logo

বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে সত্যিই কি বিমানের ‘আশীর্বাদ’ করাল ব্রাজিল?

বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে সত্যিই কি বিমানের ‘আশীর্বাদ’ করাল ব্রাজিল?
যাওয়ার আগে এভাবেই ‘পবিত্র’ করা হয় ব্রাজিলের বিমানকে। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপে ব্রাজিল মানেই শুধু ফুটবল দল নয়, সঙ্গে যায় এক জাতির প্রত্যাশা, স্মৃতি, বিশ্বাস আর আবেগের দীর্ঘ কাফেলা। সেই আবেগেরই নতুন এক ছবি দেখা গেল ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে। রিও দে জেনেইরোর গালেও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে ব্রাজিল দলের বিমানকে পানির ফোয়ারার নিচ দিয়ে বিদায় দেওয়া হলো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই প্রশ্ন উঠল, বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে কি সত্যিই নিজেদের বিমানকে ‘বাপ্তিস্ম’ বা আশীর্বাদ করাল ব্রাজিল?

উত্তরটা হলো, হ্যাঁ, তবে কথাটির অর্থ বুঝতে হবে প্রেক্ষাপটসহ। এটি কোনো ধর্মীয় বাপ্তিস্ম নয়, কোনো পুরোহিতের আনুষ্ঠানিক প্রার্থনাও নয়। বিমান চলাচলের জগতে এটি পরিচিত ওয়াটার স্যালুট নামে। বিশেষ কোনো ফ্লাইট, প্রথম যাত্রা, শেষ যাত্রা, গুরুত্বপূর্ণ সফর বা সম্মানসূচক মুহূর্তে বিমানবন্দরের ফায়ার ট্রাক দুই দিক থেকে পানির ধারা ছুড়ে আকাশে একটি আর্চ তৈরি করে। সেই আর্চের ভেতর দিয়ে বিমানটি এগিয়ে যায়। দেখতে অনেকটা রাজকীয় বিদায়ের মতো, অর্থে শুভকামনার প্রতীক।

ব্রাজিলের ক্ষেত্রে এই রীতিটিই একটু বেশি আবেগী হয়ে উঠেছে। কারণ বিমানটি শুধু কোনো সাধারণ চার্টার ফ্লাইট ছিল না, সেটি বহন করছিল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। কার্লো আনচেলত্তির দল বিশ্বকাপ প্রস্তুতির শেষ ধাপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছিল। গন্তব্য নিউয়ার্ক, নিউ জার্সি। সেখান থেকেই শুরু হবে টুর্নামেন্টের আগে চূড়ান্ত প্রস্তুতি, এরপর মাঠে নামবে সেই পুরোনো স্বপ্ন নিয়ে—হেক্সা, অর্থাৎ ষষ্ঠ বিশ্বকাপ।

ঘটনাটি ঘটে সোমবার রাত ১১টার কিছু পরে। গালেও বিমানবন্দরের রানওয়েতে দুইটি ফায়ার ট্রাক অবস্থান নেয়। ব্রাজিল দলের বিমান সামনে এগোতেই দুই দিক থেকে ছুটে আসে পানির উঁচু ধারা। কয়েক সেকেন্ডের সেই দৃশ্যেই যেন ধরা পড়ে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের পুরোনো নাটকীয়তা। কোনো স্লোগান নেই, কোনো স্টেডিয়ামের গর্জন নেই, তবু মনে হচ্ছিল, পুরো দেশ যেন বিমানটিকে বিদায় জানাচ্ছে।

এখানেই ‘বাপ্তিস্ম’ শব্দটির জন্ম। পর্তুগিজ ভাষায় ঘটনাটিকে বলা হয়েছে batismo, অর্থাৎ baptism বা christening। কিন্তু সেটি আক্ষরিক ধর্মীয় অর্থে নয়। বিমান, জাহাজ বা বিশেষ যাত্রার ক্ষেত্রে অনেক সংস্কৃতিতে ক্রিসেনিং শব্দটি ব্যবহার করা হয় প্রতীকী নামকরণ, শুভারম্ভ বা আশীর্বাদের অর্থে। ব্রাজিল দলের বিমানও সেই অর্থেই ‘বাপ্তিস্ম’ পেয়েছে—পানির আর্চের ভেতর দিয়ে একটি শুভযাত্রার প্রতীকী সূচনা।

বিমান চলাচলের এই রীতি নতুন নয়। পৃথিবীর নানা বিমানবন্দরে নতুন রুট চালু হলে, কোনো বিমান প্রথমবার কোনো বিমানবন্দরে নামলে, কোনো পাইলট অবসরের শেষ ফ্লাইট করলে কিংবা বিশেষ রাষ্ট্রীয় বা ক্রীড়া সফরে এমন ওয়াটার স্যালুট দেখা যায়। সাধারণ যাত্রীর চোখে এটি চমকপ্রদ দৃশ্য, কিন্তু বিমানবন্দরের ভাষায় এটি সম্মান জানানোর এক পুরোনো পদ্ধতি।

ব্রাজিলের ক্ষেত্রে এর তাৎপর্য আরও বড় হয়েছে ফুটবল সংস্কৃতির কারণে। এই দেশ ফুটবলকে শুধু খেলা হিসেবে দেখে না। বিশ্বকাপ সেখানে জাতীয় ক্যালেন্ডারের আলাদা ঋতু। ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ ও ২০০২ পাঁচটি শিরোপা তাদের ইতিহাসকে এমন উচ্চতায় বসিয়েছে, যেখানে প্রতিটি বিশ্বকাপযাত্রা আরেকটি জাতীয় অভিযানে পরিণত হয়। সেই অভিযানের শুরুতে বিমানের ওপর পানির ফোয়ারা যেন শুধু বিমানকে নয়, এক দল, এক স্বপ্ন, এক দেশের ফুটবল-আত্মাকেই বিদায় জানাল।

বিমানটির আরেকটি দিকও আলোচনায় এসেছে। ব্রাজিল দল যে বোয়িং ৭৬৭ মডেলের উড়োজাহাজে যুক্তরাষ্ট্রে যায়, সেটি দক্ষিণ আফ্রিকাভিত্তিক চার্টার প্রতিষ্ঠান অ্যারোনেক্সাসের। বিমানটি আগে বিখ্যাত রক ব্যান্ড রোলিং স্টোন্সের সফরেও ব্যবহৃত হয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এবার সেটি ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের চিহ্নে সাজানো হয়। অর্থাৎ আকাশপথের যানটিও হয়ে ওঠে বিশ্বকাপযাত্রার দৃশ্যমান অংশ।

এই ‘বাপ্তিস্ম’ নিয়ে কৌতূহলের আরেকটি কারণ ব্রাজিলের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পটভূমি। ব্রাজিল ফুটবলে বিশ্বাস, প্রার্থনা, ভাগ্য, প্রতীক—এসব সব সময়ই একসঙ্গে চলে। অনেক ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার প্রকাশ্যে ধর্মবিশ্বাসের কথা বলেন, গোলের পর আকাশের দিকে তাকান, মাঠে নামার আগে প্রার্থনা করেন। তাই বিমানকে ‘আশীর্বাদ’ বলা হলে অনেকে সেটিকে ধর্মীয় অর্থে ভেবে বসতে পারেন। বাস্তবে এখানে ধর্মীয় আচার নয়, বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিক সম্মানই ছিল মূল বিষয়। তবে ব্রাজিলিয়ান আবেগে সেটি শুভলক্ষণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

এই বিদায়ের ছবির সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে মাঠের প্রশ্নও। ব্রাজিল বিশ্বকাপে যাচ্ছে বড় প্রত্যাশা নিয়ে, কিন্তু দল নিয়ে সংশয়ও কম নয়। নেইমারের ফিটনেস নিয়ে আলোচনা, আনচেলত্তির অধীনে দল কত দ্রুত ভারসাম্য পাবে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনিয়া, কাসেমিরোদের ভূমিকা—সব মিলিয়ে ব্রাজিলের যাত্রা শুধু রঙিন নয়, চাপেও ভরা। ফলে বিমানের পানির আর্চ যেন এক অর্থে সুন্দর দৃশ্যের ভেতরে লুকোনো উদ্বেগও বহন করছিল।

সমর্থকদের কাছে এমন মুহূর্তের গুরুত্ব তাই বাস্তবের চেয়ে বেশি প্রতীকে। কেউ এটিকে শুভযাত্রা বলছেন, কেউ বলছেন হেক্সার পথে প্রথম আচার। কেউ আবার মজা করে বলছেন, ২৪ বছর ধরে যে ট্রফি ব্রাজিলে ফেরেনি, এবার সেটিকে ফিরিয়ে আনতে বিমানকেই আগে আশীর্বাদ দেওয়া হলো। ফুটবলে কুসংস্কার, প্রতীক আর রোমান্টিকতা সব সময়ই থাকে। ব্রাজিলের মতো দলের ক্ষেত্রে সেটি আরও প্রবল।