নিজ দেশের গণমাধ্যমকে বয়কট করল দক্ষিণ কোরিয়া ফুটবল দল

বিশ্বকাপে মাঠের লড়াইয়ের মাঝেই দক্ষিণ কোরিয়া দলে তৈরি হয়েছে অস্বস্তিকর এক পরিস্থিতি। অধিনায়ক সন হিউং-মিনকে নিয়ে নিজ দেশের সাংবাদিকদের কিছু মন্তব্য মাইকে ধরা পড়ার পর কোরিয়ান শিবিরে মিডিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক তিক্ত হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে, দক্ষিণ কোরিয়া দল দেশটির নিজস্ব মিডিয়ার সঙ্গে স্বাভাবিক সাক্ষাৎকার কার্যক্রম সীমিত করে দিয়েছে বলে খবর এসেছে।
ঘটনার শুরু মেক্সিকোর গাদালাহারায় দক্ষিণ কোরিয়ার অনুশীলন ক্যাম্পে। উন্মুক্ত অনুশীলনের সময় সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত কথোপকথন ভুলবশত মাইকে ধরা পড়ে এবং পরে সেটি অনলাইনে ছড়িয়ে যায়। সেখানে সনের সামরিক সেবা ছাড় নিয়ে কোরিয়ান সাংবাদিকদের কিছু কটাক্ষমূলক মন্তব্য শোনা গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবলে সামরিক সেবা একটি সংবেদনশীল বিষয়। দেশটির নিয়ম অনুযায়ী অধিকাংশ পুরুষ নাগরিকের জন্য সামরিক সেবা বাধ্যতামূলক। তবে ২০১৮ এশিয়ান গেমসে সোনা জিতে দক্ষিণ কোরিয়া দল বিশেষ ছাড় পায়। সেই দলের অধিনায়ক ছিলেন সন। নিয়ম মেনেই তিনি পূর্ণ সামরিক সেবার ছাড় পান এবং পরে বিকল্প সেবার অংশ হিসেবে মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণও সম্পন্ন করেন।
এ কারণেই সনকে নিয়ে সামরিক সেবা প্রসঙ্গে কটাক্ষ দক্ষিণ কোরিয়া দলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। শুধু সন নন, একই নিয়মে ছাড় পাওয়া দলের অন্য খেলোয়াড়দের প্রতিও মন্তব্য করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। বিষয়টি খেলোয়াড়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও ঘটনাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। কোরিয়ান মিডিয়ার আচরণ নিয়ে সংস্থাটি অসন্তোষ প্রকাশ করে এবং বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে পারস্পরিক সম্মান ও দায়িত্বশীলতার কথা মনে করিয়ে দেয় বলে স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পরে দেশটির বিশ্বকাপ কাভার করতে যাওয়া প্রেস কর্পসের নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসে। আগের নেতৃত্ব দায়িত্ব নিয়ে সরে দাঁড়িয়েছে বলেও খবর এসেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে কোরিয়ান প্রেস কর্পসের নতুন নেতৃত্ব সনের সঙ্গে দেখা করে সরাসরি ক্ষমা চেয়েছে। সন ক্ষমা গ্রহণ করেছেন বলে জানা গেলেও, দল আবার স্বাভাবিকভাবে মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলবে কি না, সে সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। সন নাকি জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে পুরো দলের সঙ্গে আলোচনা করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এরই মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া মাঠেও বড় জয় পেয়েছে। গ্রুপ ‘এ’-তে নিজেদের প্রথম ম্যাচে চেক রিপাবলিককে ২-১ গোলে হারিয়েছে তারা। তবে মাঠের সেই জয়কেও ছাপিয়ে এখন আলোচনায় এসেছে দলের ভেতরের মিডিয়া-টানাপোড়েন। ম্যাচের পর মিক্সড জোনে সন সাধারণত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন, কিন্তু এবার তিনি তা এড়িয়ে যান বলে জানা গেছে।
শুধু সন নন, দলের অন্য খেলোয়াড়দের মিডিয়া কার্যক্রমও সীমিত হয়েছে। চেকিয়ার বিপক্ষে গোল ও অ্যাসিস্ট করা হোয়াং ইন-বমের একটি সাক্ষাৎকারও বাতিল হয় বলে খবর এসেছে। আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে সময়সূচির কথা বলা হলেও, ঘটনাটিকে চলমান মিডিয়া বিরোধের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ম্যাচ জিতে তারা গ্রুপে ভালো শুরু করেছে। সামনে স্বাগতিক মেক্সিকোর বিপক্ষে কঠিন ম্যাচ। এমন সময়ে মাঠের বাইরের এই বিতর্ক দলের প্রস্তুতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। তবে অন্য দিক থেকে দেখলে, এমন ঘটনা কখনো কখনো দলকে আরও ঐক্যবদ্ধও করে।
সন হিউং-মিন দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবলের সবচেয়ে বড় মুখ। বছরের পর বছর জাতীয় দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। বিশ্বকাপ, এশিয়ান কাপ, ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবল—সব জায়গায় দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। সেই সনকে নিয়ে নিজ দেশের সাংবাদিকদের মন্তব্য তাই দক্ষিণ কোরিয়ান সমর্থকদের বড় অংশের কাছেও অসম্মানজনক মনে হয়েছে।
এই ঘটনার আরেকটি দিক হলো, বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে সাংবাদিকতা ও পেশাদার আচরণের সীমারেখা। খেলোয়াড়দের সমালোচনা করা মিডিয়ার কাজের অংশ। কিন্তু ব্যক্তিগত বা সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে বিদ্রূপ, বিশেষ করে জাতীয় দলের অধিনায়ককে ঘিরে, পেশাদার সাংবাদিকতার সীমা ছাড়িয়ে যায় কি না, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠেছে।
দক্ষিণ কোরিয়া দল আপাতত মাঠের লড়াইয়ে মন দিতে চাইছে। তবে সন-কাণ্ড দেখিয়ে দিল, বিশ্বকাপে শুধু প্রতিপক্ষের বিপক্ষেই লড়তে হয় না; কখনো কখনো নিজের দেশের পরিবেশ, প্রত্যাশা এবং মিডিয়ার চাপের সঙ্গেও লড়তে হয়।
ক্ষমা চাওয়া হয়েছে, কিন্তু ক্ষোভ মিটেছে কি না তা এখনো পরিষ্কার নয়। মেক্সিকোর বিপক্ষে পরের ম্যাচের আগে দক্ষিণ কোরিয়ার শিবিরে তাই মাঠের কৌশলের পাশাপাশি বড় প্রশ্ন, মিডিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হবে, নাকি এই নীরব দূরত্ব আরও কিছুদিন চলবে?
