এই ব্রাজিলকে দেখে প্রতিপক্ষরা কি ভয় পাবে?

স্কোরলাইন বলছে ব্রাজিল ১, মরক্কো ১। কিন্তু নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ম্যাচটি শুধু একটি ড্রয়ের গল্প নয়। এটি ব্রাজিলের জন্য সতর্কবার্তা, আর মরক্কোর জন্য আত্মবিশ্বাসের পুনরায় ঘোষণা।
পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা বিশ্বকাপ শুরু করল জয় ছাড়া। তাও এমন এক ম্যাচে, যেখানে দীর্ঘ সময় মনে হয়েছে মরক্কোই বেশি সংগঠিত, বেশি সাহসী, বেশি প্রস্তুত। ব্রাজিলের জার্সির ওজন আছে, ইতিহাস আছে, তারকাও আছে; কিন্তু মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে সেই ভয় ধরানো ব্রাজিলকে দেখা যায়নি।
ম্যাচের শুরু থেকেই মরক্কো ব্রাজিলকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। মোহাম্মদ ওয়াহবির দল রক্ষণে বসে থাকার পরিকল্পনা নিয়ে নামেনি। বরং তারা বল পেলে সামনে গেছে, ব্রাজিলের মাঝমাঠে চাপ দিয়েছে, দুই পাশে জায়গা খুঁজেছে এবং ব্রাহিম দিয়াজকে কেন্দ্র করে আক্রমণের ছন্দ বানিয়েছে। সেই পরিকল্পনার পুরস্কার আসে ২১ মিনিটে।
মাঝমাঠের কাছাকাছি জায়গা থেকে ব্রাহিম দিয়াজ দারুণ এক পাস দেন ব্রাজিলের দুই সেন্টারব্যাকের মাঝের ফাঁকে। ইসমায়েল সাইবারি সেই পাস ধরে আলিসনের ওপর দিয়ে বল তুলে দেন। গোলটি ছিল শুধু সুন্দর ফিনিশ নয়, মরক্কোর আত্মবিশ্বাসের প্রতীকও। তারা ব্রাজিলকে ভয় পায়নি, বরং ব্রাজিলের দুর্বল জায়গাগুলো খুঁজে আঘাত করেছে।
ব্রাজিল তখন ছন্নছাড়া। ডান পাশে রজার ইবানিয়েস স্বস্তিতে ছিলেন না। স্বাভাবিক সেন্টারব্যাককে রাইটব্যাক বানানোর ঝুঁকি প্রথমার্ধে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মাঝমাঠেও কাসেমিরো ও ব্রুনো গিমারায়েস বলের গতি ধরতে পারছিলেন না। লুকাস পাকেতাও তেমন প্রভাব রাখতে পারেননি। ইগর থিয়াগোকে চমক হিসেবে একাদশে রাখলেও তিনি খুব কম বল পেয়েছেন, যে সুযোগ পেয়েছেন সেটিও কাজে লাগাতে পারেননি।
এই অবস্থায় ব্রাজিল যে সমতায় ফিরল, সেটি কোনো দলগত ছন্দের ফল ছিল না। সেটি ছিল ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের ব্যক্তিগত ঝলক। ৩১ মিনিটে বাঁ দিক থেকে বক্সে ঢুকে ডান পায়ে দুর্দান্ত শটে ইয়াসিন বোনোকে পরাস্ত করেন তিনি। ব্রাজিলের সেই গোলটি যেন এক কথায় ম্যাচের প্রথমার্ধের ব্যাখ্যা—পরিকল্পনায় নয়, প্রতিভায় বেঁচে থাকা।
আনচেলত্তি সেটি বুঝেছিলেন। বিরতিতেই তিনি ইবানিয়েস ও কাসেমিরোকে তুলে নেন। নামান দানিলো ও ফাবিনিয়োকে। বড় ম্যাচে হাফটাইমে এমন পরিবর্তন সাধারণত কোচের অস্বস্তির ইঙ্গিত দেয়। ব্রাজিল দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা স্থিরতা পায়, বলের নিয়ন্ত্রণ বাড়ে, রাফিনিয়া বেশি কাজ করেন, কুনিয়া ও লুইজ হেনরিক নেমে আক্রমণে নতুন গতি আনার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতেও মরক্কোকে ভেঙে দেওয়ার মতো ধার তৈরি হয়নি।
এখানেই প্রশ্নটা বড় হয়ে ওঠে—এই ব্রাজিলকে কি অন্য বড় দল ভয় পাবে?
ব্রাজিলের আক্রমণে ভিনিসিয়ুস, রাফিনিয়া, কুনিয়া, এন্দ্রিক, ইগর থিয়াগোদের মতো নাম আছে। কিন্তু আক্রমণের পেছনের কাঠামো যদি ঠিক না থাকে, শুধু নাম দিয়ে বিশ্বকাপ জেতা যায় না। আনচেলত্তির দল প্রথম ম্যাচে সেটাই মনে করিয়ে দিল। নেইমার নেই, সেটি অবশ্যই বড় অনুপস্থিতি। কিন্তু ব্রাজিলের সমস্যা শুধু নেইমার-শূন্যতা নয়; সমস্যা মাঝমাঠের গতি, ফুলব্যাকের ভারসাম্য এবং আক্রমণের স্পষ্ট প্যাটার্ন নিয়েও।
কাসেমিরোর পারফরম্যান্স বিশেষভাবে চিন্তার। ৩৪ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব ও পজিশন বোঝার ক্ষমতার জন্য দলে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মরক্কোর দ্রুত ও তরুণ মাঝমাঠের বিপক্ষে তিনি পিছিয়ে পড়েছেন। প্রথমার্ধে হলুদ কার্ড দেখেছেন, কয়েকবার জায়গা ছেড়েছেন, এবং বিরতির পর আর মাঠে ফেরেননি। এটি শুধু এক ম্যাচের খারাপ দিন কি না, নাকি ব্রাজিলের মাঝমাঠে প্রজন্ম বদলের প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত—আনচেলত্তিকে দ্রুত উত্তর খুঁজতে হবে।

এর ঠিক বিপরীতে মরক্কোর মাঝমাঠে আয়ুব বুয়াদি ছিলেন আলোচনার বড় নাম। বয়স মাত্র ১৮, বিশ্বকাপ অভিজ্ঞতা প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু ব্রাজিলের বিপক্ষে তাঁর শরীরী ভাষা ছিল পরিণত ফুটবলারের মতো। জায়গা নিয়েছেন, চাপ নিয়েছেন, বল বের করেছেন, ডুয়েলে লড়েছেন। ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক দলে খেলা এই তরুণ মরক্কোকে বেছে নিয়েছেন বিশ্বকাপের আগে। প্রথম ম্যাচের পরই বোঝা গেল, মরক্কোর সেই জেতাটা শুধু আবেগের নয়, ফুটবলগত দিক থেকেও বড়।
মরক্কোকে আর চমক বলা যায় না। ২০২২ সালে সেমিফাইনালে ওঠা অনেকের কাছে বিস্ময় ছিল। কিন্তু চার বছর পর তারা প্রমাণ করছে, সেই সাফল্য কোনো একবারের গল্প নয়। তাদের দলে আত্মবিশ্বাস আছে, টেকনিক আছে, গতি আছে এবং সবচেয়ে বড় কথা—বড় দলের সামনে নিজেদের খেলা খেলতে পারার সাহস আছে। ব্রাজিলের বিপক্ষে তাদের শরীরী ভাষা বলছিল, তারা পয়েন্ট পেয়ে অবাক নয়; বরং আরও ভালো ফল পেতে পারত বলেই হয়তো আফসোস আছে।
ব্রাজিলের জন্য ড্র মানেই বিপর্যয় নয়। বিশ্বকাপ দীর্ঘ পথ। প্রথম ম্যাচে হোঁচট খেয়েও দল ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তবে যেটি উদ্বেগের, তা হলো খেলার ধরন। আনচেলত্তির ব্রাজিল এখনো স্পষ্ট পরিচয় খুঁজছে। তারা কি বল ধরে খেলবে, নাকি ভিনিসিয়ুসের গতি ব্যবহার করে সরাসরি আঘাত করবে? তারা কি কাসেমিরোর অভিজ্ঞতায় ভরসা রাখবে, নাকি নতুন গতির মাঝমাঠে যাবে? রাইটব্যাক সমস্যা কীভাবে মেটাবে? এসব প্রশ্ন প্রথম ম্যাচের পর আরও বড় হয়ে উঠল।
মরক্কোর বিপক্ষে ড্র ব্রাজিলকে গ্রুপে বিপদে ফেলেনি। কিন্তু মানসিকভাবে একটি বার্তা দিয়ে গেছে—এই ব্রাজিলকে ভয় পাওয়ার আগে প্রতিপক্ষরা এখন হয়তো ভাববে, চাপ দিলে তারা ভুল করে, মাঝমাঠে গতি দিলে তারা পিছিয়ে পড়ে, আর ভিনিসিয়ুসকে একা করে দিতে পারলে তাদের আক্রমণ ভেঙে দেওয়া যায়।
বিশ্বকাপ জিততে হলে ব্রাজিলকে শুধু প্রতিভা দেখালেই হবে না, দল হিসেবেও ভয় ধরাতে হবে। মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ভিনিসিয়ুস ব্রাজিলকে বাঁচিয়েছেন। কিন্তু আনচেলত্তির দল এখনো বিশ্বকাপের অন্য দাবিদারদের কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো ব্রাজিল হয়ে উঠতে পারেনি।
