logo
বিশ্বকাপের বাকি ১৯ দিন

গিজনের কলঙ্ক: যে ম্যাচ বদলে দিয়েছিল বিশ্বকাপের নিয়ম

গিজনের কলঙ্ক: যে ম্যাচ বদলে দিয়েছিল বিশ্বকাপের নিয়ম
ছবি: সংগৃহীত

ফুটবলকে বলা হয় সুন্দর খেলা। কিন্তু এই সুন্দর খেলার ইতিহাসেও এমন কিছু রাত আছে যেগুলো আলো নয়, বরং অস্বস্তি ছড়ায়। ১৯৮২ সালের ২৫ জুন, স্পেনের গিজনের এল মলিনন স্টেডিয়ামে তেমনই এক রাত দেখেছিল বিশ্বকাপ। স্কোরলাইন ছিল খুব সাধারণ, পশ্চিম জার্মানি ১, অস্ট্রিয়া ০। কিন্তু এই ১-০ ব্যবধানের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত অধ্যায়গুলোর একটি, যার নাম পরে হয়ে যায় ‘ডিসগ্রেস অব গিজন’ বা গিজনের কলঙ্ক।

সেদিন মাঠে ফুটবল খেলা ঠিকই হয়েছিল, কিন্তু ফুটবলের প্রাণটাই যেন হারিয়ে গিয়েছিল।

স্পেন বিশ্বকাপে আলজেরিয়া ছিল নবাগত, কিন্তু প্রথমবার বিশ্বকাপে নেমেই তারা ফুটবল বিশ্বকে চমকে দেয়। শক্তিশালী পশ্চিম জার্মানিকে ২-১ গোলে হারিয়ে আফ্রিকান দলটি জানিয়ে দিয়েছিল, বিশ্বকাপে তার ঘুরতে আসেনি। স্বপ্ন, সাহস আর লড়াইয়ের জন্য এসেছে। এরপর অস্ট্রিয়ার কাছে হারলেও চিলিকে হারিয়ে শেষ ষোলোয় ওঠার বড় সম্ভাবনা তৈরি করে আলজেরিয়া।

কিন্তু সমস্যা দাঁড়ায় সেসময়ের বিশ্বকাপ সূচিতে। আলজেরিয়া নিজেদের শেষ ম্যাচ খেলে ফেলেছিল এক দিন আগে। তাই পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার সামনে হিসাবটা পরিষ্কার ছিল। পশ্চিম জার্মানি ১ বা ২ গোলের ব্যবধানে জিতলে দুই দলই পরের রাউন্ডে যাবে। আর আলজেরিয়া বাদ পড়বে। অর্থাৎ মাঠে নামার আগেই দুই ইউরোপীয় দল জানত, কোন ফল তাদের দুজনকেই নিরাপদে রাখবে।

তারপর সেই ম্যাচে যা হলো, তা ফুটবলের জন্যই লজ্জার।

west germany won the match 1-0
west germany won the match 1-0

ম্যাচের ১০ মিনিটে পশ্চিম জার্মানির হর্স্ট হ্রুবেশ গোল করলেন। পশ্চিম জার্মানি এগিয়ে গেল ১-০ গোলে। এই গোলের পর যে ম্যাচ উত্তেজনায় আরও জমে ওঠার কথা, সেটি উল্টো ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে গে নেই। পুরো মাঠে বল এদিক-ওদিক ঘুরলো, খেলোয়াড়রা হাঁটল, সময় পেরিয়ে গেল। দুই দলই জানত, আর কিছু করার দরকার নেই।

গ্যালারির মানুষ কিন্তু বুঝতে দেরি করেনি। স্প্যানিশ দর্শক, আলজেরিয়ান সমর্থক, টিভির সামনে বসা কোটি মানুষ, সবাই দেখছিলেন এক অদ্ভুত নাটক। ম্যাচের ফল নির্ধারিত নয়, কিন্তু ম্যাচের উদ্দেশ্য যেন স্পষ্ট। দর্শকদের ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে স্টেডিয়ামে। কেউ আলজেরিয়ার নাম ধরে চিৎকার করছিলেন, কেউ বিদ্রূপ করছিলেন, কেউ আবার খেলোয়াড়দের দিকে টাকা দেখিয়ে ইঙ্গিত করছিলেন, এই খেলা আর খেলা নেই।

supporters showing money to both team players
supporters showing money to both team players

ফুটবলের সৌন্দর্য অনেক সময় স্কোরলাইনে থাকে না, থাকে চেষ্টায়। হারলেও যদি দল লড়াই করে, দর্শক সেটিকে সম্মান করে। কিন্তু গিজনে সেদিন সবচেয়ে বেশি অনুপস্থিত ছিল সেই চেষ্টাটাই। পশ্চিম জার্মানি আর অস্ট্রিয়া নিয়ম ভাঙেনি, কিন্তু খেলাটির আত্মাকে আঘাত করেছিল। কাগজে-কলমে এটি ছিল বৈধ ফল। নৈতিকতার কোর্টে ছিল এক বড় পরাজয়।

supporters were angry
supporters were angry

আলজেরিয়ার জন্য বিষয়টি ছিল আরও নির্মম। তারা নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপেই দুই ম্যাচ জিতেছিল। পশ্চিম জার্মানির মতো শক্তিকে হারিয়েছিল। চিলির বিপক্ষে জিতে আশা বাঁচিয়ে রেখেছিল। কিন্তু নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের শেষ সুযোগ তাদের হাতে ছিল না। অন্য দুই দলের ৯০ মিনিট তাদের স্বপ্ন শেষ করে দেয়। তারা বাদ পড়ে গোল ব্যবধানে, অথচ ইতিহাস মনে রাখে, আলজেরিয়া মাঠে যতটা হারেনি, তার চেয়ে বেশি হেরেছিল সূচির অন্যায়ে।

এই ম্যাচের পর সমালোচনার ঝড় ওঠে। আলজেরিয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানায়। কিন্তু ফিফা জানায়, নিয়ম ভাঙার প্রমাণ নেই। সত্যি বলতে, সমস্যাটাও ছিল সেখানেই। নিয়ম ভাঙা হয়নি, কারণ নিয়মটাই তখন এমন ছিল যে, শেষ ম্যাচে নামা দলগুলো আগে থেকেই হিসাব বুঝে নিতে পারত।

গিজনের কলঙ্ক তাই শুধু একটি ম্যাচের গল্প নয়। এটি ফুটবল প্রশাসনেরও শিক্ষা। এই ঘটনার পরই বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের শেষ রাউন্ডের ম্যাচ একই সময়ে আয়োজনের নিয়ম চালু হয়। আজ আমরা যেটিকে স্বাভাবিক মনে করি, সেই একই সময়ে শেষ ম্যাচ শুরুর ধারণার পেছনে আছে ১৯৮২ সালের সেই অস্বস্তিকর ম্যাচের গল্প।

চার দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। বিশ্বকাপ বদলেছে, দল বেড়েছে, ফরম্যাট বদলেছে, প্রযুক্তি এসেছে, ভিএআর এসেছে। কিন্তু গিজনের নাম উঠলেই ফুটবল এখনো একটু থমকে যায়। কারণ সেই ম্যাচ মনে করিয়ে দেয়, জয় সব সময় সম্মানের সমার্থক নয়। কখনো কখনো একটি দল জেতে, আর খেলা হেরে যায়।

২০২৬ বিশ্বকাপ সামনে। আবারও ছোট দল, বড় দল, নতুন স্বপ্ন, পুরোনো ইতিহাস নিয়ে শুরু হবে ফুটবলের সবচেয়ে বড় উৎসব। এই উৎসবের সৌন্দর্যই হলো অনিশ্চয়তা। যে দলকে কেউ গোনায় ধরে না, তারাই কখনো বিশ্বকে চমকে দেয়। ১৯৮২ সালের আলজেরিয়ার মতো।

গিজনের কলঙ্ক তাই আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ এটি শুধু অতীতের একটি কুখ্যাত ম্যাচ নয়, এটি সতর্কবার্তা। বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রতিটি মিনিট শুধু স্কোরের জন্য নয়, বিশ্বাসের জন্যও খেলা হয়। দর্শক টিকিট কাটে ফল দেখার জন্য নয়, লড়াই দেখার জন্য। আর যখন সেই লড়াই ইচ্ছা করেই হারিয়ে যায়, তখন ১-০ স্কোরলাইনও ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরাজয় হয়ে দাঁড়ায়।

গিজনে সেদিন পশ্চিম জার্মানি জিতেছিল, অস্ট্রিয়াও এগিয়েছিল। কিন্তু ফুটবল? ফুটবল সেদিন মাথা নিচু করে মাঠ ছেড়েছিল।