মায়ের ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি করলেন ভোজিনিয়া

ম্যাচের আগের দিনই ছেলেকে নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন মা। বলেছিলেন, আমার ছেলের জালে কোনো বল ঢুকবে না। একদিন পর বিশ্বকাপের মঞ্চে সেই কথাই সত্যি করে দেখালেন কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে বিশ্বকাপ অভিষেকেই দেশকে এনে দিলেন ঐতিহাসিক এক পয়েন্ট।
কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ অভিষেক ম্যাচ শেষ হয়েছে গোলশূন্য ড্রয়ে। প্রতিপক্ষ ছিল স্পেন, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন। বল দখল, আক্রমণ, সুযোগ তৈরি—সব দিক থেকেই ম্যাচের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করেছে স্পেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভোজিনিয়াকে পরাস্ত করতে পারেনি তারা।
৪০ বছর বয়সী এই গোলরক্ষকের আসল নাম জোসিমার দিয়াস। ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই তিনি এমন পারফরম্যান্স করলেন, যা কেপ ভার্দের ফুটবল ইতিহাসে আলাদা জায়গা পাবে। স্পেন ৭৫ শতাংশ সময় বল নিজেদের দখলে রেখেছিল, গোলের চেষ্টা করেছিল ২৭ বার। তবু কেপ ভার্দের জাল অক্ষত থাকে ভোজিনিয়ার দৃঢ়তায়। ম্যাচে ৭টি সেভ করেন তিনি।
ম্যাচের আগের দিন রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ছেলেকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ভোজিনিয়ার মা আনা কান্দিদা এভোরা বলেছিলেন, তাঁর ছেলে গোল খাবে না। স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে সেই কথাই গর্বের সঙ্গে মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, তিনি আগেই বলেছিলেন ভোজিনিয়ার জালে কোনো বল ঢুকবে না, আর সেটাই হয়েছে।
৫৯ বছর বয়সী আনা কান্দিদা এভোরা পেশায় গৃহকর্মী। ছেলের পারফরম্যান্সে তিনি গর্বিত। তাঁর বিশ্বাস, ভোজিনিয়া দুর্দান্ত গোলরক্ষক এবং সামনে আসা প্রতিটি বলই সে ঠেকিয়ে দিতে পারে।
তবে এই আনন্দের রাতেও ছিল আক্ষেপ। আটলান্টার মাঠে ছেলের বিশ্বকাপ ইতিহাস গড়া পারফরম্যান্স সামনে থেকে দেখতে পারেননি ভোজিনিয়ার মা। খরচ, দীর্ঘ ভ্রমণ এবং ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারেননি তিনি। তাই সাও ভিসেন্তের মিনদেলোতে নিজের বাড়ি থেকেই তাঁকে দেখতে হয়েছে ছেলের বীরত্ব।
ম্যাচ শেষে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি ভোজিনিয়া। শেষ বাঁশির পর কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। পরে সাংবাদিকদের জানান, তাঁর আবেগের একটি বড় কারণ ছিল মা স্টেডিয়ামে থাকতে না পারা। জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজের অন্যতম সেরা রাত কাটালেন তিনি, কিন্তু সেই মুহূর্তটি গ্যালারিতে বসে দেখতে পারলেন না তাঁর মা।
এবারের বিশ্বকাপ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের নিয়ম কেপ ভার্দের অনেক মানুষের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বছরের শুরুতে নতুন ভিসা-বন্ড নীতির কারণে কেপ ভার্দেসহ কয়েকটি দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে যেতে বাড়তি আর্থিক নিশ্চয়তা দেখানোর শর্ত ছিল। পরে বিশ্বকাপের টিকিটধারীদের জন্য সেই শর্ত শিথিল করা হয়। কিন্তু তত দিনে ভোজিনিয়ার মা ভ্রমণের পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছিলেন।
শুধু ভিসা-বন্ড নয়, আটলান্টা পর্যন্ত বিমানভাড়া, থাকা-খাওয়া এবং ম্যাচের টিকিট—সব মিলিয়ে খরচও ছিল তাঁর নাগালের বাইরে। কেপ ভার্দের মতো ছোট দ্বীপদেশের সাধারণ মানুষের জন্য বিশ্বকাপে যাওয়া সহজ নয়। দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মারিও সেমেদোও বলেছেন, বিমানভাড়া, আবাসন ও টিকিটের খরচ অনেক বেশি। বিশেষ করে কোনো ফুটবলারের পরিবারের সদস্য যদি বিশ্বকাপে যেতে চান, তাঁদের জন্য সহযোগিতা থাকা উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ডেমোক্র্যাটিক নেতা হাকিম জেফ্রিস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, কোনো মায়েরই সন্তানের ইতিহাস গড়ার মুহূর্ত দেখা থেকে বঞ্চিত হওয়া উচিত নয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যেন ভোজিনিয়ার মা পরের ম্যাচে উপস্থিত থাকতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়।
কেপ ভার্দের জন্য স্পেনের বিপক্ষে ড্র ছিল স্বপ্নের মতো। ১০টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত ছোট্ট দেশটি প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলছে। আর প্রথম ম্যাচেই স্পেনের মতো শক্তিশালী দলকে রুখে দেওয়া দেশজুড়ে উৎসবের আবহ তৈরি করেছে। সাও ভিসেন্তেতে রাতভর মানুষ পতাকা হাতে নেচেছে, গাড়ির হর্ন বাজিয়েছে, গান গেয়েছে।
ভোজিনিয়ার ভাই ডেভিডসন এভোরা বলেছেন, তাঁর ভাইয়ের পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ। এক গোলরক্ষকের সেভ শুধু একটি ম্যাচ বাঁচায়নি, পুরো দেশকে আনন্দে ভাসিয়েছে। পরিবারের কাছে এটি ভাষায় প্রকাশ করার মতো অনুভূতি নয়।
এখন প্রশ্ন, ভোজিনিয়ার পরিবার কি শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার চেষ্টা করবে? কেপ ভার্দের পরের ম্যাচ রোববার মায়ামিতে উরুগুয়ের বিপক্ষে। ভোজিনিয়ার ভাই বলেছেন, এমন সুযোগ হলে তা হবে অসাধারণ। তবে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা হয়নি।
.png)

