ইকুয়েডরের সুযোগ নষ্টের রাতে আইভরি কোস্টের শেষ হাসি

ইকুয়েডর সুযোগ পেয়েছিল। একবার নয়, বারবার। কিন্তু কখনো ক্রসবার, কখনো গোলরক্ষক, কখনো নিজেদের ভুল সিদ্ধান্ত তাদের গোল থেকে বঞ্চিত করেছে। আর সেই সুযোগ নষ্টের মূল্য দিতে হলো শেষ মুহূর্তে। ৯০ মিনিটে আমাদ দিয়ালোর গোলে ইকুয়েডরকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করল আইভরি কোস্ট।
ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামে ম্যাচটি দীর্ঘ সময় গোলশূন্য থাকার পর শেষ দিকে নাটকীয় মোড় নেয়। যখন মনে হচ্ছিল দুই দলই হয়তো পয়েন্ট ভাগাভাগি করে মাঠ ছাড়বে, তখনই ডান দিক দিয়ে দুর্দান্তভাবে এগিয়ে যান উইলফ্রিদ সিঙ্গো। সেন্টারব্যাক হয়েও বল নিয়ে অনেকটা জায়গা পেরিয়ে যান তিনি। এরপর নিখুঁত কাটব্যাক দেন বক্সের প্রান্তে অপেক্ষায় থাকা আমাদের দিকে।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের উইঙ্গার বল পেয়ে সময় নষ্ট করেননি। বাঁ পায়ে সুন্দর ফিনিশিংয়ে বল পাঠান নিচের কোণে। ইকুয়েডর গোলরক্ষকের কিছু করার ছিল না। আইভরি কোস্টের বেঞ্চ, খেলোয়াড় ও সমর্থকেরা তখন উল্লাসে ফেটে পড়েন। ইকুয়েডরের খেলোয়াড়দের চোখে হতাশা, কারণ ম্যাচটি তারা অনেক আগেই নিজেদের দিকে নিতে পারত।
প্রথমার্ধ থেকেই ম্যাচে ছিল গতি ও শারীরিক লড়াই। ইকুয়েডর শুরুতে বলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। মাঝমাঠে ময়সেস কাইসেদো প্রভাব বিস্তার করেন, এননার ভ্যালেন্সিয়া সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। ১০ মিনিটে ভ্যালেন্সিয়া ভালো সুযোগ পেয়েও শট উড়িয়ে দেন। যদিও সেই আক্রমণে বল আগে লাইন পেরিয়ে গিয়েছিল বলে গোল হলেও হয়তো টিকত না, তবু সেটি ছিল ইকুয়েডরের আগ্রাসী শুরুর ইঙ্গিত।
এরপর ইকুয়েডরকে বারবার থামিয়েছে ক্রসবার। জন ইয়েবোয়া দুর্দান্ত বাঁকানো শটে গোলের খুব কাছে গিয়েছিলেন। তাঁর শট ক্রসবারে লাগে। কিছুক্ষণ পর পেদ্রো ভিতের পাস থেকে আলান মিনদা গোলের সামনে সুযোগ পান। তাঁর শটও গিয়ে লাগে ক্রসবারে। প্রথমার্ধেই দুইবার কাঠামোতে বল লাগায় ইকুয়েডর বুঝে যায়, রাতটা হয়তো তাদের নয়।
আইভরি কোস্টও চুপ করে ছিল না। ফ্রাঙ্ক কেসিয়ে মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে এগিয়ে গিয়ে বাজুমানা তুরেকে সুযোগ তৈরি করে দেন। তুরের ক্রস-না-শট প্রায় গোল হয়ে যাচ্ছিল। ইয়ান দিয়োমান্দে ডান দিক দিয়ে বারবার ইকুয়েডরের রক্ষণকে অস্বস্তিতে ফেলেন। পিয়েরো হিনকাপিয়েকে কয়েকবার গতি দিয়ে পেছনে ফেলেন তিনি।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে উইলফ্রিদ সিঙ্গো কর্নার থেকে প্রায় অবিশ্বাস্য এক গোল করে ফেলেছিলেন। ফিরতি বলে তিনি বাইসাইকেল কিক নেন, তবে বল অল্পের জন্য ওপরে দিয়ে যায়। বিরতিতে ম্যাচ গোলশূন্য থাকলেও দুই দলের সুযোগ দেখে মনে হচ্ছিল, গোল আসা সময়ের ব্যাপার।
দ্বিতীয়ার্ধেও একই ছবি। ইকুয়েডর আক্রমণ শুরু করে বেশি তীব্রতায়। ভ্যালেন্সিয়া ও গঞ্জালো প্লাতা মিলে বক্সের কাছে ভালো আক্রমণ গড়েন। প্লাতার বাঁ পায়ের জোরালো শট ইয়াহিয়া ফোফানা ঠেকিয়ে দেন। অন্যদিকে আইভরি কোস্টের হয়ে এলি ওয়াহির কাছের পোস্টের প্রচেষ্টা ক্রসবারে লাগে। এই ম্যাচে কাঠামো যেন তৃতীয় দল হয়ে উঠেছিল।
দুই কোচই মাঝপথে বদলি এনে ম্যাচের গতি বদলাতে চান। আইভরি কোস্ট নামায় আমাদ দিয়ালো ও আনজে-ইয়োয়ান বনিকে। ইকুয়েডর আনে নিলসন আঙ্গুলো, অ্যাঞ্জেলো প্রেসিয়াদো ও জ্যাকসন পোরোসোকে। কিন্তু দীর্ঘ সময় গোলের মুখ খুলছিল না।
শেষ ২০ মিনিটে ম্যাচ আরও টানটান হয়ে ওঠে। দুদিকেই ফাউল, হলুদ কার্ড ও শারীরিক সংঘর্ষ বাড়তে থাকে। সেকো ফোফানা, ফ্রাঙ্ক কেসিয়ে ও গেয়ালা দোয়েদের কার্ড আইভরি কোস্টকে সতর্ক করে। দোয়ে দ্বিতীয় হলুদের ঝুঁকিতে থাকায় শেষ দিকে তাঁকে তুলে নেওয়া হয়।
ইকুয়েডর শেষদিকে আবার চাপ বাড়িয়েছিল। হিনকাপিয়ে, কাইসেদো, আঙ্গুলোরা চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পাসে তারা নিখুঁত হতে পারেনি। ৮৮ মিনিটেও কর্নার পেয়েছিল ইকুয়েডর, কিন্তু কাজে লাগাতে পারেনি। তারপরই আসে ম্যাচের নির্ণায়ক মুহূর্ত।
৯০ মিনিটে সিঙ্গো ডান দিক দিয়ে উঠে যান প্রায় বিনা বাধায়। ইকুয়েডরের রক্ষণ তখন জায়গা ছেড়ে দেয়। তাঁর পাসে আমাদ যে শান্ত মাথার ফিনিশিং করলেন, সেটাই দুই দলের পার্থক্য গড়ে দিল। ইকুয়েডর সারা ম্যাচে যত সুযোগ পেয়েও গোল করতে পারেনি, আইভরি কোস্ট শেষ মুহূর্তে এক সুযোগেই ম্যাচ শেষ করে দেয়।
যোগ করা সময়ে ইকুয়েডর মরিয়া চেষ্টা করেছে। কাইসেদো শেষ কর্নার নিতে এগিয়ে যান। কিন্তু আইভরি কোস্ট রক্ষণ দৃঢ় ছিল। শেষ বাঁশি বাজতেই নিশ্চিত হয় আফ্রিকানদের বড় জয়।
