যে হ্যাটট্রিকের স্বীকৃতি পেতে লেগেছিল ৭৬ বছর

বিশ্বকাপের ইতিহাসে হ্যাটট্রিক মানেই এক ধরনের অমরত্ব। তিনটি গোল, এক ম্যাচ, আর নাম উঠে যায় ফুটবলেরে সোনালি ইতিহাসে। কিন্তু বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রথম হ্যাটট্রিকের গল্পটি এত সহজ নয়। এখানে আছে গোল, আছে ভুল হিসাব, আছে দশকের পর দশক ধরে চলা বিতর্ক, আছে এক ফুটবলারের নীরব অপেক্ষা। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, যিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম হ্যাটট্রিক করেছিলেন, জীবিত থাকতে তিনি সেই স্বীকৃতি পাননি।
১৯৩০ সালের ১৭ জুলাই, উরুগুয়ের মন্টেভিডিওতে যুক্তরাষ্ট্র মুখোমুখি হয়েছিল প্যারাগুয়ের। প্রথম বিশ্বকাপ তখনও নতুন, অনিশ্চিত, ছোট পরিসরের এক টুর্নামেন্ট। আজকের মতো শত ক্যামেরা, ভিএআর, ডেটাবেস, লাইভ গ্রাফিকস, তাৎক্ষণিক রেকর্ড আপডেট কিছুই ছিল না। কে গোল করলেন, কখন করলেন, সেটিও অনেক সময় নির্ভর করত ম্যাচ রিপোর্ট, সংবাদপত্র আর কর্মকর্তাদের নথির ওপর। সেই বাস্তবতার মাঝেই যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড বার্ট প্যাটেনড প্যারাগুয়ের বিপক্ষে এমন কীর্তি করেন, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম হ্যাটট্রিক হিসেবে আজ স্বীকৃত। গিনেস বিশ্ব রেকর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩০ বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ওই ম্যাচেই প্যাটেনড প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক করেন।
ম্যাচটি যুক্তরাষ্ট্র জিতেছিল ৩-০ গোলে। আজকের হিসাব বলে, তিনটি গোলই করেছিলেন প্যাটেনড। কিন্তু বহু বছর ধরে এই হিসাব এত পরিষ্কার ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে আর্জেন্টিনার গিয়ের্মো স্তাবিলে-কে বিশ্বকাপের প্রথম হ্যাটট্রিক-ম্যান হিসেবে ধরা হতো। কারণ, স্তাবিলে ১৯ জুলাই ১৯৩০, অর্থাৎ প্যাটেনডের ম্যাচের দুই দিন পরে মেক্সিকোর বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৬-৩ জয়ের ম্যাচে তিন গোল করেছিলেন। তখনকার বহু বই, রেকর্ড ও আলোচনায় সেটিকেই প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক হিসেবে লেখা হয়েছিল।

সমস্যা ছিল প্যাটেনডের দ্বিতীয় গোল নিয়ে। কেউ সেটি তার গোল বলেছে, কেউ বলেছে টম ফ্লোরির গোল, কেউ আবার আত্মঘাতী গোল হিসেবে লিখেছে। ফলে ম্যাচে তার গোলসংখ্যা দুই না তিন, এ নিয়ে দীর্ঘদিন বিভ্রান্তি থেকে যায়। ফুটবল ইতিহাসে এমন বিভ্রান্তি আজ অদ্ভুত মনে হতে পারে, কিন্তু ১৯৩০-এর বিশ্বকাপে রেকর্ড সংরক্ষণ ছিল অনেক বেশি ছড়ানো ও অসম্পূর্ণ। একটি গোলের মালিকানা ভুলভাবে নথিবদ্ধ হওয়াই একজন খেলোয়াড়ের অমরত্ব কেড়ে নিতে যথেষ্ট ছিল।
আর প্যাটেনডের ক্ষেত্রেও প্রায় সেটিই হয়েছিল।
বার্ট প্যাটেনড ১৯০৯ সালে জন্ম নেওয়া এক মার্কিন ফরোয়ার্ড। তিনি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র দলের সেই প্রজন্মের অংশ, যারা ১৯৩০ বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল পর্যন্ত উঠেছিল। আজকের ফুটবল মানচিত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে আমরা ভিন্নভাবে দেখি, কিন্তু ১৯৩০ সালে তাদের দল ছিল প্রতিযোগিতামূলক এবং প্রথম বিশ্বকাপে দারুণ ফল করেছিল। বেলজিয়ামকে ৩-০ গোলে হারানোর পর প্যারাগুয়ের বিপক্ষেও ৩-০ জয়, আর সেই ম্যাচেই প্যাটেনডের নাম ইতিহাসে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু ইতিহাস তাকে অপেক্ষায় রাখে।

এই অপেক্ষা ছিল দীর্ঘ। কয়েক বছর নয়, কয়েক দশক। প্যাটেনড মারা যান ১৯৭৪ সালে। তার মৃত্যুর সময়ও বিশ্বকাপের প্রথম হ্যাটট্রিকের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি তার নামে ছিল না। যে রেকর্ড একটি ফুটবলারের ক্যারিয়ারকে চিরস্থায়ী আলোয় রাখার কথা, সেটি তার জীবদ্দশায় ঠিকমতো তার কাছে পৌঁছায়নি।
শেষ পর্যন্ত ২০০৬ সালে ফিফা ব্যাপক যাচাই-বাছাইয়ের পর প্যাটেনডকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম হ্যাটট্রিক-স্কোরার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। অর্থাৎ প্যাটেনডের হ্যাটট্রিকের স্বীকৃতি পেতে সময় লেগেছিল ৭৬ বছর।
এই গল্পের সৌন্দর্য এখানেই। ফুটবলে অনেক সময় রেকর্ড তৈরি হয় মাঠে, কিন্তু তার সত্যিকারের স্বীকৃতি আসে আর্কাইভে। প্যাটেনডের হ্যাটট্রিক ছিল মাঠের ঘটনা, কিন্তু তার পুনর্জন্ম হয়েছিল ইতিহাসের নথিতে। পুরোনো রিপোর্ট, ম্যাচ বিবরণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য, ফুটবল গবেষণা, সব মিলিয়ে এক ভুলে যাওয়া কীর্তি আবার সামনে আসে।
গিয়ের্মো স্তাবিলে অবশ্য তাতে ছোট হয়ে যান না। আর্জেন্টিনার সেই ফরোয়ার্ড ১৯৩০ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন। মেক্সিকোর বিপক্ষে তার হ্যাটট্রিকও ঐতিহাসিক। কিন্তু প্রথম হওয়ার সম্মানটি শেষ পর্যন্ত ফিরে যায় প্যাটেনডের কাছে, কারণ তার তিন গোল এসেছিল দুই দিন আগে। ইতিহাসের পার্থক্য কখনো কখনো এতটাই সূক্ষ্ম, মাত্র ৪৮ ঘণ্টা এবং একটি গোলের মালিকানার ভুল হিসাব।
বিশ্বকাপের হ্যাটট্রিক পরে বহু কিংবদন্তির গল্প তৈরি করেছে। পেলে, জাস্ট ফন্টেইন, জার্ড মুলার, গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, পাওলো রসি, গনসালো হিগুয়াইন, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, কিলিয়ান এমবাপে, কত নাম। কিন্তু তালিকার শুরুতে এখন দাঁড়িয়ে আছেন বার্ট প্যাটেনড, এমন এক ফুটবলার যার কীর্তি বহু বছর ধুলো জমা নথির নিচে চাপা ছিল।
২০২৬ বিশ্বকাপ সামনে। আবারও কেউ হয়তো এক ম্যাচে তিন গোল করবে, রাতারাতি নায়ক হবে, সামাজিক মাধ্যমে তার নাম ছড়িয়ে পড়বে। কয়েক সেকেন্ডে ক্লিপ ভাইরাল হবে, ডেটাবেস আপডেট হবে, পরিসংখ্যান তৈরি হবে। কিন্তু প্রায় এক শতাব্দী আগে প্যাটেনডের সময়টা ছিল অন্যরকম। তখন ইতিহাস লেখা হতো ধীরে, ভুল হতো সহজে, আর সংশোধন আসতে লাগত দশকের পর দশক।
