logo

চোখ হারানোর ভয় থেকে বিশ্বকাপের ইতিহাসে উইসা

চোখ হারানোর ভয় থেকে বিশ্বকাপের ইতিহাসে উইসা
ইয়োয়ান উইসা। ছবি: সংগৃহীত

একটি গোল কখনো কখনো শুধু স্কোরলাইন বদলায় না, একটি দেশের ইতিহাসও বদলে দেয়। হিউস্টনে পর্তুগালের বিপক্ষে ইয়োয়ান উইসার হেডটি ছিল তেমনই এক গোল। ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে ডিআর কঙ্গো ১-১ গোলে রুখে দিল অন্যতম ফেবারিট পর্তুগালকে। সেই রাতেই কঙ্গোর বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম গোলদাতা হয়ে গেলেন উইসা।

ম্যাচের শুরুতেই এগিয়ে গিয়েছিল পর্তুগাল। ষষ্ঠ মিনিটে জোয়াও নেভেসের গোলে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোদের দল স্বস্তির শুরু পায়। হিউস্টন স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে পর্তুগিজ সমর্থকদের উল্লাসও তখন চোখে পড়ার মতো। কিন্তু ডিআর কঙ্গো ভেঙে পড়েনি। তারা অপেক্ষা করেছে, লড়েছে, আর সুযোগ এলে সেটি কাজে লাগিয়েছে।

সেই সুযোগ আসে প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে। বাঁ দিক থেকে আর্থার মাসুয়াকুর ক্রসে বক্সে ঠিক জায়গায় ছিলেন উইসা। তার হেড জালে যেতেই ইতিহাস লেখা হয়ে যায়। ডিআর কঙ্গো শুধু সমতা ফেরায়নি, বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের প্রথম গোলটিও পেয়ে যায়।

১৯৭৪ সালে জায়ের নামে বিশ্বকাপে খেলেছিল দলটি। সেই আসরে তিন ম্যাচে কোনো গোল করতে পারেনি তারা, হজম করেছিল ১৪ গোল। এত দীর্ঘ অপেক্ষার পর বিশ্বকাপে ফিরে প্রথম ম্যাচেই পয়েন্ট, তার ওপর গোলটি পর্তুগালের মতো দলের বিপক্ষে। কঙ্গোর ফুটবল ইতিহাসে রাতটি তাই আলাদা জায়গা নিয়েই থাকবে।

উইসার গল্প এখানেই শেষ নয়। বরং এই গোলের গভীরতা বোঝার জন্য ফিরে যেতে হয় ২০২১ সালের জুলাইয়ে। তখন তিনি খেলছিলেন ফ্রান্সের লোরিয়াঁয়। এক নারী তার বাড়িতে ঢুকে নবজাতক সন্তানকে অপহরণের চেষ্টা করেন এবং উইসার মুখে অ্যাসিড ছুড়ে মারেন। এতে তার চোখ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জরুরি চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার করতে হয় তাকে। পরে আদালতে উইসা জানান, দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি ফিরে পেতে তার প্রায় ছয় মাস সময় লেগেছিল।

পরের বছরগুলোতে উইসা শুধু শরীর নয়, মানসিক আঘাতের সঙ্গেও লড়েছেন। আদালতে তিনি বলেছিলেন, ঘটনার পর অপরিচিত মানুষের ভিড় সহ্য করতে পারতেন না, রাতে একা ঘুমাতে কষ্ট হতো, হাঁটার সময়ও পেছনে তাকাতেন। সন্তানরা মুখের দাগ নিয়ে প্রশ্ন করত, কিন্তু তিনি তখনও তাদের পুরো ঘটনা বলতে পারেননি। সেই দাগ মুছে ফেলতেও চাননি তিনি, কারণ সেটি তার ব্যক্তিগত ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে।

সেই মানুষটিই এবার বিশ্বকাপের আলোয় দাঁড়িয়ে দেশের ইতিহাস লিখলেন। ফুটবল মাঠে অনেক গোল আছে, যা কৌশল, দক্ষতা বা মুহূর্তের বিচারে সুন্দর। উইসার গোল তার চেয়েও বেশি কিছু। সেটি বেঁচে ওঠার গল্প, ভেঙে না পড়ার গল্প এবং এক দেশের দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষ করার গল্প।

পর্তুগালের বিপক্ষে ড্র ডিআর কঙ্গোর জন্য বড় ফল। রোনালদোর দল বলের দখলে এগিয়ে ছিল, শুরুতেই গোল পেয়েছিল, কিন্তু দ্বিতীয় গোল করতে পারেনি। কঙ্গো ধৈর্য ধরে ম্যাচে থেকেছে। সেবাস্তিয়েন দেশাব্রের দল দেখিয়েছে, তারা শুধু অংশ নিতে আসেনি। তারা লড়তে এসেছে।

তবু ম্যাচের রাত শেষে সবচেয়ে বেশি আলো ছিল উইসার ওপর। নিউক্যাসল ইউনাইটেডের ২৯ বছর বয়সি ফরোয়ার্ড জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পেছনে ফেলে এসেছেন। সেই অন্ধকার পেরিয়েই তিনি পেলেন এমন এক মুহূর্ত, যা তার নিজের, তার পরিবারের এবং পুরো ডিআর কঙ্গোর ফুটবল স্মৃতিতে বহুদিন থাকবে।

বিশ্বকাপ প্রায়ই বড় তারকাদের গল্প লেখে। কিন্তু কখনো কখনো সে এমন এক মানুষের গল্প সামনে আনে, যার লড়াই মাঠের বাইরেও অনেক বড়।