logo
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

ব্রাজিলের সামনে আজ মরোক্কোর দেয়াল

ব্রাজিলের সামনে আজ মরোক্কোর দেয়াল
ছবি: সংগৃহীত

ভোর রাতে বিশ্বকাপের মঞ্চে মাঠে নামছে ফুটবল বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় দল ব্রাজিল, কিন্তু এবার তাদের ঘিরে চিরচেনা একচ্ছত্র ফেভারিটের আবহ নেই। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা এখনো বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দল। তবে ২০০২ সালের পর শিরোপা জিততে না পারার ২৪ বছরের অপেক্ষা তাদের ওপর চাপও বাড়িয়েছে। সেই চাপ নিয়েই গ্রুপ ‘সি’র প্রথম ম্যাচে মরক্কোর মুখোমুখি হবে কার্লো আনচেলত্তির দল।

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ম্যাচটি শুরু হবে স্থানীয় সময় শনিবার সন্ধ্যা ৬টায়, বাংলাদেশ সময় রোববার ভোর ৪টায়। ব্রাজিলের জন্য এটি শুধু বিশ্বকাপ শুরুর ম্যাচ নয়, দীর্ঘদিনের হতাশা কাটানোর নতুন অভিযানের প্রথম পরীক্ষাও।

পরীক্ষাটা সহজ নয়। অন্য অনেক বড় দল তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করলেও ব্রাজিলের সামনে মরক্কো। ২০২২ বিশ্বকাপে স্পেন ও পর্তুগালকে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়েছিল আফ্রিকান দলটি। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠা প্রথম আফ্রিকান ও আরব দেশ হিসেবে মরক্কো দেখিয়েছিল, বড় দলের বিপক্ষেও তারা ভয় পায় না।

ব্রাজিলের প্রস্তুতিও নিখুঁত হয়নি। নতুন কোচ, চোট সমস্যা, বাছাইপর্বের ওঠানামা, সব মিলিয়ে আনচেলত্তির সামনে কাজ কঠিন। গত পাঁচ বিশ্বকাপের চারটিতেই কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল। সর্বশেষ ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে হেরে থেমেছিল তাদের পথচলা। সেই ক্ষত এখনো দলের অনেকের মনে তাজা।

এবার ব্রাজিলের আক্রমণের বড় ভরসা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও রাফিনিয়া। রক্ষণে আছেন মারকিনিওস ও গ্যাব্রিয়েল মাগালিয়াইসের মতো অভিজ্ঞ ও শক্তিশালী নাম। আক্রমণের কেন্দ্রে দেখা যেতে পারে মাতেউস কুনিয়াকে। তবে সবচেয়ে আলোচিত অনুপস্থিতি নেইমার।

ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা নেইমার বিশ্বকাপ দলে ফিরলেও মরক্কোর বিপক্ষে খেলতে পারবেন না। কাফের চোট থেকে পুরোপুরি সেরে না ওঠায় প্রথম ম্যাচ থেকে ছিটকে গেছেন তিনি। প্রায় আড়াই বছর পর জাতীয় দলে ফেরা নেইমারের ফিটনেস তাই ব্রাজিলের বিশ্বকাপ অভিযানের বড় অনিশ্চয়তা হয়ে আছে।

শুধু নেইমার নন, চোটের কারণে ব্রাজিল দলে নেই আরও কয়েকজন সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার। রদ্রিগো, এস্তেভাও, এদের মিলিতাও ও ওয়েসলি স্কোয়াডেই নেই। ফলে প্রথম ম্যাচ থেকেই কিছু সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখে দল সাজাতে হবে আনচেলত্তিকে।

তবে ব্রাজিলের শক্তির জায়গা এখনো স্পষ্ট। ভিনিসিয়ুসের গতি, রাফিনিয়ার কাট-ইন ও ক্রস, মাঝমাঠের সৃজনশীলতা, রক্ষণের অভিজ্ঞতা, সব মিলিয়ে প্রতিভার ঘাটতি নেই। প্রশ্ন হলো, সেই প্রতিভাকে আনচেলত্তি কতটা সংগঠিত কাঠামোয় আনতে পারেন।

মরক্কোর গল্পও শুধু ২০২২ সালের সাফল্যে আটকে নেই। দলে আছেন আশরাফ হাকিমি ও ব্রাহিম দিয়াসের মতো উচ্চমানের খেলোয়াড়। ইউরোপের বড় লিগ ও একাডেমিতে তৈরি হওয়া এই প্রজন্ম মরক্কোকে দিয়েছে আত্মবিশ্বাস, গতি ও টেকনিক্যাল মান।

তবে মরক্কোও নির্ভার অবস্থায় বিশ্বকাপে আসেনি। আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের পর তাদের শিবিরে অস্থিরতা ছিল। দীর্ঘদিনের কোচ ওয়ালিদ রেগরাগুই বিশ্বকাপের তিন মাস আগে দায়িত্ব ছাড়েন। তাঁর জায়গায় যুব দল থেকে উঠে আসা মোহামেদ ওউহাবি দায়িত্ব নেন। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে তাঁর শুরুটাই হচ্ছে ব্রাজিলের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষা দিয়ে।

চোটের ধাক্কা আছে মরক্কোরও। নায়েফ আগেরদ ও আবদে এজ্জালজুলি শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে চোট পেয়ে স্কোয়াড থেকে ছিটকে গেছেন। তাঁদের জায়গায় ডাক পেয়েছেন আমিন সাবাই ও মারওয়ানে সাদানে। ফলে মরক্কোর পরিকল্পনাতেও বদল আসতে পারে।

সাম্প্রতিক ফর্ম বলছে, মরক্কোকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। শেষ পাঁচ ম্যাচে তাদের ফল ব্রাজিলের তুলনায় ভালো। নরওয়ের সঙ্গে ড্র করার পাশাপাশি তারা বড় ব্যবধানে হারিয়েছে মাদাগাস্কারকে, জিতেছে বুরুন্ডি ও পানামার বিপক্ষে, ড্র করেছে ইকুয়েডরের সঙ্গেও। অন্যদিকে ব্রাজিল প্রাক্‌-বিশ্বকাপ প্রস্তুতি ম্যাচে মিশর ও পানামাকে হারিয়েছে, ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে জিতেছে, তবে ফ্রান্সের কাছে হেরেছে এবং তিউনিসিয়ার সঙ্গে ড্র করেছে।

মুখোমুখি লড়াইয়ে অবশ্য এগিয়ে ব্রাজিল। দুই দলের আগের তিন ম্যাচে ব্রাজিল জিতেছে দুবার, মরক্কো একবার। বিশ্বকাপে একবারই দেখা হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। সেবার গ্রুপ পর্বে রোনালদো, রিভালদো ও বেবেতোর গোলে ৩-০ ব্যবধানে জিতেছিল ব্রাজিল। তবে সর্বশেষ ২০২৩ সালের প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল মরক্কো।

পরিসংখ্যানভিত্তিক পূর্বাভাসেও ব্রাজিল এগিয়ে, তবে ব্যবধানটা নিশ্চিন্ত হওয়ার মতো নয়। অপ্টার হিসাবে ব্রাজিলের জয়ের সম্ভাবনা ৫৭.৭ শতাংশ, মরক্কোর ১৮.৮ শতাংশ এবং ড্রয়ের সম্ভাবনা ২৩.৫ শতাংশ। অর্থাৎ ব্রাজিল ফেভারিট, কিন্তু মরক্কোকে হারানো সহজ হবে না।

গ্রুপ ‘সি’তে ব্রাজিল ও মরক্কোর সঙ্গে আছে হাইতি ও স্কটল্যান্ড। তাই এই ম্যাচ গ্রুপের শীর্ষস্থান নির্ধারণের দৌড়েও গুরুত্বপূর্ণ। জয় পেলে ব্রাজিল শুরুতেই আত্মবিশ্বাস পাবে। অন্যদিকে মরক্কো পয়েন্ট নিতে পারলে গ্রুপের হিসাব শুরু থেকেই জটিল হয়ে যাবে।

ব্রাজিলের সামনে প্রশ্ন একটাই, তারকারা কি দল হয়ে উঠতে পারবেন? আনচেলত্তি কি প্রথম ম্যাচেই ভারসাম্য খুঁজে পাবেন? নেইমার ছাড়া ভিনিসিয়ুস-রাফিনিয়ারা কি আক্রমণের ভার নিতে পারবেন?

মরক্কোর সুযোগ ব্রাজিলের অনিশ্চয়তাকে কাজে লাগানো। শৃঙ্খলিত রক্ষণ, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং হাকিমি-ব্রাহিমদের ব্যক্তিগত মান ব্রাজিলকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে।

গ্রুপ পর্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ম্যাচগুলোর একটি হতে যাচ্ছে এটি। নামের ভারে ব্রাজিল এগিয়ে, কিন্তু সাম্প্রতিক ইতিহাস বলছে, মরক্কো ভয় পায় না। নেইমারহীন ব্রাজিলের ষষ্ঠ শিরোপার অভিযান তাই সহজ পথে নয়, শুরু হচ্ছে কঠিন এক দরজা পেরিয়ে।