফুটবল উন্নয়নে বিনিয়োগের জন্য আয় দরকার। সমর্থকদের একাংশ বলছে, বিশ্বকাপ ক্রমেই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফুটবল যার আবেগ, সেই মানুষই কি এখন সবচেয়ে দূরে সরে যাচ্ছে—প্রশ্নটা অস্বস্তিকর।

রাজনীতিও এবার বিশ্বকাপের দরজায় আগেভাগেই এসে দাঁড়িয়েছে। ইরান দলকে ঘিরে ভিসা জটিলতা, প্রতিবাদ, পতাকা ও স্লোগান বিতর্ক; সোমালি রেফারি ওমর আরতানের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ না পাওয়া; আয়োজক দেশের সীমান্তনীতি আর ফিফার বৈশ্বিকতার দাবি—এসব ঘটনা মনে করিয়ে দিয়েছে, বিশ্বকাপ কখনোই পুরোপুরি রাজনীতি থেকে আলাদা নয়। মাঠে বল গড়ানোর আগে অনেক লড়াই হয়ে যায় বিমানবন্দর, ভিসা অফিস, প্রতিবাদ মিছিল আর বৈঠকের টেবিলে।

আবহাওয়াও হতে পারে এবারের অদৃশ্য প্রতিপক্ষ। যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর কিছু ভেন্যুতে গরম, আর্দ্রতা, রোদ, উচ্চতা এবং ভ্রমণের চাপ খেলোয়াড়দের শরীরে প্রভাব ফেলতে পারে। ফুটবল এখন শুধু দক্ষতার খেলা নয়; বিজ্ঞান, পুনরুদ্ধার, ঘুম, পুষ্টি, কন্ডিশনিং এবং জলবায়ুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার খেলাও। যে দল মাঠের বাইরের প্রস্তুতিতে এগিয়ে থাকবে, মাঠেও তারা সুবিধা পেতে পারে।

তবু সবকিছুর শেষে বিশ্বকাপের প্রাণ মাঠেই। সেখানে আছেন লিওনেল মেসি, ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে। আছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, যিনি নিজেই বলেছেন, ২০২৬ বিশ্বকাপই তাঁর শেষ হতে যাচ্ছে। আছেন নেইমার, চোট আর অসম্পূর্ণতার সঙ্গে লড়তে থাকা ব্রাজিলিয়ান প্রতীক। আছেন কিলিয়ান এমবাপে, যিনি নিজের সময়ের সেরা হওয়ার লড়াইয়ে আরও এক ধাপ উঠতে চান। আছেন হ্যারি কেইন, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, জুড বেলিংহাম, লামিন ইয়ামাল, আর্লিং হলান্ড, মোহাম্মদ সালাহ, সন হিউং-মিন—প্রতিটি নামের পেছনে আলাদা গল্প।

আর্জেন্টিনা আসছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হিসেবে। ২০২২ সালের কাতার তাদের ইতিহাস সম্পূর্ণ করেছে, কিন্তু শিরোপা ধরে রাখা সব সময় আলাদা পরীক্ষা। ব্রাজিল আসছে ষষ্ঠ তারার খোঁজে, তবে তাদের পথ আগের মতো নিশ্চিন্ত নয়। ফ্রান্স আবারও গভীর স্কোয়াড নিয়ে ভয়ংকর। ইংল্যান্ডের প্রতিভা আছে, প্রশ্ন আছে চাপ সামলানোর। স্পেনের তরুণ প্রজন্ম, জার্মানির পুনর্গঠন, পর্তুগালের শেষ সুযোগের আবহ, নেদারল্যান্ডসের স্থায়ী অপূর্ণতা—সব মিলিয়ে এবারের বিশ্বকাপের শিরোপা লড়াই অনেক খোলা।

বিশ্বকাপের রেপ্লিকা ট্রফি। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপের রেপ্লিকা ট্রফি। ছবি: সংগৃহীত

আফ্রিকার দলগুলোর জন্যও এটি বড় সুযোগ। মরক্কো ২০২২ সালে সেমিফাইনালে উঠে প্রমাণ করেছিল, ইতিহাস শুধু পুরোনো শক্তির সম্পত্তি নয়। সেনেগাল, আইভরি কোস্ট, ঘানা, মিসর, দক্ষিণ আফ্রিকা—সবাই নতুন প্রেক্ষাপটে নিজেদের জায়গা দাবি করতে চাইবে। এশিয়ার দলগুলোও আর শুধু অংশগ্রহণকারী নয়। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া বহু দিন ধরেই সংগঠিত শক্তি। সৌদি আরব, ইরান, কাতার, অস্ট্রেলিয়া—প্রতিটি দলের সামনেই আলাদা বাস্তবতা।

এই বিশ্বকাপ বাংলাদেশি সমর্থকদের জন্যও অন্য রকম। বাংলাদেশ নেই, তবু বিশ্বকাপ এ দেশে সব সময়ই নিজের উৎসব। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের পতাকায় পাড়া সাজবে, রাত জাগবে শহর, চায়ের দোকানে হবে তর্ক, অফিসে চলবে স্কোরের হিসাব। বাংলাদেশের ফুটবল হয়তো বিশ্বমঞ্চে নেই, কিন্তু বিশ্বকাপের আবেগে বাংলাদেশ সব সময় অংশ নেয়। এটাই এই টুর্নামেন্টের অদ্ভুত শক্তি—যে দেশ খেলছে না, সেই দেশও নিজেকে টুর্নামেন্টের অংশ মনে করে।

আজ থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ যাত্রায় অনেক কিছু বদলে যাবে। কোনো ফেভারিট প্রথম সপ্তাহেই বিপদে পড়বে। কোনো অচেনা তরুণ রাতারাতি তারকা হবে। কোনো বড় নাম শেষবারের মতো চোখ ভেজাবে। কোনো গোল বছরের পর বছর ফিরে ফিরে দেখা হবে। কোনো পেনাল্টি, কোনো অফসাইড, কোনো ভিএআর সিদ্ধান্ত একটি দেশের স্মৃতিতে ক্ষত হয়ে থাকবে। আবার কোনো ছোট দেশ হয়তো প্রথম জয় পেয়ে নিজের ফুটবল ইতিহাস নতুন করে লিখবে।

বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই। সব বিশ্লেষণ, সব ফর্ম, সব র‍্যাঙ্কিং, সব বাজি—প্রথম বাঁশি বাজার পর অর্ধেকই অকার্যকর হয়ে যায়। তখন বল, ঘাস, চাপ, সাহস আর মুহূর্তের সিদ্ধান্তই সব।

২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে সবচেয়ে বড় আয়োজন হিসেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার মূল্য নির্ধারণ করবে মাঠের গল্প। ফিফার বাণিজ্য, রাজনীতির ছায়া, গরমের চাপ, দীর্ঘ ভ্রমণ, সম্প্রসারিত ফরম্যাট—সবকিছুর মধ্যেও যদি ফুটবল নিজের জাদু ধরে রাখতে পারে, তাহলে এই বিশ্বকাপ শুধু সবচেয়ে বড় নয়, সবচেয়ে স্মরণীয়ও হয়ে উঠতে পারে।

আজ সেই গল্পের প্রথম পৃষ্ঠা খুলছে মেক্সিকো সিটিতে। এখন শুধু অপেক্ষা—প্রথম বাঁশি, প্রথম গোল, প্রথম বিস্ময়।