logo

জন্মভূমির বিশ্বকাপে অদৃশ্য চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স

জন্মভূমির বিশ্বকাপে অদৃশ্য চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স
ছবি: সংগৃহীত

২০২৬ বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। ৪৮ দল, ১ হাজার ২৪৮ ফুটবলার, উত্তর আমেরিকার তিন দেশজুড়ে আয়োজন। কিন্তু এই বিশ্বকাপের বৈশ্বিক চরিত্র শুধু অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যায় আটকে নেই। মাঠে নামা ফুটবলারদের জন্মভূমির তালিকা দেখালেই বোঝা যায়, আধুনিক ফুটবল এখন আর শুধু পাসপোর্টের গল্প নয়; এটি অভিবাসন, পরিবার, শিকড় ও পরিচয়েরও গল্প।

দ্য অ্যাথলেটিকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ১ হাজার ২৪৮ ফুটবলারের মধ্যে ২৯২ জন জন্মেছেন সেই দেশের বাইরে, যে দেশের হয়ে তারা খেলছেন। আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, এই ২৯২ ফুটবলারের জন্ম হয়েছে এমন ১৯টি দেশেও, যারা নিজেরা ২০২৬ বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারেনি। অর্থাৎ কোনো দেশ মাঠে নেই, কিন্তু সেই দেশে জন্ম নেওয়া ফুটবলার আছে অন্য দেশের জার্সিতে।

এই তালিকায় সবচেয়ে বড় নাম ফ্রান্স। ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলা ফুটবলারদের মধ্যে ৯৮ জনের জন্ম ফ্রান্সে। শুধু ফরাসি জাতীয় দলের ফুটবলার নন, অন্য দেশগুলোর হয়েও খেলছেন ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া বহু খেলোয়াড়। সংখ্যাটা এত বড় যে, অংশগ্রহণকারী ফুটবলারদের জন্মভূমির হিসেবে ফ্রান্স এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।

ফ্রান্সের ফুটবল কাঠামো বহু বছর ধরেই ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিভা তৈরির কারখানা। প্যারিস ও তার আশপাশের অঞ্চল, বিশেষ করে অভিবাসী অধ্যুষিত শহরতলি থেকে উঠে এসেছে অসংখ্য ফুটবলার। ফরাসি ক্লাব একাডেমি, স্থানীয় ফুটবল সংস্কৃতি, বহুজাতিক সমাজ ও অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের ফুটবল-স্বপ্ন মিলেই তৈরি করেছে বিশাল এক খেলোয়াড় ভান্ডার। সেই ভান্ডার শুধু ফ্রান্স জাতীয় দলকে শক্তিশালী করেনি, শক্তি দিয়েছে আফ্রিকা, ইউরোপ ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের নানা জাতীয় দলকেও।

এই কারণেই ২০২৬ বিশ্বকাপকে অনেকেই প্রবাসী শিকড়ের বিশ্বকাপ বলছেন। একটি দেশের জার্সি মানেই এখন আর সেই দেশের জন্মভূমি নয়। কেউ জন্মেছেন ইউরোপে, বড় হয়েছেন উত্তর আমেরিকায়, খেলছেন আফ্রিকার দেশের হয়ে। কেউ জন্মেছেন ফ্রান্সে, প্রতিনিধিত্ব করছেন পিতামাতার জন্মভূমিকে। কেউ আবার নিজের জন্মভূমির বদলে সেই দেশকে বেছে নিয়েছেন, যে দেশ তাকে ফুটবল শিক্ষা দিয়েছে।

1000036057
1000036057

E

জাপানের গোলরক্ষক জিওন সুজুকির গল্প যেমন এই বিশ্বকাপের পরিচয়-গল্পের একটি অংশ। তার জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের আরকানসাসে, বাবা ঘানার, মা জাপানের। কিন্তু তিনি এখন জাপানের গোলরক্ষক। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ২-২ ড্রয়ের ম্যাচে জাপানের গোলের নিচে দাঁড়ানো সুজুকি শুধু একজন ফুটবলার নন; আধুনিক ফুটবলের বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীকও।

কেপ ভার্দের রবার্তো ‘পিকো’ লোপেসের গল্প আরও নাটকীয়। ডাবলিনে জন্ম, আয়ারল্যান্ডে বেড়ে ওঠা, একসময় ব্যাংকের চাকরি করা এই ডিফেন্ডার এখন কেপ ভার্দের হয়ে বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন। তাঁর বাবা কেপ ভার্দের মানুষ। লিংকডইনে পাওয়া এক বার্তার সূত্র ধরে তিনি যুক্ত হন কেপ ভার্দে জাতীয় দলে। এবার সেই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচে স্পেনের বিপক্ষে নামার অপেক্ষায় তিনি।

এই গল্পগুলো দেখায়, বিশ্বকাপের মানচিত্র শুধু ফিফার গ্রুপ ড্র দিয়ে বোঝা যায় না। জন্মভূমির মানচিত্র আলাদা, পাসপোর্টের মানচিত্র আলাদা, আর আবেগের মানচিত্র আরও আলাদা। একজন ফুটবলার যে দেশের হয়ে খেলেন, সেই সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে পরিবার, অভিবাসন, শৈশব, সুযোগ, গ্রহণযোগ্যতা ও কখনো রাজনৈতিক বাস্তবতাও।

ফ্রান্সের ৯৮ জন জন্মভূমি-সংখ্যা তাই শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি ফরাসি ফুটবল ব্যবস্থার শক্তির প্রমাণ। একই সঙ্গে এটি দেখায়, ফ্রান্সের সামাজিক বাস্তবতা ও ফুটবল উন্নয়ন কীভাবে বৈশ্বিক খেলোয়াড় সরবরাহের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া ফুটবলাররা আজ শুধু লে ব্লুদের হয়ে নয়, নানা দেশের হয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের শিকড়কে প্রতিনিধিত্ব করছেন।

এই ধারা নতুন নয়, তবে ৪৮ দলের বিশ্বকাপে তা আরও স্পষ্ট। দল বেড়েছে, সুযোগ বেড়েছে, খেলোয়াড়ের পরিচয়ের পরিসরও বেড়েছে। আগে অনেক প্রতিভা বড় ফুটবল দেশের জাতীয় দলে সুযোগ না পেলে আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে হারিয়ে যেত। এখন অনেকেই পিতৃভূমি, মাতৃভূমি বা পারিবারিক শিকড়ের দেশের হয়ে বিশ্বকাপ খেলার পথ পাচ্ছেন।

এতে ছোট দলগুলোর শক্তিও বাড়ছে। কেপ ভার্দে, কুরাসাও, মরক্কো, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, সেনেগাল—অনেক দেশের দলেই ইউরোপে জন্ম নেওয়া বা বেড়ে ওঠা ফুটবলারদের বড় ভূমিকা আছে। তারা ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের শিক্ষা, গতির মান, কৌশলগত শৃঙ্খলা এবং অভিজ্ঞতা নিয়ে আসেন জাতীয় দলে। ফলে ঐতিহ্যগতভাবে ছোট দলও বড় মঞ্চে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে।

দ্য অ্যাথলেটিকের আরেকটি পরিসংখ্যানও আধুনিক ফুটবলের পালাবদল দেখায়। নেদারল্যান্ডস জাপানের বিপক্ষে ২-২ ড্রয়ের ম্যাচে তাদের বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবার এমন একাদশ নামিয়েছে, যেখানে দেশটির ঘরোয়া লিগ ইরেডিভিসির কোনো খেলোয়াড় ছিল না। একসময় আয়াক্স ও ডাচ লিগ বিশ্ব ফুটবলের কৌশলগত বিপ্লবের কেন্দ্র ছিল। এখন সেই লিগ থেকে বিশ্বকাপে খেলোয়াড়ের সংখ্যা ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় স্তরের লিগ চ্যাম্পিয়নশিপের চেয়েও কম।

অর্থাৎ বিশ্বকাপের মানচিত্রে শুধু দেশ নয়, লিগের প্রভাবও বদলাচ্ছে। কোন লিগ খেলোয়াড় তৈরি করছে, কোন দেশ জন্মভূমি হিসেবে সবচেয়ে বেশি ফুটবলার দিচ্ছে, কোন প্রবাসী শিকড় কোন জাতীয় দলকে শক্তিশালী করছে—এসব এখন বিশ্বকাপ বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ফুটবলে দেশপ্রেম আছে, পতাকার আবেগ আছে, জাতীয় সংগীত আছে। কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও জটিল এক বাস্তবতা। অনেক ফুটবলার একাধিক পরিচয় নিয়ে বড় হন। জন্ম এক দেশে, পরিবার আরেক দেশের, ক্লাব ক্যারিয়ার তৃতীয় দেশে, জাতীয় দল চতুর্থ বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে। আধুনিক বিশ্বকাপ সেই বহুমাত্রিক পরিচয়কে সামনে নিয়ে আসে।

২০২৬ বিশ্বকাপ তাই শুধু সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ নয়। এটি সবচেয়ে বেশি সংযুক্ত বিশ্বকাপও। এখানে ফ্রান্স শুধু নিজের দল নিয়ে নেই, জন্মভূমির যোগসূত্রেও আছে। এখানে জাপানের গোলরক্ষকের গল্প যুক্তরাষ্ট্র, ঘানা ও জাপানকে এক করে। এখানে ডাবলিনে জন্ম নেওয়া ডিফেন্ডার কেপ ভার্দের ইতিহাসের অংশ হন।

শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিতবে একটি দেশ। কিন্তু এই টুর্নামেন্টের ভেতরের গল্প বলছে, ফুটবল অনেক আগেই সীমান্ত পেরিয়ে গেছে। জার্সির রং আলাদা হতে পারে, জন্মভূমির গল্প আলাদা হতে পারে, কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে সব গল্প এসে মিশছে এক জায়গায়।

২০২৬ বিশ্বকাপ তাই আর শুধু কোন দেশ জিতবে সেই প্রশ্ন নয়। এটাও প্রশ্ন, কোন দেশ কত ফুটবলার তৈরি করছে, কোন প্রবাসী শিকড় কোন দলকে বদলে দিচ্ছে, আর আধুনিক ফুটবল আসলে কতটা বৈশ্বিক হয়ে উঠেছে।

এই প্রশ্নের প্রথম বড় উত্তর: জন্মভূমির তালিকায় ফ্রান্স এখন বিশ্বকাপের অদৃশ্য চ্যাম্পিয়ন।