মরক্কো ম্যাচ থেকে যে স্বস্তি পেল ব্রাজিল

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে জয় পায়নি ব্রাজিল। মরক্কোর সঙ্গে ১-১ ড্র পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের জন্য নিশ্চয়ই স্বপ্নের শুরু নয়। বিশেষ করে প্রথমার্ধে যে অস্বস্তি, ভুল আর ছন্নছাড়া ফুটবল দেখা গেছে, তা ব্রাজিল সমর্থকদের চিন্তায় ফেলতেই পারে। তবে হতাশার ভেতরেও কার্লো আনচেলত্তির দলের জন্য কিছু স্বস্তির জায়গা আছে।
মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচটি ব্রাজিলের জন্য সতর্কবার্তা, তবে বিপর্যয় নয়। বরং কঠিন এক প্রতিপক্ষের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই নিজেদের দুর্বলতা বুঝে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে ব্রাজিল। সবচেয়ে বড় কথা, খারাপ শুরু, মাঝমাঠের অস্বস্তি ও রক্ষণে চাপের মধ্যেও তারা হারেনি।
ম্যাচের শুরুটা ছিল মরক্কোর। ব্রাজিলের ওপর চাপ তৈরি করে, মাঝমাঠে বল কেড়ে নিয়ে, দ্রুত আক্রমণে উঠে প্রথম ২০ মিনিটেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় আফ্রিকার দলটি। সেই চাপের ফল আসে ইসমাইল সাইবারির গোলে। ব্রাহিম দিয়াসের দারুণ পাস ধরে আলিসনকে পরাস্ত করেন সাইবারি। তখন মনে হচ্ছিল, ব্রাজিলের রাতটা আরও কঠিন হতে পারে।
কিন্তু সেখানেই প্রথম স্বস্তি, ব্রাজিল ভেঙে পড়েনি। পিছিয়ে পড়ার পর অনেক বড় দলই প্রথম ম্যাচে নার্ভাস হয়ে যায়। ব্রাজিলও কিছুক্ষণ অস্থির ছিল, তবে ম্যাচে ফেরার মতো ব্যক্তিগত মান তাদের আছে। ৩২ মিনিটে সেটিই দেখালেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। বাঁ দিক থেকে ভেতরে ঢুকে ডান পায়ে দুর্দান্ত শটে সমতা ফেরান তিনি।
নেইমার না থাকায় ব্রাজিলের আক্রমণে নেতৃত্বের প্রশ্ন ছিল। ভিনিসিয়ুস সেই প্রশ্নের অন্তত আংশিক উত্তর দিয়েছেন। ম্যাচে ব্রাজিলের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্ত এসেছে তার পা থেকেই। দল যখন ছন্দে নেই, মাঝমাঠ যখন চাপের মুখে, তখন ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে ম্যাচ বাঁচানোর ক্ষমতা যে তার আছে, সেটি প্রথম ম্যাচেই প্রমাণ হলো। বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে এই ধরনের খেলোয়াড়ই পার্থক্য গড়ে দেন।
দ্বিতীয় স্বস্তির জায়গা আনচেলত্তির সিদ্ধান্তে। প্রথমার্ধে সমস্যা দেখেই তিনি অপেক্ষা করেননি। বিরতিতে ইবানিয়েজ ও কাসেমিরোকে তুলে দানিলো ও ফাবিনিয়োকে নামান। এটি শুধু পরিবর্তন নয়, ম্যাচের বাস্তবতা দ্রুত বোঝার প্রমাণ। নাম, অভিজ্ঞতা বা আগের পরিকল্পনায় আটকে না থেকে আনচেলত্তি বুঝিয়েছেন, প্রয়োজন হলে তিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
ব্রাজিল দ্বিতীয়ার্ধে নিখুঁত ফুটবল খেলেনি, কিন্তু প্রথমার্ধের তুলনায় অনেক বেশি স্থির ছিল। বলের নিয়ন্ত্রণ কিছুটা বেড়েছে, রক্ষণে অস্থিরতা কমেছে, মাঝমাঠে ফাবিনিয়ো কিছুটা ভারসাম্য এনেছেন। রাফিনিয়া পরিশ্রম করেছেন, মাতেউস কুনিয়া ও লুইজ হেনরিক নেমে আক্রমণে নতুন গতি আনার চেষ্টা করেছেন। ম্যাচ না জিতলেও ব্রাজিল অন্তত সম্পূর্ণ পথ হারায়নি।
তৃতীয় স্বস্তি হলো, মরক্কো কোনো সাধারণ প্রতিপক্ষ নয়। ২০২২ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে ওঠা দলটি এখন আরও আত্মবিশ্বাসী, আরও পরিণত। তাদের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়ে ড্র করা হতাশার হলেও লজ্জার নয়। বরং এই ম্যাচ ব্রাজিলকে বুঝিয়ে দিল, বড় দলের নাম দিয়ে বিশ্বকাপ জেতা যায় না। প্রতিটি ম্যাচে লড়াই করতে হবে, প্রতিটি ভুলের মূল্য দিতে হতে পারে।
চতুর্থ স্বস্তি গ্রুপের হিসাব। প্রথম ম্যাচে এক পয়েন্ট পাওয়া আদর্শ নয়, কিন্তু ব্রাজিল এখনও বিপদে পড়েনি। সামনে হাইতি ম্যাচ আছে। সেই ম্যাচে জয় পেলে, বিশেষ করে ভালো ব্যবধানে জিততে পারলে, গ্রুপের ছবিটা দ্রুত বদলে যেতে পারে। মরক্কোর বিপক্ষে ড্র তাই ব্রাজিলকে চাপ দিয়েছে, কিন্তু দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দেয়নি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সমস্যাগুলো খুব দ্রুত ধরা পড়েছে। ডান পাশের ভারসাম্যহীনতা, কাসেমিরোর গতি নিয়ে প্রশ্ন, মাঝমাঠে বল ধরে রাখার সমস্যা, ইগর থিয়াগোকে কীভাবে ব্যবহার করা হবে, এসব প্রশ্ন এখন পরিষ্কার। টুর্নামেন্টের পরে গিয়ে এই সমস্যা ধরা পড়লে ক্ষতি বড় হতে পারত। প্রথম ম্যাচেই ধরা পড়ায় আনচেলত্তির হাতে এখনও সময় আছে।
ব্রাজিলের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে আক্রমণ নিয়ে। শুধু ভিনিসিয়ুসের একক ঝলকের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। রাফিনিয়া, পাকেতা, কুনিয়া, এন্দ্রিক, ইগর থিয়াগোদের নিয়ে আক্রমণে আরও পরিষ্কার প্যাটার্ন দরকার। মরক্কোর মতো সংগঠিত দলের বিপক্ষে সেই অভাব স্পষ্ট হয়েছে। এখন হাইতি ম্যাচ হবে পরীক্ষার আরেক মঞ্চ, ব্রাজিল কি শুধু ফল তুলবে, নাকি খেলাতেও উন্নতি দেখাবে?
আনচেলত্তি ম্যাচ শেষে বলেছেন, প্রথম ম্যাচে বিশ্বকাপ জেতা যায় না। কথাটি ঠিক। তবে প্রথম ম্যাচ অনেক সময় দলের পথ দেখিয়ে দেয়। মরক্কোর বিপক্ষে ড্র ব্রাজিলকে অহংকারের জায়গা দেয়নি, কিন্তু সতর্ক হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। কখনো কখনো বিশ্বকাপের শুরুতে এমন ধাক্কাই দলকে বাস্তবতায় ফেরায়।
ব্রাজিলের সামনে এখন কাজ পরিষ্কার। উদ্বেগ কাটাতে হবে, মাঝমাঠে ভারসাম্য আনতে হবে, ফুলব্যাক সমস্যার সমাধান করতে হবে এবং ভিনিসিয়ুসকে একা করে রাখা যাবে না। কিন্তু স্বস্তি এখানেই, সব ভুলের পরও তারা হারেনি, ম্যাচে ফিরেছে, কোচ দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন এবং টুর্নামেন্ট এখনো পুরোপুরি সামনে পড়ে আছে।
মরক্কো ম্যাচ তাই ব্রাজিলের জন্য আনন্দের রাত নয়। তবে এটি এমন এক রাত, যেখান থেকে তারা সতর্কতা, শিক্ষা এবং সামান্য স্বস্তি, তিনটিই নিতে পারে।
