logo

বিশ্বকাপ জিততে ‘স্মার্ট ভেস্টে’ ভরসা ব্রাজিলের

বিশ্বকাপ জিততে ‘স্মার্ট ভেস্টে’ ভরসা ব্রাজিলের
ছবি: সংগৃহীত

ব্রাজিলের ফুটবল মানেই প্রতিভা, ছন্দ, ব্যক্তিগত দক্ষতা আর আক্রমণাত্মক সৌন্দর্য। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে ষষ্ঠ শিরোপার খোঁজে নামা ব্রাজিল এবার শুধু সেই পুরোনো পরিচয়ের ওপর নির্ভর করছে না। কার্লো আনচেলত্তির দলের প্রস্তুতিতে বড় জায়গা নিয়েছে প্রযুক্তিও।

বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের গতি, হৃদ্‌স্পন্দন, ক্লান্তি, চোট থেকে ফেরার অবস্থা এবং ম্যাচের শারীরিক চাপ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বিশেষ ট্র্যাকিং ভেস্টের মাধ্যমে। দেখতে অনেকটা আঁটসাঁট অনুশীলন পোশাকের মতো হলেও এই ‘স্মার্ট ভেস্ট’ আসলে খেলোয়াড়ের শরীর ও মাঠের কাজের নানা তথ্য সংগ্রহ করে।

সেন্সরযুক্ত এই ভেস্টে থাকে জিপিএস ও নানা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা। খেলোয়াড় কতটা দৌড়ালেন, কতবার দ্রুতগতির স্প্রিন্ট করলেন, শরীর কতটা চাপ নিল, হৃদ্‌স্পন্দন কত উঠল—এসব তথ্য সংগ্রহ করা যায় এর মাধ্যমে। আধুনিক ফুটবলে এখন এই ডেটা শুধু অনুশীলনের বাড়তি অংশ নয়, বরং দল গঠন, চোট ব্যবস্থাপনা ও ম্যাচ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ।

এই তথ্য শুধু ক্লাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ব্রাজিল জাতীয় দলের স্পোর্টস সায়েন্স বিভাগ নিয়মিত ক্লাবগুলোর কাছ থেকে খেলোয়াড়দের তথ্য নেয়। ফলে জাতীয় দলের কোচিং স্টাফ খেলোয়াড়দের কাছে না থাকলেও বুঝতে পারে, কে কতটা ফিট, কে বেশি চাপের মধ্যে আছে, কার চোট থেকে ফেরা কতটা নিরাপদ।

স্মার্ট ভেস্ট গায়ে নেইমার
স্মার্ট ভেস্ট গায়ে নেইমার

জাতীয় দলের জন্য এটি বড় সুবিধা। ক্লাব কোচরা প্রতিদিন খেলোয়াড়দের সঙ্গে থাকেন, কিন্তু জাতীয় দলের কোচদের হাতে সময় খুব কম। অনেক ফুটবলার খেলেন ভিন্ন ভিন্ন লিগে—কেউ ইউরোপে, কেউ দক্ষিণ আমেরিকায়, কেউ আবার অন্য মহাদেশে। তাই একই মানদণ্ডে সবার ফিটনেস, গতি ও শারীরিক প্রস্তুতি বিচার করা কঠিন। ট্র্যাকিং ডেটা সেই ব্যবধান কিছুটা কমিয়ে দেয়।

ব্রাজিল জাতীয় দলের স্পোর্টস সায়েন্স বিভাগের সঙ্গে যুক্ত গিলের্মে পাসোস আগেও জানিয়েছেন, জাতীয় দলের কাজে জিপিএস, অভ্যন্তরীণ চাপ পর্যবেক্ষণ, হৃদ্‌স্পন্দন ও খেলোয়াড়রা মাঠে কি করছেন সেই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব তথ্য জাতীয় দলের ডেটাবেসে যুক্ত হলে খেলোয়াড়রা ক্যাম্পে যোগ দেওয়ার আগেই তাঁদের শারীরিক অবস্থার একটি পরিষ্কার ছবি পাওয়া যায়।

চোট ব্যবস্থাপনাতেও এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে হ্যামস্ট্রিং বা পেশির চোট থেকে ফেরা ফুটবলারদের ক্ষেত্রে কতটা দ্রুত দৌড়ানো নিরাপদ, কতটা স্প্রিন্ট করা উচিত, কোন পর্যায়ে ম্যাচে নামানো যায়—এসব সিদ্ধান্তে ডেটা বড় ভূমিকা রাখে। কোনো খেলোয়াড় খুব দ্রুতগতির হলে তাঁর পুনর্বাসনেও উচ্চগতির দৌড়ের পরিমাণ ধাপে ধাপে বাড়াতে হয়।

তবে বিষয়টি শুধু ফিটনেস নয়। ট্যাকটিক্যাল পরিকল্পনাতেও ডেটা কাজে লাগে। কোনো খেলোয়াড় খুব দ্রুত হলে কোচ তাঁকে পাল্টা আক্রমণভিত্তিক পরিকল্পনায় ব্যবহার করতে পারেন। কারও পুনরুদ্ধারের গতি ভালো হলে তাঁকে শুরু থেকে খেলানো হতে পারে, আবার কারও ক্লান্তির ঝুঁকি থাকলে তাঁকে বদলি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

ব্রাজিলের অনুশীলনে সবচেয়ে কার্যকর সঙ্গী এই স্মার্ট ভেস্ট।
ব্রাজিলের অনুশীলনে সবচেয়ে কার্যকর সঙ্গী এই স্মার্ট ভেস্ট।

বিশ্বকাপ চলাকালেও এই ধরনের তথ্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কয়েক দিনের ব্যবধানে ম্যাচ থাকায় খেলোয়াড়দের ক্লান্তি ও পুনরুদ্ধার পর্যবেক্ষণ করতে হয় নিয়মিত। কে পরের ম্যাচে পুরো ৯০ মিনিটের জন্য প্রস্তুত, কে বিশ্রাম চাইতে পারে, কার ঝুঁকি বেশি—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ব্রাজিল ডেটার সাহায্য নিচ্ছে।

তবে ব্রাজিলের স্পোর্টস সায়েন্স দলও জানে, ডেটা সবকিছু নয়। ফুটবল কেবল দৌড়ানোর খেলা নয়। একজন খেলোয়াড় কম দৌড়ালেও তিনি যদি সব সময় সঠিক জায়গায় থাকেন, তাহলে তাঁর কার্যকারিতা অনেক বেশি হতে পারে। সংখ্যার বাইরে পজিশনিং, সিদ্ধান্ত নেওয়ার গতি, ম্যাচ পড়ার ক্ষমতা—এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এই কারণেই ব্রাজিল ডেটাকে সিদ্ধান্তের একমাত্র উৎস বানাচ্ছে না। কোচের চোখ, খেলোয়াড়ের মানসিকতা, ট্যাকটিক্যাল বোঝাপড়া, নেতৃত্বগুণ—এসবও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। কোনো খেলোয়াড়ের শারীরিক ডেটা ভালো হলেই তিনি যে আনচেলত্তির পরিকল্পনায় জায়গা পাবেন, তা নয়।

এবারের বিশ্বকাপেও প্রযুক্তির ব্যবহার আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। ফিফার অফিশিয়াল টেকনোলজি পার্টনার লেনোভো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নানা ব্যবস্থা, দ্রুত তথ্যপ্রবাহ, সম্প্রচার সহায়তা এবং টুর্নামেন্ট পরিচালনার প্রযুক্তি দিচ্ছে। তবে সেখানেও মূল কথা এক—প্রযুক্তি সিদ্ধান্তে সহায়তা করতে পারে, শেষ সিদ্ধান্ত নেয় মানুষই।

পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল গত পাঁচ বিশ্বকাপে শিরোপা জিততে পারেনি। ২০০২ সালের পর ২৪ বছর কেটে গেছে। প্রতিবারই বড় প্রত্যাশা নিয়ে গিয়ে হতাশা নিয়ে ফিরেছে তারা। এবার সেই অপেক্ষা শেষ করতে চায় সেলেসাও। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনিয়া, নেইমারদের মতো তারকা আছেন, সঙ্গে আছে আনচেলত্তির অভিজ্ঞতা। তবে নেইমারের ফিটনেস নিয়েও নজর আছে দলের।

এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে শরীরের ভেতরের তথ্য পড়ার প্রযুক্তি। কে কত দ্রুত, কে কত ক্লান্ত, কে কতটা ঝুঁকিতে—এসব জানা থাকলে পরিকল্পনা আরও নিখুঁত হতে পারে।

তবু শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জেতায় ডেটা নয়, মাঠের পারফরম্যান্সই সিদ্ধান্ত নেবে। স্মার্ট ভেস্ট ব্রাজিলকে প্রস্তুত হতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু গোল করতে হবে খেলোয়াড়দেরই। প্রযুক্তি পথ দেখাবে, ইতিহাস লিখবে পা, মাথা আর সিদ্ধান্তের সেই মুহূর্তগুলো।