শেষ মুহূর্তে জাপানের গোল, জয় হাতছাড়া নেদারল্যান্ডসের

বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘এফ’-এ শুরুতেই রোমাঞ্চ উপহার দিল নেদারল্যান্ডস ও জাপান। ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে দুইবার এগিয়ে গিয়েও জয় পেল না ডাচরা। বিশ্বকাপের এখন পর্যন্ত অন্যতম রোমাঞ্চকর ম্যাচে জাপানের সঙ্গে ২-২ ড্র করেছে নেদারল্যান্ডস।
৮৯ মিনিটে দাইচি কামাদার গোল ডাচদের জয় কেড়ে নেয়, আর কোম্যানের শেষ দিকের রক্ষণাত্মক সিদ্ধান্তকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলে।
ম্যাচটি ধীরে শুরু হলেও দ্বিতীয়ার্ধে রোমাঞ্চ, গতি ও গোলের ঝড় ওঠে। ভার্জিল ফন ডাইক ও ক্রিসেনসিও সামারভিল নেদারল্যান্ডসকে দুইবার এগিয়ে দেন। কিন্তু জাপানও হাল ছাড়েনি। কেইতো নাকামুরার দারুণ গোলের পর শেষ সময়ে কামাদার ছোঁয়ায় সমতা ফেরে হাজিমে মোরিয়াসুর দলের।
প্রথমার্ধ ছিল অনেকটাই সতর্কতার। নেদারল্যান্ডস বল বেশি রাখলেও আক্রমণে গতি ছিল কম। জাপানও শুরুতে খুব বেশি ঝুঁকি নেয়নি। দুই দলই যেন হার এড়ানোর নিরাপত্তায় খেলছিল। তাপমাত্রা ও ম্যাচের চাপও প্রথমার্ধের গতিকে প্রভাবিত করেছে।
তবে শুরুতেই নেদারল্যান্ডস ভালো সুযোগ পেয়েছিল। ডনিয়েল মালেন তিন মিনিটের মাথায় গোলের কাছাকাছি যান, কিন্তু জাপানি গোলরক্ষক জিওন সুজুকি দুর্দান্ত সেভ করেন। এরপর কর্নার থেকেও মালেনের হেড ঠেকিয়ে দেন সুজুকি। প্রথমার্ধে ডাচদের সবচেয়ে বড় বাধা ছিলেন তিনিই।
জাপান প্রথমার্ধের শেষ দিকে জেগে ওঠে। নাকামুরা ও আয়াসে উয়েদা পরপর দুটি সুযোগ তৈরি করেন। তবে দুজনের শটই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। বিরতিতে গোলশূন্য থাকলেও ইঙ্গিত ছিল, দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচ খুলে যেতে পারে।
সেটাই হলো। ৫১ মিনিটে এগিয়ে যায় নেদারল্যান্ডস। সেট পিসের দ্বিতীয় ধাপে ফ্রেঙ্কি দি ইয়ং ডান পাশে বল ছড়িয়ে দেন রায়ান গ্রাভেনবের্খের দিকে। তাঁর ক্রস থেকে দূরের পোস্টে হেড করেন ফন ডাইক। জাপানি ডিফেন্ডাররা আপত্তি তুললেও গোল বাতিল হয়নি।
কিন্তু ডাচদের এগিয়ে থাকা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ৫৭ মিনিটে সমতা ফেরায় জাপান। তাকেফুসা কুবো বক্সে ঢুকে বল ছাড়েন নাকামুরার দিকে। এক মুহূর্ত সময় নিয়ে নিচু ডান পায়ের শটে গোল করেন নাকামুরা। বল ডাচ গোলরক্ষক বার্ট ভারব্রুগেনকে ফাঁকি দিয়ে জালে যায়।
এরপর কয়েক মিনিট ম্যাচ পুরোপুরি খোলা হয়ে যায়। নেদারল্যান্ডস আক্রমণে জায়গা পায়, জাপানও পাল্টা আক্রমণে হুমকি তৈরি করে। ৬৪ মিনিটে আবার এগিয়ে যায় ডাচরা। বক্সের বাইরে থেকে প্রায় ডাচ কিংবদন্তি উংগার ববেনের মতো বাঁ পায়ের বাঁকানো শটে গোল করেন সামারভিল। বল পোস্টে লেগে জালে ঢোকে। ডাচদের বেঞ্চে তখন স্বস্তি।
কিন্তু সেই স্বস্তিই হয়তো নেদারল্যান্ডসের বিপদ ডেকে আনে। ২-১ এগিয়ে যাওয়ার পর কোম্যান দলকে আরও রক্ষণাত্মক করে তোলেন। রেইন্ডার্স ও গ্রাভেনবের্খের মতো মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ দেওয়া খেলোয়াড়দের তুলে নিয়ে নামানো হয় নাথান আকে ও ইউরিয়েন টিম্বারকে। এতে নেদারল্যান্ডস ধীরে ধীরে নিচে নেমে যায়।
জাপান সেই সুযোগ নেয়। শেষ ২০ মিনিটে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় মোরিয়াসুর দলের হাতে। ডান দিক দিয়ে জুনিয়া ইতো ও ইউকিনারি সুগাওয়ারা বারবার আক্রমণ তৈরি করেন। নেদারল্যান্ডস বল ধরে রাখতে পারছিল না, নিজেদের অর্ধ থেকে বেরোতেও কষ্ট হচ্ছিল। ডাচরা তখন শুধু সময় পার করতে চাইছিল, আর জাপান খুঁজছিল সমতার গোল।
৮৯ মিনিটে সেই গোলই আসে। কর্নার থেকে কোকি ওগাওয়া লাফিয়ে হেড করেন। বল কামাদার গায়ে লেগে দিক বদলে ভারব্রুগেনকে ফাঁকি দিয়ে জালে জড়ায়। জাপানের সমর্থকেরা উল্লাসে ফেটে পড়েন, নেদারল্যান্ডসের খেলোয়াড়েরা দাঁড়িয়ে থাকেন হতাশায়।
শেষ মুহূর্তে নেদারল্যান্ডস আবার চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করে। মেম্ফিস ডিপাই, ডামফ্রিস, ব্রবি, সবাই মিলে জয়সূচক গোল খুঁজেছেন। কিন্তু জাপান রক্ষণে স্থির ছিল। শেষ পর্যন্ত ২-২ ড্র নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয় দুই দলকে।
পরিসংখ্যান বলছে, নেদারল্যান্ডসই ম্যাচে বেশি বল রেখেছে। তাদের বল দখল ছিল ৫৯.৮ শতাংশ, জাপানের ৪০.২। প্রত্যাশিত গোলের হিসাবেও এগিয়ে ছিল ডাচরা, ০.৭৯; জাপানের ০.৫৪। নেদারল্যান্ডসের লক্ষ্যে শট ছিল ৬টি, জাপানের ৩টি। পাস সম্পন্ন করার হিসাবেও ডাচরা অনেক এগিয়ে, ৫২৫; জাপানের ৩৪২।
কিন্তু ফুটবলে শুধু সংখ্যা ম্যাচ জেতায় না। নেদারল্যান্ডস বেশি বল রেখেছে, বেশি শট নিয়েছে, প্রতিপক্ষের বক্সে বেশি ঢুকেছে। তবু শেষ সময়ে অতিরিক্ত নিচে নেমে গিয়ে তারা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। জাপানের পুরস্কার এসেছে ধৈর্য, গতি ও শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার মানসিকতা থেকে।
