logo
Advertisement

আর্জেন্টিনার জয় ছাপিয়ে মেসির রেকর্ডের ইতিহাস

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
আর্জেন্টিনার জয় ছাপিয়ে মেসির রেকর্ডের ইতিহাস
ছবি: সংগৃহীত

আর্জেন্টাইন ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসির জন্য রাতটা শুধু গোলের ছিল না, ছিল রেকর্ডের, আবেগেরও। আর্জেন্টিনার হয়ে ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেছেন তিনি। সেই তিন গোলেই পুরুষ বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় মিরোস্লাভ ক্লোসের পাশে উঠে গেছেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। আর তার জাদুতেই আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা ধরে রাখার অভিযান শুরু করেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।

Advertisement

কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে গ্রুপ ‘জে’র ম্যাচের শুরু থেকেই আলো ছিল মেসির ওপর। ষষ্ঠ বিশ্বকাপ, ২০০তম ম্যাচ, সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপের আবেগ—সব মিলিয়ে মঞ্চটা ছিল তার জন্যই। শুরুতেই গোল পেয়ে যাচ্ছিলেন মেসি। বল জালে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু অফসাইডের কারণে সেটি বাতিল হয়। পরে আলজেরিয়ার ফারেস চাইবির গোলও ভিএআরের সিদ্ধান্তে অফসাইডে বাতিল হয়।

এরপর ১৭ মিনিটে আসে মেসির প্রথম গোল। রদ্রিগো দি পলের পাস পেয়ে বল নিয়ন্ত্রণে নেন তিনি। এরপর জায়গা তৈরি করে বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের শটে বল পাঠান জালে। আলজেরিয়া গোলরক্ষক লুকা জিদান বল ছুঁয়েছিলেন, কিন্তু শটের গতি ও বাঁক সামলাতে পারেননি। ২০০তম ম্যাচে মেসির প্রথম উদ্‌যাপন তখনই হয়ে যায়।

দ্বিতীয়ার্ধে আরও দুইবার দেখা গেল সেই পুরোনো মেসিকে। ৬০ মিনিটে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের শট ঠিকমতো ধরে রাখতে পারেননি জিদান। বল সামনে পড়ে গেলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখান মেসি। ডান পায়ের ঠান্ডা মাথার ফিনিশিংয়ে করেন নিজের দ্বিতীয় গোল।

৭৬ মিনিটে পূর্ণ হয় হ্যাটট্রিক। নিকোলাস গনসালেসের সঙ্গে পাস বিনিময়ের পর বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের শটে বল জালে জড়ান মেসি। বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে এটাই তার প্রথম হ্যাটট্রিক। এই গোলেই বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৬। ক্লোসের সঙ্গে এখন তিনি পুরুষ বিশ্বকাপ ইতিহাসের যৌথ সর্বোচ্চ গোলদাতা। সামনে আছে শুধু আর একটি গোলের অপেক্ষা, সেটি পেলেই এককভাবে সবার ওপরে উঠে যাবেন তিনি।

এই হ্যাটট্রিকে আরও একটি রেকর্ড মেসির। পুরুষ বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সে হ্যাটট্রিক করা ফুটবলার এখন তিনি। আগের রেকর্ড ছিল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর। ২০১৮ বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে ৩৩ বছর ১৩০ দিন বয়সে হ্যাটট্রিক করেছিলেন পর্তুগিজ তারকা। প্রায় ৩৯ ছুঁইছুঁই বয়সে মেসি সেই রেকর্ডও নিজের করে নিলেন।

আলজেরিয়ার বিপক্ষে গোল করে সবচেয়ে বেশি বয়সে বিশ্বকাপে গোল করা ফুটবলারদের তালিকাতেও ওপরের দিকে উঠে গেছেন মেসি। তার সামনে আছেন শুধু ক্যামেরুনের রজার মিলা ও পর্তুগালের পেপে। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে রজার মিলা গোল করেছিলেন ৪২ বছর ৩৯ দিন বয়সে, আর ২০২২ বিশ্বকাপে পেপে গোল করেছিলেন ৩৯ বছর ২৮৩ দিন বয়সে।

মেসির আরেকটি বড় অর্জন—পাঁচটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল। ২০০৬ বিশ্বকাপে গোল করে শুরু করেছিলেন তিনি। ২০১০ বিশ্বকাপে গোল পাননি। এরপর ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬ বিশ্বকাপে গোল করেছেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। এই জায়গায় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পাশেও তার নাম লেখা।

তবে কানসাসের রাত শুধু সংখ্যার ছিল না। প্রথম গোলের পর ব্রডকাস্ট ক্যামেরায় মেসিকে আবেগী দেখা যায়। চোখে জলও দেখা যাচ্ছিল তার। সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ম্যাচে, ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচে, এমন গোল—মুহূর্তটি মেসির কাছেও অন্যরকম ছিল।

ম্যাচ শেষে সেই আবেগের ব্যাখ্যায় মেসি জানান, মাঠে নামার আগে কয়েকটি কঠিন দিন পার করেছেন তিনি। বিষয়টি খেলাধুলার সঙ্গে সম্পর্কিত নয় বলেও জানান আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। তবে বিস্তারিত কিছু বলেননি। মেসির ভাষায়, ফুটবলের বাইরে একটি বিষয় নিয়ে কঠিন সময় গেছে তার। সেই সময়ে আর্জেন্টিনা দলের সবাই, সতীর্থরা ও পুরো ডেলিগেশন তার পাশে ছিল, শক্তি দিয়েছে।

মাঠে অবশ্য সেই কঠিন সময়ের কোনো ছাপ ছিল না। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ম্যাচের গল্প লিখেছেন মেসিই। প্রথম গোল, দ্বিতীয় গোল, হ্যাটট্রিক, ক্লোসের রেকর্ড ছোঁয়া, সবচেয়ে বেশি বয়সে বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিকের রেকর্ড—সব মিলিয়ে রাতটি তার ক্যারিয়ারের স্মরণীয়তম অধ্যায়গুলোর একটিতে জায়গা করে নিল।

আর্জেন্টিনার জন্য জয়টি শিরোপা ধরে রাখার অভিযানে দারুণ শুরু। কিন্তু দলীয় জয়ের আলোও শেষ পর্যন্ত মিশে গেল মেসির ব্যক্তিগত মহিমায়। কানসাসে তিনি আবারও মনে করিয়ে দিলেন, বয়স বাড়ে, সময় এগোয়, রেকর্ড বদলায় কিন্তু বড় মঞ্চে মেসির গল্প এখনো শেষ হয়নি।

আর্জেন্টিনার জয় ছাপিয়ে মেসির রেকর্ডের ইতিহাস