logo

যুদ্ধ-ভিসা জটিলতার মাঝেও বিশ্বকাপ স্বপ্নে ইরান

যুদ্ধ-ভিসা জটিলতার মাঝেও বিশ্বকাপ স্বপ্নে ইরান
ইরান ফুটবল দল। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপ মানেই সাধারণত স্বপ্ন, উচ্ছ্বাস, পতাকা আর ফুটবল উৎসব। কিন্তু ইরানের জন্য ২০২৬ বিশ্বকাপের গল্পটা অনেক বেশি ভারী। মাঠে নামার আগে তাদের সামনে শুধু প্রতিপক্ষ নয়; বরং রয়েছে যুদ্ধের বাস্তবতা, ভিসা অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক চাপ এবং দেশের মানুষের কষ্টের খবর।

ইরান এমন এক বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাচ্ছে, যেখানে তাদের গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচ হবে যুক্তরাষ্ট্রে। অথচ দেশটি এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের ছায়ায় অবরুদ্ধ। এই বৈরী পরিস্থিতি ইরান দলের বিশ্বকাপ প্রস্তুতিকে স্বাভাবিক থাকতে দেয়নি। তুরস্কের আনতালিয়ায় দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে অনুশীলন করছে দলটি। দলের কয়েকজন খেলোয়াড় আবার যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার আবেদন জমা দিতে আঙ্কারার মার্কিন দূতাবাসেও গেছেন।

ইরানের বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেক দিন ধরেই ছিল। ভিসা পরিস্থিতি পুরোপুরি পরিষ্কার না হওয়ায় এখনো সব দুশ্চিন্তা কাটেনি। তবে মেক্সিকোর ভিসা প্রক্রিয়া শেষ হওয়ায় সপ্তাহান্তে দলটির মেক্সিকো যাওয়ার কথা রয়েছে। শুরুতে ইরানের বেস ক্যাম্প করার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার টুসনে। কিন্তু ভিসা জটিলতার কারণে সেটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে মেক্সিকোর তিজুয়ানায়।

এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি ফুটবলারদের মানসিকতায়ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ইরানের অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার সাঈদ এজাতোলাহি সরাসরিই বলেছেন, বিষয়টি মোটেও সহজ নয়। ২৯ বছর বয়সী এই ফুটবলারের জন্য এটি হতে যাচ্ছে তৃতীয় বিশ্বকাপ। এর আগে ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপেও খেলেছেন তিনি। অভিজ্ঞতা থাকলেও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও যুদ্ধের খবর যে ফুটবলারদের মনে মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করছে, সেটি অকপটে স্বীকার করেছেন তিনি।

এজাতোলাহির ভাষায়, তার মতো অভিজ্ঞদের জন্য এমন পরিস্থিতি সামলানো কিছুটা সহজ হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজটা কঠিন তো বটেই; কারণ খেলোয়াড়েরা মাঠের বাইরে সারাক্ষণ দেশের খবর রাখছেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি খেলোয়াড় ও সাধারণ মানুষের মনকে প্রভাবিত করবেই।

ইরানের প্রথম দুই ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে লস অ্যাঞ্জেলেসের কাছের শহর ইঙ্গলউডে। ওই অঞ্চলে একটি বড় ইরানি কমিউনিটি রয়েছে, যাঁদের অনেকেই বর্তমান ইরান সরকারের বিরোধী। ফলে মাঠের পরিবেশও ইরান দলের জন্য খুব একটা স্বাভাবিক হবে না। গ্যালারিতে অনেক ইরানি সমর্থক থাকবেন বলে আশা করছেন এজাতোলাহি। তবে সেই সমর্থন যেমন শক্তি জোগাবে, তেমনি প্রত্যাশার চাপও বাড়াবে।

তবুও এজাতোলাহি বলেছেন, তাঁরা চান ইরানিদের গর্বিত করতে। তাঁর কথায়, ইরানিরা পৃথিবীর যেকোনো কঠিন কাজের জন্যই প্রস্তুত—মাঠে সেটাই প্রমাণ করতে চান তাঁরা।

দলের আরেক ফুটবলার মোহাম্মদ ঘোরবানি প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে যাচ্ছেন। ২৪ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডারের কাছেও পরিস্থিতি সহজ নয়। তবে তাঁর ভাবনা পরিষ্কার—ফুটবলার হিসেবে তাঁদের কাজ কেবল অনুশীলন করা, খেলা এবং সামনে থাকা প্রতিযোগিতার জন্য নিজেদের উজার করে প্রস্তুত রাখা।

ঘোরবানি বলেছেন, দেশের মানুষ যুদ্ধের কারণে অনেক কঠিন সময় পার করছে। সেই মানুষদের কিছুটা আনন্দ দেওয়ার জন্যই তাঁরা বিশ্বকাপে যাচ্ছেন। তাঁর বিশ্বাস, ভালো ফল করতে পারলে সেটি ইরানের মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলতে পারে।

ইরান খেলবে ‘জি’ গ্রুপে। ১৫ জুন নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ইঙ্গলউডে প্রথম ম্যাচ খেলবে তারা। ২১ জুন একই ভেন্যুতে প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ ২৬ জুন, সিয়াটলে মিসরের বিপক্ষে। সূচি অনুযায়ী প্রথম ম্যাচের আগের দিন, অর্থাৎ ১৪ জুনের আগে ইরান দলের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

তবুও প্রস্তুতির প্রতিটি ধাপে অনিশ্চয়তা লেগে আছে। ভিসা, ভ্রমণ, রাজনৈতিক উত্তেজনা—সব মিলিয়ে ইরানের বিশ্বকাপ যাত্রা হয়ে উঠেছে এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। মাঠের বাইরের এত চাপ সামলে মাঠে নিজেদের সেরাটা দেওয়া সহজ হবে না।

তবে এজাতোলাহি এটাকেই বড় দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন। জাতীয় দলের অংশ হতে পেরে গর্বিত তিনি। তাঁর মতে, খেলোয়াড়দের মন পরিষ্কার ও সতেজ রাখতে হবে। কারণ তাঁদের লক্ষ্য শুধু ম্যাচ খেলা নয়; দেশের প্রতিনিধিত্ব করা, মানুষের জন্য লড়াই করা এবং ইরানি ফুটবলের শক্তি বিশ্বকে দেখানো।

ঘোরবানির বার্তাও একই রকম। তাঁর কাছে এই বিশ্বকাপে ইরানের সবচেয়ে বড় পরিচয় হবে ‘ঐক্য’। তিনি বলেছেন, ইরান দল দেখাতে চায়, এক পতাকার নিচে তারা একতাবদ্ধ। এই দল পুরো দেশকে আনন্দ দিতে পারে এবং বিশ্বকে ইরানি ফুটবলার ও মানুষের শক্তি দেখাতে পারে।

বিশ্বকাপের আগে ইরানের গল্প তাই শুধু ফুটবলের নয়। এটি যুদ্ধের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এক অপরাজেয় দলের গল্প। এমন এক দলের গল্প, যারা জানে মাঠের প্রতিটি পাস, প্রতিটি ট্যাকল কিংবা প্রতিটি গোল দেশের মানুষের কাছে ভিন্ন এক অর্থ বহন করবে।

ইরানের ফুটবলাররা হয়তো যুদ্ধ থামাতে পারবেন না। ভিসা রাজনীতি কিংবা কূটনৈতিক উত্তেজনা সামলানোও তাঁদের হাতে নেই। কিন্তু ৯০ মিনিটের সবুজ মাঠে তাঁরা অন্তত একটি কাজ করতে পারেন—দেশের মানুষকে কিছু সময়ের জন্য হলেও সব দুঃখ ভুলিয়ে আনন্দ দিতে পারেন।

এই অদম্য বিশ্বাস নিয়েই বিশ্বকাপে যাচ্ছে ইরান।