১৭ হাজার কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে মেসিদের কাছে তিন আর্জেন্টাইন

বিশ্বকাপের টান মানুষকে কত দূর নিয়ে যেতে পারে? আর্জেন্টিনার তিন সমর্থকের গল্প শুনলে এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো নতুন করে ভাবতে হবে। মিগেল সিলিও, ভিসেন্তে কনকুলিনি ও ইয়ামান্দু মার্তিনেজ—এন্ত্রে রিওস প্রদেশের গুয়ালেগুয়াইচু শহরের এই তিন আর্জেন্টাইন সাইকেল নিয়ে বেরিয়েছিলেন গত আগস্টে। তখনও জানা ছিল না, ২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা কোথায় খেলবে কিংবা কোথায় থাকবে। তবু তারা রওনা দিয়েছিলেন, কারণ গন্তব্যের নাম ছিল একটাই—আর্জেন্টিনা জাতীয় দল।
প্রায় ৩০০ দিনের দীর্ঘ পথচলা শেষে তাঁরা পৌঁছেছেন কানসাসে, যেখানে বিশ্বকাপের জন্য বেস ক্যাম্প করেছে আলবিসেলেস্তেরা। ১৭ হাজার কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে, ১৭টি দেশ পেরিয়ে, নানা অনিশ্চয়তা আর বিপদ মাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত স্কালোনির দলের মুখোমুখি হয়েছেন তাঁরা। সেখানে তাঁদের স্বাগত জানিয়েছেন আর্জেন্টিনা দলের কোচ লিওনেল স্কালোনি এবং আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) সভাপতি ক্লদিও তাপিয়া।
এমন গল্প বিশ্বকাপের আবহকেই বদলে দেয়। কারণ এটি শুধু তিনজন মানুষের সাধারণ ভ্রমণ নয়; এটি আর্জেন্টাইন ফুটবলপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের প্রতি যে আবেগ, লিওনেল মেসি ও স্কালোনির দলকে ঘিরে যে উন্মাদনা, সেটি এবার লেখা হলো সাইকেলের চাকার ঘূর্ণনে।
ক্লদিও তাপিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, ‘আর্জেন্টাইন সমর্থকদের এই রঙ ও 'স্কালোনেতা'র প্রতি ভালোবাসার কোনো সীমা নেই, কোনো সীমানা নেই।’ তিন সাইকেলযাত্রীর প্রোফাইল উল্লেখ করে তিনি এই ঘটনাকে সীমাহীন পাগলামির এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছেন।

এই যাত্রা শুরু হয়েছিল গত আগস্টে, বিশ্বকাপের ড্র হওয়ারও অনেক আগে। তখন আর্জেন্টিনা কোন শহরে খেলবে, কোন পথে যেতে হবে—তার কিছুই নিশ্চিত ছিল না। তবু গুয়ালেগুয়াইচু পৌরসভা এলাকা থেকে উত্তর আমেরিকার উদ্দেশে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন সিলিও, কনকুলিনি ও মার্তিনেজ। তাঁদের কাছে পথের হিসাবের চেয়ে বড় ছিল স্বপ্নের হিসাব।
প্রিয় দলের কাছে পৌঁছানোর আগে যাত্রাপথে আরেক আর্জেন্টাইন কিংবদন্তির সঙ্গেও দেখা হয়েছে তাঁদের। সান আন্তোনিওতে তাঁরা দেখা করেন বাস্কেটবল তারকা এমানুয়েল জিনোবিলি’র সঙ্গে। কনকুলিনি জানিয়েছেন, ইনস্টাগ্রামে বার্তা পাঠানোর পর জিনোবিলির সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ হয়। এরপর তাঁরা সেমিফাইনালের একটি ম্যাচ দেখতে যান এবং পরদিন জিনোবিলি তাঁদের কফির আমন্ত্রণ জানান। সেখানে জিনোবিলির মা-ও উপস্থিত ছিলেন। কফি আর 'মাতে' (আর্জেন্টাইন ঐতিহ্যবাহী চা) পান করতে করতে চমৎকার দেড় ঘণ্টা সময় কাটে তাঁদের।
তবে ১৭ হাজার কিলোমিটারের এই দীর্ঘ যাত্রা শুধুই রোমাঞ্চে ভরা ছিল না, পথে ছিল চরম আতঙ্কও। ইকুয়েডরে থাকাকালীন মাচালা অঞ্চলের একটি কারাগারে দাঙ্গার সময় তীব্র সহিংস পরিস্থিতির মুখে পড়েছিলেন তাঁরা। অন্যদিকে কলম্বিয়ায় গাড়িবোমা বিস্ফোরণের ঘটনাও তাঁদের যাত্রাপথকে বিপজ্জনক করে তুলেছিল। কিন্তু কোনো বাধাই তাঁদের থামাতে পারেনি।
এই তিন সমর্থকের গল্পে আর্জেন্টিনা ফুটবলের চেনা আবেগই ফুটে উঠেছে। ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পর স্কালোনির দল শুধু একটি ফুটবল দল নয়, দেশটির মানুষের কাছে এক প্রজন্মের আনন্দ, মুক্তি ও গর্বের প্রতীক। তাই দল যেখানে যায়, সমর্থকদের মনও সেখানে ছুটে যায়। কেউ বিমানে, কেউ গাড়িতে, কেউবা দূর থেকে টিভির সামনে বসেন; আর এই তিনজন গেছেন সাইকেলে।
এত কিছুর পরও শেষ মুহূর্তে এসে তাঁদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তাটি কাটেনি—সেটি হলো ম্যাচের টিকিট। তাঁরা জানিয়েছেন, ফিফার টিকিট বিক্রির সময় পাঁচবার চেষ্টা করেও সফল হননি। পুনর্বিক্রির (রিসেল) বাজারে টিকিটের দাম আকাশছোঁয়া। তারপরও তাঁদের লক্ষ্য পরিষ্কার—আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচে যেভাবেই হোক গ্যালারিতে থাকতে হবে।
আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলবে ১৬ জুন, প্রতিপক্ষ আলজেরিয়া। সেই ম্যাচে গ্যালারিতে বসার সুযোগ পাবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয় এই তিন সাইকেলযাত্রীর। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন তাঁদের কোনোভাবে সহায়তা করবে কি না, সেটিও এখন দেখার বিষয়।
তবে টিকিট থাকুক বা না থাকুক, তাঁদের এই রোমাঞ্চকর যাত্রা ইতিমধ্যেই বিশ্বকাপের ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। কারণ তাঁরা কানসাসে পৌঁছেছেন শুধু সাইকেল চালিয়ে নয়, পৌঁছেছেন এক অদম্য ফুটবল বিশ্বাস বুকে নিয়ে। যে বিশ্বাসে দূরত্ব ছোট হয়ে যায়, ক্লান্তি হার মানে, আর বিশ্বকাপ হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে বড় অভিযান।
মিগেল সিলিও, ভিসেন্তে কনকুলিনি ও ইয়ামান্দু মার্তিনেজের এই যাত্রা মনে করিয়ে দেয়, বিশ্বকাপ শুধু মাঠের ৯০ মিনিটের খেলা নয়। এটি আসলে সেই মানুষগুলোর গল্প, যারা দলকে ভালোবেসে নিজের জীবনকেই পথ বানিয়ে নেয়।
১৭ দেশ, ১৭ হাজার কিলোমিটার আর প্রায় ৩০০ দিনের যাত্রা শেষে গন্তব্য এখন কানসাস। এখন তাঁদের অপেক্ষা শুধু একটাই: আলবিসেলেস্তেদের প্রথম ম্যাচে গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে আবারও গলা ফাটিয়ে বলা—'ভামোস আর্জেন্টিনা'।
.png)


