logo

ব্রাজিলের পরের দুই প্রতিপক্ষ কতটা বিপজ্জনক

ব্রাজিলের পরের দুই প্রতিপক্ষ কতটা বিপজ্জনক
হাইতি-স্কটল্যান্ড ম্যাচের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ ড্র দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করেছে ব্রাজিল। প্রথম ম্যাচেই পয়েন্ট হারানোয় কার্লো আনচেলত্তির দলের ওপর চাপ বেড়েছে। এখন গ্রুপ ‘সি’ থেকে শেষ ৩২-এ ওঠার পথে ব্রাজিলের সামনে বাকি দুই বাধা, হাইতি ও স্কটল্যান্ড। কাগজে-কলমে ব্রাজিল এগিয়ে থাকলেও দুই প্রতিপক্ষই প্রথম ম্যাচে এমন কিছু দেখিয়েছে, যা পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সতর্ক করার জন্য যথেষ্ট।

স্কটল্যান্ড প্রথম ম্যাচে হাইতিকে ১-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপের শীর্ষে উঠেছে। জয় পেয়েছে, কিন্তু খুব বেশি মুগ্ধ করতে পারেনি। অন্যদিকে হাইতি হেরেছে, কিন্তু ম্যাচের বড় অংশে সাহসী ফুটবল খেলেছে। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে স্কটল্যান্ডকে নিজেদের অর্ধে চাপে রেখে তারা দেখিয়েছে, ব্রাজিলের বিপক্ষেও সহজে হার মানার দল নয়।

বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী ব্রাজিলের পরের ম্যাচ হাইতির বিপক্ষে ২০ জুন সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে। এরপর ২৫ জুন ভোর ৪টায় স্কটল্যান্ডের মুখোমুখি হবে আনচেলত্তির দল। এই দুই ম্যাচই এখন ব্রাজিলের নকআউট ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

স্কটল্যান্ড: জয় পেয়েছে, কিন্তু সতর্কবার্তা রেখে

হাইতির বিপক্ষে স্কটল্যান্ডের জয়সূচক গোলটি করেন জন ম্যাকগিন। চে অ্যাডামসের প্রচেষ্টার পর ফিরতি বল পেয়ে গোল করেন তিনি। এই গোলই ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দেয়। তবে স্কোরলাইন যতটা সহজ মনে হচ্ছে, ম্যাচ ততটা সহজ ছিল না স্কটিশদের জন্য।

স্কটল্যান্ড মাঝমাঠে স্কট ম্যাকটমিনেকে দিয়ে খেলা গড়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা দীর্ঘ সময় ধরে হাইতির ওপর চাপ ধরে রাখতে পারেনি। বরং এগিয়ে যাওয়ার পর দলটি নিচে নেমে যায়, রক্ষণ শক্ত করে এবং পাল্টা আক্রমণের সুযোগ খোঁজে। ব্রাজিলের বিপক্ষেও তাদের পরিকল্পনা অনেকটা এমন হতে পারে।

এটাই ব্রাজিলের জন্য বিপদ। স্কটল্যান্ড সম্ভবত ব্রাজিলের সঙ্গে খোলা ফুটবল খেলবে না। তারা নিচে নেমে জায়গা বন্ধ করবে, লাইনের মাঝে ফাঁক কমাবে এবং সুযোগ পেলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণে উঠবে। ব্রাজিল যদি ধৈর্য হারায়, বেশি খেলোয়াড় সামনে তুলে দেয় বা মাঝমাঠে বল হারায়, স্কটল্যান্ড সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।

চে অ্যাডামসের রান, ম্যাকগিনের বক্সে ঢুকে পড়া এবং ম্যাকটমিনের শারীরিক উপস্থিতি ব্রাজিলকে মাথায় রাখতে হবে। বিশেষ করে মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের মাঝমাঠ যে অস্বস্তিতে পড়েছিল, সেটি স্কটল্যান্ডের চোখ এড়ানোর কথা নয়। ব্রাজিলকে তাই শুধু বল দখল করলেই হবে না; শেষ তৃতীয়াংশে সৃজনশীলতা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত দরকার হবে।

স্কটল্যান্ডের আরেক শক্তি সেট পিস ও লং বল। তাদের ডিফেন্ডাররা লম্বা, শারীরিকভাবে শক্তিশালী। হাইতির বিপক্ষে তারা অনেক সময় আকাশপথে খেলার চেষ্টা করেছে। ব্রাজিলের রক্ষণে মারকিনিয়োস ও গ্যাব্রিয়েল মাগালিয়াইস থাকলেও এই ধরনের বল সামলাতে সতর্ক থাকতে হবে।

হাইতি: হারলেও সহজ প্রতিপক্ষ নয়

হাইতির বিপক্ষে ব্রাজিলকে ফেভারিট ধরা স্বাভাবিক। কিন্তু হাইতিকে শুধু দুর্বল দল ভাবলে ভুল হবে। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তারা হেরেছে ঠিকই, কিন্তু ম্যাচে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার করেছে—তারা দ্রুত আক্রমণে উঠতে পারে, উইং দিয়ে খেলতে পারে এবং চাপ প্রয়োগ করতে ভয় পায় না।

প্রথমার্ধে হাইতি আক্রমণের বেশির ভাগ চেষ্টা করেছে দুই প্রান্ত দিয়ে। বল নিয়ে বাই-লাইনে পৌঁছে ক্রস করার প্রবণতা ছিল তাদের খেলায়। কয়েকবার তারা স্কটল্যান্ডের রক্ষণকে চাপে ফেলেছে। দ্বিতীয়ার্ধে আরও সাহসী হয়ে ওঠে দলটি। স্কটল্যান্ডকে পেছনে ঠেলে দিয়ে একাধিক সুযোগও তৈরি করে।

হাইতির সমস্যা ছিল শেষ সিদ্ধান্তে। আক্রমণে ভালো জায়গায় পৌঁছেও তারা কখনো শট নিতে দেরি করেছে, কখনো পাস বেছে নিতে ভুল করেছে, কখনো স্কটিশ ডিফেন্ডারদের ব্লকে আটকে গেছে। ব্রাজিলের বিপক্ষে এই জায়গাটাই আনচেলত্তির দল কাজে লাগাতে চাইবে। হাইতিকে জায়গা দিলে তারা বিপজ্জনক হতে পারে, কিন্তু চাপ বাড়ালে ভুল করায় বাধ্য করা সম্ভব।

স্কটল্যান্ডের গোলটিও হাইতির দুর্বলতা দেখিয়ে দিয়েছে। লং বল ও রক্ষণের পেছনের জায়গা সামলাতে তাদের সমস্যা আছে। চে অ্যাডামস ডান দিক দিয়ে উঠে শট নেন, গোলরক্ষক সেভ করলেও ফিরতি বলে ম্যাকগিন গোল করেন। ব্রাজিলের জন্য এটি হতে পারে বড় সূত্র। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনিয়া বা লুইজ হেনরিকের গতি দিয়ে হাইতির রক্ষণকে পেছনে ঠেলে দেওয়া গেলে সুযোগ আসতে পারে।

পিয়েরোকে সামলাতে হবে

হাইতির আক্রমণে ব্রাজিলের সবচেয়ে বেশি নজর রাখতে হবে ফ্রান্টজি পিয়েরোর দিকে। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে বিপজ্জনক মুখগুলোর একজন। একবার গোলের কাছাকাছি গিয়েছিলেন, আরেকবার সতীর্থকে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিলেন। তাঁর শারীরিক শক্তি, বক্সে উপস্থিতি এবং আকাশে লড়াই করার ক্ষমতা ব্রাজিলের সেন্টারব্যাকদের পরীক্ষা নিতে পারে।

ডাকেন্স নাজন এখনো পুরো ছন্দে নেই। ম্যাচ ফিটনেস ও ছন্দের ঘাটতি তাঁর খেলায় প্রভাব ফেলেছে। তবু অভিজ্ঞতা থাকায় তাঁকেও অবহেলা করার সুযোগ নেই। কিন্তু হাইতির সবচেয়ে কার্যকর হুমকি এখন পিয়েরোই।

ব্রাজিলের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা

মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের সমস্যা ছিল উদ্বিগ্ন শুরু, মাঝমাঠে ভারসাম্যহীনতা এবং আক্রমণে দলগত ছন্দের অভাব। হাইতি ও স্কটল্যান্ড, দুই দলই ভিন্নভাবে এই দুর্বলতা কাজে লাগাতে পারে।

হাইতি চাপ দেবে গতি ও তীব্রতায়। তারা ব্রাজিলের রক্ষণে ভুল খুঁজবে, বিশেষ করে দ্রুত আক্রমণে। স্কটল্যান্ড অপেক্ষা করবে নিচে নেমে, তারপর পাল্টা আক্রমণে। অর্থাৎ ব্রাজিলের সামনে দুই ম্যাচে দুই ধরনের পরীক্ষা—একটিতে গতি সামলাতে হবে, অন্যটিতে ধৈর্য রাখতে হবে।

হাইতির বিপক্ষে ব্রাজিলের দরকার দ্রুত গোল। শুরুতেই এগিয়ে গেলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে। কিন্তু সময় যত যাবে, হাইতির আত্মবিশ্বাস তত বাড়তে পারে। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে দরকার আরও বেশি ধৈর্য। সেখানে গোল না পেলে তাড়াহুড়ো করলে বিপদ।

আনচেলত্তির ভাবনা

আনচেলত্তির জন্য এখন সবচেয়ে বড় কাজ হবে সঠিক ভারসাম্য খুঁজে বের করা। মরক্কোর বিপক্ষে ডান পাশের রক্ষণ, মাঝমাঠে কাসেমিরোর গতি, পাকেতার প্রভাব এবং ইগর থিয়াগোর ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হাইতির বিপক্ষে তিনি কি আরও আক্রমণাত্মক একাদশ দেবেন, নাকি মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ বাড়াবেন, সেটি দেখার বিষয়।

ভিনিসিয়ুস জুনিয়র প্রথম ম্যাচে ব্রাজিলকে বাঁচিয়েছেন। কিন্তু হাইতি ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে শুধু ভিনিসিয়ুসের ব্যক্তিগত ঝলকের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। রাফিনিয়া, পাকেতা, ব্রুনো গিমারায়েস, কুনিয়া বা লুইজ হেনরিক, সবাইকে আক্রমণে আরও কার্যকর হতে হবে।

সমীকরণ পরিষ্কার

গ্রুপ ‘সি’তে স্কটল্যান্ড এখন ৩ পয়েন্ট নিয়ে সবার ওপরে। ব্রাজিল ও মরক্কোর পয়েন্ট ১ করে। হাইতির পয়েন্ট নেই। ফলে হাইতির বিপক্ষে জয় ব্রাজিলের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেই ম্যাচে জিতলে নকআউটের পথ অনেকটা খুলে যাবে। আর স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে অন্তত ড্র করলেই ব্রাজিল অনেক নিরাপদ অবস্থানে থাকবে।

কিন্তু হাইতির বিপক্ষে পয়েন্ট হারালে চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। তখন স্কটল্যান্ড ম্যাচ হয়ে যাবে প্রায় বাধ্যতামূলক জয়ের ম্যাচ। তাই ব্রাজিলের জন্য পরের ম্যাচ শুধু সহজ প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলা নয়; সেটি গ্রুপের চাপ কমানোর ম্যাচ।

হাইতি ও স্কটল্যান্ড, দুই দলই প্রথম ম্যাচে নিজেদের সীমাবদ্ধতা দেখিয়েছে। কিন্তু তারা বিপদের ইঙ্গিতও দিয়েছে। ব্রাজিল যদি তাদের হালকাভাবে নেয়, মরক্কো ম্যাচের মতো আরেকটি অস্বস্তিকর রাত অপেক্ষা করতে পারে।

ব্রাজিলের সামনে পথ এখনো নিজের হাতেই। তবে সেই পথে হাঁটতে হলে আনচেলত্তির দলকে বুঝতে হবে, বিশ্বকাপে নামের জোরে ম্যাচ জেতা যায় না। হাইতির গতি আর স্কটল্যান্ডের ফাঁদ, দুটিই সামলাতে হবে মাঠে।