logo
বিশ্বকাপ ফোকাস

ব্রাজিলকে জেতার ভাষা শিখিয়েছিলেন যে আর্জেন্টাইন

ব্রাজিলকে জেতার ভাষা শিখিয়েছিলেন যে আর্জেন্টাইন
আন্তোনিও সাস্ত্রে। ছবি: সংগৃহীত

ব্রাজিলের ফুটবল বললে চোখের সামনে ভেসে ওঠে পেলে, গারিঞ্চা, জিকো, রোনালদো, রোনালদিনহো, নেইমার। ভেসে ওঠে হলুদ জার্সির ঝলক, সাম্বার ছন্দ, পায়ের জাদু আর পাঁচটি বিশ্বকাপের গর্ব। কিন্তু এই মহাকাব্যের ভেতরেও লুকিয়ে আছে এক বিস্ময়কর আর্জেন্টাইন অধ্যায়।

একজন আর্জেন্টাইন, যাকে ব্রাজিলের সর্বকালের সেরা পেলে এতটাই শ্রদ্ধা করতেন যে ১৯৬৫ সালে এজেইজা বিমানবন্দরে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ নিজের দিকে পড়তে দেখে তিনি ফটোগ্রাফারদের বলেছিলেন, ছবি তুলতে হলে ওই মানুষটির ছবি তুলুন। সেই মানুষটি ছিলেন আন্তোনিও সাস্ত্রে।

ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে এমন দাবি প্রথম শুনলে বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে, একজন আর্জেন্টাইন নাকি ব্রাজিলকে ফুটবল শিখিয়েছিলেন! আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের ফুটবল শত্রুতার ইতিহাস জানলে কথাটা আরও অবিশ্বাস্য শোনায়। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসের গভীরে গেলে দেখা যায়, এই কথার ভেতরে নিছক রসিকতা নয়, আছে বড় এক সাংস্কৃতিক সত্য।

সাস্ত্রে ব্রাজিলকে ড্রিবল শেখাননি। ব্রাজিলিয়ানদের পায়ের কারুকাজ, গতি, শরীরী ছন্দ, ব্যক্তিগত দক্ষতা তার আগেও ছিল। তিনি বরং সেই শিল্পে যোগ করেছিলেন কার্যকারিতা। ব্রাজিলের ফুটবলে মিশিয়েছিলেন সংগঠন, ফলের তাগিদ, গোল করার বাস্তব বুদ্ধি। সৌন্দর্যকে কীভাবে জয়ে রূপ দিতে হয়, সেই ভাষাটাই যেন শিখিয়েছিলেন তিনি।

sastre playing days
sastre playing days

সাস্ত্রের জন্ম ১৯১১ সালের ২৭ এপ্রিল, আর্জেন্টিনার লোমাস দে জামোরায়। শুরুটা প্রোগ্রেসিস্তা ক্লাবে, ১৯২৯ সালে। ছোট ক্লাব, সীমিত আলো, কিন্তু প্রতিভা লুকিয়ে থাকেনি। ইন্দিপেন্দিয়েন্তের কিংবদন্তি মানুয়েল সেওয়ানে তাকে খুঁজে পান। এক প্রীতি ম্যাচে সুযোগ, এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি।

১৯৩১ থেকে ১৯৪৩, ইন্দিপেন্দিয়েন্তের হয়ে সাস্ত্রের ক্যারিয়ারই তাকে আর্জেন্টাইন ফুটবলের বড় নামের কাতারে বসিয়ে দেয়। ৩৪১ ম্যাচ, ১১২ গোল, ক্লাব ইতিহাসে উপস্থিতি ও গোলের তালিকায় উঁচু জায়গা। ভিসেন্তে দে লা মাতা ও আর্সেনিও এরিকোর সঙ্গে তার আক্রমণভাগ ছিল আর্জেন্টিনার ফুটবলে এক দুঃস্বপ্ন-ত্রয়ী।

তবে সাস্ত্রেকে শুধু গোলসংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। তার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল বহুমুখিতা। মূলত বাঁ দিকের ইনসাইড ফরোয়ার্ড, আজকের ভাষায় আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার বা সেকেন্ড স্ট্রাইকারের মতো ভূমিকা। কিন্তু তিনি মাঠের প্রায় সব জায়গাতেই খেলেছেন। এমনকি দুবার গোলকিপার হিসেবেও দাঁড়িয়েছেন, সান লরেঞ্জো ও পেনারোলের বিপক্ষে। একজন ফুটবলার কতটা বুদ্ধিমান হলে নিজের অবস্থান বদলালেও খেলাটির নিয়ন্ত্রণ হারান না, সাস্ত্রে ছিলেন তার নিখুঁত উদাহরণ।

জাতীয় দলেও তার গল্প ছোট, কিন্তু উজ্জ্বল। আর্জেন্টিনার হয়ে মাত্র ৩৪ ম্যাচই যথেষ্ট হয়েছিল তাকে আলাদা করে চেনানোর জন্য। ১৯৩৭ সালের দক্ষিণ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রাজিলের ভয়ংকর বাঁ দিক সামলাতে কোচ সেওয়ানে তাকে ফাইনালে রাইট-ব্যাক হিসেবে ব্যবহার করেন। একজন আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়কে ডিফেন্সে নামানো, সেটিও ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাইনালে, এ সিদ্ধান্তই বলে দেয় সাস্ত্রের ওপর আস্থাটা কত গভীর ছিল।

এরপর আসে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়।

ত্রিশ পেরিয়ে যাওয়া সাস্ত্রেকে ইন্দিপেন্দিয়েন্তে আর আগের মতো মূল্য দিতে চায়নি। অনেকের চোখে তার সেরা সময় শেষ। সেই সময়ই তিনি পাড়ি জমান ব্রাজিলে, সাও পাওলোতে। ক্লাবটি তখন করিন্থিয়ানস ও পালমেইরাসের ছায়ায় ঢাকা, রাজ্য ফুটবলে বড় প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে লড়াই করতে চাইছে, কিন্তু দরকার এক বড় তারকার। সাস্ত্রে সেই শূন্যস্থান পূরণ করলেন।

শুরুটা অবশ্য মসৃণ ছিল না। ব্রাজিলে তাকে বেশি অনুশীলন করাতে চাওয়া হয়েছিল। সাস্ত্রে নাকি বলেছিলেন, তার শরীর এমন অতিরিক্ত অনুশীলনের প্রয়োজন পড়ে না। শুনতে অহংকারের মতো লাগতে পারে। কিন্তু মাঠে নেমে তিনি দ্রুত প্রমাণ করেন, তার দাবি ছিল অভিজ্ঞতার দাবি।

sastre in his sao paolo days
sastre in his sao paolo days

সাও পাওলোতে তার প্রভাব ছিল তাৎক্ষণিক। ১৯৪৩ সালে পর্তুগেসা সান্তিস্তাকে ৯-০ গোলে হারানোর ম্যাচে তিনি একাই করেন ছয় গোল। সেই মৌসুমেই সাও পাওলো ১২ বছরের অপেক্ষা ভেঙে কাম্পেওনাতো পাউলিস্তা জেতে। এরপর ১৯৪৫ ও ১৯৪৬ সালেও শিরোপা। সাস্ত্রে হয়ে ওঠেন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ‘প্রথম বিদেশি আইডল’।

বিষয়টি শুধু এক বিদেশি তারকার সফলতার গল্প নয়। সাস্ত্রের আগমনের আগে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ছিল অসাধারণ প্রতিভাবান, কিন্তু অনেক সময় অতিরিক্ত শিল্পনির্ভর। পায়ের কাজ ছিল, শরীরী ছন্দ ছিল, প্রতিপক্ষকে বোকা বানানোর ক্ষমতা ছিল, কিন্তু সব সময় গোলের নির্মমতা ছিল না। খেলাটি যেন অনেক সময় প্রদর্শনী, আনন্দ, ব্যক্তিগত সৌন্দর্যের উৎসব হয়ে থাকত।

সাস্ত্রে সেই সৌন্দর্যকে ফলাফলের সঙ্গে মিলিয়ে দিলেন। ব্রাজিলিয়ান ফুটবলকে তিনি ইউরোপীয় যান্ত্রিকতায় আটকে দেননি, আবার আর্জেন্টাইন প্রাগম্যাটিজমের ছায়ায় ঢেকেও দেননি। তিনি দেখালেন, কৌশল মানে শিল্পের মৃত্যু নয়। বরং সংগঠন ও সিদ্ধান্তের শুদ্ধতা থাকলে শিল্প আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

এই জায়গাতেই সাস্ত্রের গুরুত্ব। ব্রাজিলের ফুটবল তার নিজস্ব আত্মা হারায়নি। সাম্বা, ড্রিবল, কৌশলী শরীরী ভাষা, প্রতিপক্ষকে ছন্দে ভাসিয়ে নেওয়ার প্রবণতা, সবই ছিল। কিন্তু সেই খেলায় ঢুকে পড়ল আরেকটি শব্দ: কার্যকারিতা।

পেলের সঙ্গে সাস্ত্রের সম্পর্কটিও এই ইতিহাসকে আরও রোমাঞ্চকর করে তোলে। পেলের বাবা ডনদিনিও নাকি ছেলেকে বলেছিলেন, একদিন যদি সাও পাওলোতে আন্তোনিও সাস্ত্রের মতো খেলতে পারো, তাতেই আমি সন্তুষ্ট হব। সেই ছেলেই পরে হয়ে উঠলেন ফুটবলের রাজা। তাই সাস্ত্রেকে ব্রাজিলের পাঁচ বিশ্বকাপের সরাসরি স্থপতি বলা নিশ্চয়ই অতিরঞ্জন। কিন্তু ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের পরিণতিতে তাঁর প্রভাব অস্বীকার করাও ইতিহাসের প্রতি অবিচার।

১৯৫৮ সালে সুইডেনে ব্রাজিল প্রথম বিশ্বকাপ জিতল। সেই দলে ছিলেন তরুণ পেলে, যিনি বড় হয়েছিলেন সাস্ত্রের নাম শুনে। ব্রাজিল তখন মারাকানাজোর দুঃস্বপ্ন পেরিয়ে নতুন আত্মবিশ্বাস খুঁজে পেয়েছে। খেলার সৌন্দর্য তখনও আছে, কিন্তু সঙ্গে এসেছে জেতার নির্মম দক্ষতা। সাস্ত্রে সেই বিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ, প্রায় বিস্মৃত সেতু।

ফুটবল ইতিহাসে অনেক সময় বড় পরিবর্তন আসে এমন মানুষের হাত ধরে, যাদের নাম পরের প্রজন্মের মুখে খুব বেশি থাকে না। সাস্ত্রে তেমনই এক চরিত্র। তিনি পেলে নন, গারিঞ্চা নন, ম্যারাডোনা বা মেসিও নন। কিন্তু তিনি এমন এক ফুটবলার, যাঁকে দেখে পেলে নিজে সম্মান দেখিয়েছিলেন। এমন এক আর্জেন্টাইন, যাকে ব্রাজিলের মানুষ ‘মায়েস্ত্রো’ বলে ডাকত।

ব্রাজিল আজ পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। তাদের ফুটবল ইতিহাসে গর্বের নামের অভাব নেই। তবু সেই ইতিহাসের ভেতর কোথাও একটি নীরব আর্জেন্টাইন ছায়া আছে। আন্তোনিও সাস্ত্রে, যিনি ব্রাজিলকে ফুটবল শেখাননি, কিন্তু ব্রাজিলিয়ান ফুটবলকে আরও কার্যকর, আরও পরিণত, আরও ভয়ংকর হতে সাহায্য করেছিলেন।