logo

উৎসব, প্রতিবাদ আর উচ্চ টিকিটদামে শুরু মেক্সিকোর বিশ্বকাপ

উৎসব, প্রতিবাদ আর উচ্চ টিকিটদামে শুরু মেক্সিকোর বিশ্বকাপ
ছবি: সংগৃহীত

মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আসতেকায় আলো, গান আর গ্যালারিভরা সবুজ ঢেউয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হলো ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। কিন্তু মাঠের ভেতরের উৎসবের বাইরে রাজধানীর রাস্তায় ছিল আরেক ছবি শিক্ষক, অধিকারকর্মী ও নিখোঁজ মানুষের স্বজনদের বিক্ষোভে বিশ্বকাপের প্রথম দিনেই সামনে এল মেক্সিকোর সামাজিক অস্থিরতা।

মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্বোধনী ম্যাচের আগে এস্তাদিও আসতেকায় আয়োজন করা হয় বর্ণিল অনুষ্ঠান। সেখানে তুলে ধরা হয় মেক্সিকোর সংস্কৃতি, সংগীত ও উৎসবের নানা রূপ। মারিয়াচি পোশাক, সমব্রেরো, ট্রাম্পেট আর গ্যালারিভরা মেক্সিকান সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে স্টেডিয়াম যেন উৎসবের শহরে পরিণত হয়।

উদ্বোধনী মঞ্চে পারফর্ম করেন শাকিরা, বার্না বয় ও জে বালভিন। বিশ্বকাপের অফিশিয়াল গান ‘ডাই ডাই’ পরিবেশন করেন শাকিরা ও বার্না বয়। আলো ও রঙে ভরে ওঠে আসতেকা। মেক্সিকান সমর্থকদের কাছে এই মুহূর্ত ছিল গর্বেরও। কারণ ১৯৮৬ সালের পর আবার নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপের আবহ পেল মেক্সিকো।

এস্তাদিও আসতেকার বাইরে এক মেক্সিকান সমর্থক রেপ্লিকা ট্রফি হাতে গর্বের কথা বলেন। তাঁর কাছে আসতেকা শুধু স্টেডিয়াম নয়, মেক্সিকান ফুটবলের মন্দির। তিনি বিশ্বাস করেন, বিশ্বকাপ শুরু হলে প্রতিবাদের বিষয়গুলো অনেকটাই আড়ালে চলে যাবে।

কিন্তু মাঠের বাইরে বাস্তবতা এত সরল ছিল না। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী দিনেও মেক্সিকো সিটিতে অন্তত ছয়টি বিক্ষোভের পরিকল্পনা ছিল। বিভিন্ন দাবিতে রাস্তায় নামেন শিক্ষক, শ্রমজীবী মানুষ, অধিকারকর্মী এবং মাদক-সহিংসতায় নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের অনেকেই বিশ্বকাপের আন্তর্জাতিক মনোযোগকে নিজেদের দাবি তুলে ধরার সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

এস্তাদিও আসতেকা থেকে কয়েক মাইল দূরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা হাজারো শিক্ষক মিছিল শুরু করেন। তাঁদের দাবি—ভালো বেতন, পেনশন সংস্কার এবং শিক্ষা খাতে বেশি সহায়তা। ওআহাকা থেকে আসা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক জানান, বিশ্বকাপের আলোচনার মধ্যে তাঁদের দাবিগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

টুর্নামেন্ট শুরুর আগের কয়েক দিন ধরে মেক্সিকো সিটির কেন্দ্রীয় জোকালো স্কয়ারের আশপাশেও অবস্থান নিয়েছিলেন শিক্ষকরা। এতে উদ্বোধনী ম্যাচের দিন ফ্যান জোন খোলা থাকবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। পরে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করে, বড় পর্দায় ম্যাচ দেখার জন্য জোকালো ফ্যান জোন খোলা থাকবে।

শেষ পর্যন্ত সেখানে ভিড় জমে বিপুলসংখ্যক দর্শকের। আয়োজকদের হিসাবে, ৫০ হাজারের বেশি মানুষ জোকালো স্কয়ারে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ দেখতে জড়ো হন। অনেকের জন্য স্টেডিয়ামে যাওয়ার সুযোগ ছিল না, কারণ টিকিটের দাম ছিল নাগালের বাইরে।

টিকিটের উচ্চমূল্য নিয়ে স্থানীয়দের ক্ষোভও ছিল স্পষ্ট। উদ্বোধনী ম্যাচে কিছু দর্শক জানিয়েছেন, তাঁরা ৩ হাজার ডলার বা তার বেশি খরচ করেছেন। বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকার কাছাকাছি। মেক্সিকোর অধিকাংশ সাধারণ মানুষের জন্য এমন দাম প্রায় অসম্ভব। ফিফা অবশ্য টিকিটমূল্যের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছে, বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরের সঙ্গে তুলনা করলে এই দাম অস্বাভাবিক নয়।

তবে অনেক মেক্সিকো সিটির বাসিন্দা এ ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। তাঁদের অভিযোগ, বিশ্বকাপ ঘিরে শহরকে পর্যটকদের জন্য সাজানো হচ্ছে—নতুন রং, নতুন ট্রেন, সংস্কার করা স্টেডিয়াম—সবই দৃশ্যমান। কিন্তু শহরের গভীর অবকাঠামোগত সমস্যা, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও সামাজিক বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো রয়ে গেছে আগের জায়গাতেই।

উদ্বোধনী দিনের জন্য মেক্সিকো সিটিতে স্কুল বন্ধ রাখা এবং সরকারি কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এর একটি কারণ ছিল পরিবহনব্যবস্থার ওপর চাপ কমানো। কিন্তু রাজধানীর প্রধান সড়কের বিভিন্ন জায়গায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপত্তার জন্য ইস্পাতের ব্যারিকেড বসায়। একদিকে পর্যটকদের স্বাগত জানাতে সাজানো শহর, অন্যদিকে সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে ব্যারিকেড—এই দ্বৈত ছবিই বিশ্বকাপের প্রথম দিনে মেক্সিকো সিটির বাস্তবতা তুলে ধরে।

মাঠের ভেতরে ছিল উৎসব, মাঠের বাইরে ছিল প্রশ্ন। ফুটবল কি মানুষের ক্ষোভ ঢেকে দিতে পারে, নাকি আরও বড় আলোয় সেই ক্ষোভকে সামনে আনে—মেক্সিকোর উদ্বোধনী দিন সেই প্রশ্নও তুলে দি