মরক্কোর বিপক্ষে একমাত্র বিশ্বকাপ ম্যাচে কেমন করেছিল ব্রাজিল

ব্রাজিল ও মরক্কো আবার বিশ্বকাপের মঞ্চে মুখোমুখি। ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘সি’র এই ম্যাচের আগে তাই ফিরে আসছে ২৮ বছর আগের এক স্মৃতি। কারণ বিশ্বকাপে এর আগে মাত্র একবারই দেখা হয়েছিল দুই দলের। সেটিও গ্রুপ পর্বে। সেবারও ব্রাজিলের গ্রুপে ছিল মরক্কো ও স্কটল্যান্ড। পার্থক্য শুধু এক জায়গায়, ১৯৯৮ সালে তাদের সঙ্গে ছিল নরওয়ে, এবার আছে হাইতি।
তবে মিল এখানেই শেষ। ১৯৯৮ সালের ব্রাজিল ছিল বর্তমান চ্যাম্পিয়ন। চার বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ জিতে ফ্রান্সে গিয়েছিল পঞ্চম শিরোপার বড় দাবিদার হয়ে। মারিও জাগালোর দলকে তখন শুধু ফেভারিট বলা হতো না, অনেকের চোখে তারা ছিল প্রায় অনিবার্য চ্যাম্পিয়ন। সেই আত্মবিশ্বাসের ছাপই পড়েছিল মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচে।
ফ্রান্সের নঁতের স্তাদ দে লা বোজোয়ারে ১৯৯৮ সালের ১৬ জুন মরক্কোর বিপক্ষে নেমেছিল ব্রাজিল। প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে শুরু করা সেলেসাওয়ের সামনে ছিল নকআউটে ওঠার পথ সহজ করার সুযোগ। সেই সুযোগ হাতছাড়া করেননি রোনালদো নাজারিও।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া ভালো। তখন ব্রাজিলে রোনালদোকে অনেক সময় ‘রোনালদিনিও’ নামে ডাকা হতো। এটি রোনালদিনিও গাউচো নন, বরং ‘দ্য ফেনোমেনন’ রোনালদোই। বয়স তখন মাত্র ২১, কিন্তু তারকা হিসেবে তিনি তখনই বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি।
মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচের আগের দিন নাকি রোনালদো বলেছিলেন, এই ম্যাচে তিনি আলো ছড়াবেন। মাঠে নেমে কথাটাই যেন সত্যি করে দেখান ব্রাজিলের ৯ নম্বর। শুরুতেই দলকে এগিয়ে দেন তিনি। গোলটি ছিল দারুণ নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত আর নিখুঁত ফিনিশিংয়ের মিশ্রণ। মরক্কোর রক্ষণ তখনো ম্যাচের ছন্দ ধরার চেষ্টা করছে, তার আগেই ম্যাচের দিক বদলে দেন রোনালদো।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে ব্যবধান বাড়ান রিভালদো। কাফুর ক্রস থেকে তাঁর গোল ব্রাজিলকে বিরতিতে নিয়ে যায় আরও স্বস্তির জায়গায়। স্কোরলাইন তখনই বলে দিচ্ছিল, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ব্রাজিলের হাতে। মরক্কো চেষ্টা করছিল, কিন্তু ব্রাজিলের গতি, ব্যক্তিগত দক্ষতা ও মাঝমাঠের কর্তৃত্ব তাদের বারবার পিছিয়ে দিচ্ছিল।
দ্বিতীয়ার্ধে আসে ম্যাচের আরেকটি স্মরণীয় মুহূর্ত। এবারও কেন্দ্রে রোনালদো। বাঁ দিক দিয়ে ড্রিবল করে প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে তিনি বল সাজিয়ে দেন বেবেতোর জন্য। বেবেতোর কাজ ছিল শুধু শেষ স্পর্শ দেওয়া। গোল করে স্কোরলাইন ৩-০ করেন তিনি। ব্রাজিলের জয় তখন প্রায় নিশ্চিত, আর রোনালদোর নামের পাশে যোগ হয় এক গোলের সঙ্গে এক অ্যাসিস্ট।
তবে সেই ম্যাচ শুধু রোনালদোর জাদুতেই মনে নেই। ম্যাচের ভেতরেই ঘটে যায় ব্রাজিলের দুই অভিজ্ঞ তারকা দুঙ্গা ও বেবেতোর উত্তপ্ত ঝগড়া। তখন ব্রাজিল এগিয়ে ১-০। বেবেতো মাঝমাঠের কাছে ড্রিবল করতে গিয়ে বল হারান। সেখান থেকে মরক্কো পাল্টা আক্রমণে যায় এবং বিপজ্জনক জায়গায় ফ্রি-কিক পায়।
ক্যাপ্টেন দুঙ্গা বিষয়টি ভালোভাবে নেননি। তাঁর চোখে সেটি ছিল অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি। মাঠেই তিনি বেবেতোর ওপর চটে যান। কথা কাটাকাটি বাড়তে থাকে। বেবেতোও পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখান। একপর্যায়ে পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে দুঙ্গা মাথা দিয়ে আঘাত করার মতো ভঙ্গি করেন। সতীর্থদের এসে দুজনকে শান্ত করতে হয়।
দুঙ্গা পরে ঘটনাটি হালকা করে দেখানোর চেষ্টা করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, ফুটবলে এমন তর্ক হতেই পারে। বেবেতো গোল করার পর তিনি তাঁকে জড়িয়ে ধরেছিলেন বলেও জানান। তবে বিশ্বকাপের মাঠে একই দলের দুই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফুটবলারের এমন ঝগড়া স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত সেই উত্তাপ ব্রাজিলের খেলায় প্রভাব ফেলেনি। বরং ৩-০ গোলের জয় তাদের নকআউট পর্বের পথে অনেকটা এগিয়ে দেয়। রোনালদো, রিভালদো ও বেবেতোদের নিয়ে ব্রাজিল এগিয়ে যায় ফাইনাল পর্যন্ত। শেষ ষোলোতে চিলি, কোয়ার্টার ফাইনালে ডেনমার্ক এবং সেমিফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে পেরিয়ে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে সেলেসাও।
কিন্তু সেই অভিযানের শেষটা সুখের হয়নি। ফাইনালের আগে রোনালদোর অসুস্থতা পুরো ব্রাজিল শিবিরকে নাড়িয়ে দেয়। মাঠে নামলেও তিনি নিজের সেরা ছন্দে ছিলেন না। জিনেদিন জিদানের ফ্রান্স ফাইনালে ব্রাজিলকে ৩-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জেতে।
২৮ বছর পর আবার মরক্কোর বিপক্ষে বিশ্বকাপ ম্যাচের আগে তাই ১৯৯৮ সালের সেই রাত ফিরে আসছে আলোচনায়। তবে এবার পরিস্থিতি অনেক আলাদা। তখন ব্রাজিল ছিল বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ও একচ্ছত্র ফেভারিট। এবার কার্লো আনচেলত্তির দল বিশ্বকাপ শুরু করছে ২৪ বছরের শিরোপা-খরা, নেইমারের অনুপস্থিতি এবং এমন এক মরক্কোর বিপক্ষে, যারা ২০২২ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে উঠে নিজেদের আর ছোট দল হিসেবে দেখতে রাজি নয়।
তবু ইতিহাস ব্রাজিলকে একটি সুখস্মৃতি দেয়। মরক্কোর বিপক্ষে বিশ্বকাপে তাদের একমাত্র দেখা হয়েছিল রোনালদোর আলোয়, রিভালদো-বেবেতোর গোলে এবং দুঙ্গার আগুনে মেজাজে। এবার নিউ জার্সিতে সেই ইতিহাসের পাশে নতুন অধ্যায় লিখতে নামবে দুই দল।
