logo

বিশ্বকাপের আগে স্কালোনির দুশ্চিন্তার নাম ফুল-ব্যাক

বিশ্বকাপের আগে স্কালোনির দুশ্চিন্তার নাম ফুল-ব্যাক
লিওনেল স্কালোনি। ছবি: সংগৃহীত

২০২২ কাতার বিশ্বকাপের শিরোপাজয়ী দলটির মূল কাঠামো ধরে রেখেই ২০২৬ বিশ্বকাপে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসি আছেন, আছেন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, নিকোলাস ওতামেন্দি, রদ্রিগো ডি পল, এনজো ফার্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, হুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্তিনেজের মতো পরীক্ষিত মুখ। কাগজে-কলমে তাই বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের আবারও ফেবারিটের তালিকায় রাখাই স্বাভাবিক।

তবু লিওনেল স্কালোনির দলকে ঘিরে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসছে। সেটি মেসির বয়স বা আক্রমণভাগের ধার নয়, বরং রক্ষণভাগের দুই প্রান্ত। বিশ্বকাপের মতো দীর্ঘ ও চাপের টুর্নামেন্টে ফুল-ব্যাক পজিশনই এখন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গা হয়ে উঠতে পারে।

স্কালোনি ২৬ সদস্যের দলে ২০২২ বিশ্বকাপজয়ী স্কোয়াডের ১৭ জনকে রেখেছেন। অভিজ্ঞতার সঙ্গে ভবিষ্যতের কথা ভেবে জায়গা দিয়েছেন ভ্যালেন্তিন বারকো, নিকোলাস পাজ, জুলিয়ানো সিমিওনে, থিয়াগো আলমাদা ও হোসে ম্যানুয়েল লোপেজদের। কিন্তু এই ভারসাম্যের মাঝেও মার্কোস আকুনিয়ার না থাকা আলাদা করে আলোচনায় এসেছে।

কাতার বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য আকুনিয়া ফিটনেসজনিত কারণে এবার দলে নেই। এতে বাঁ দিকের রক্ষণে নিকোলাস তাগলিয়াফিকোর ওপর দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। স্কোয়াডে বারকো আছেন, ফাকুন্দো মেদিনাকেও প্রয়োজন হলে ওই জায়গায় ব্যবহার করা যায়। কিন্তু বড় মঞ্চে নিয়মিত লেফট-ব্যাক হিসেবে তাগলিয়াফিকোর মতো পরীক্ষিত বিকল্পের অভাব আর্জেন্টিনার জন্য বাস্তব চিন্তার কারণ।

ডান দিকেও প্রশ্ন একেবারে নেই, তা বলা যাবে না। নাহুয়েল মোলিনা স্কালোনির প্রথম পছন্দের রাইট-ব্যাক। ২০২২ বিশ্বকাপে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। গনসালো মনতিয়েলও দলে আছেন, যিনি কাতার ফাইনালের টাইব্রেকারে শেষ পেনাল্টি নিয়ে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক চোট ও ম্যাচ ফিটনেস নিয়ে আলোচনা এই জায়গাটিকেও স্পর্শ করেছে। বিশ্বকাপে টানা ম্যাচের চাপ, ভ্রমণ, আবহাওয়া ও প্রতিপক্ষের গতির বিপক্ষে ফুল-ব্যাকদের ওপর চাপ অনেক বেশি থাকবে।

কেন ফুল-ব্যাক পজিশন এত গুরুত্বপূর্ণ

আর্জেন্টিনার খেলার ধরনে ফুল-ব্যাকরা শুধু রক্ষণ সামলান না। তারা আক্রমণে প্রস্থ তৈরি করেন, মাঝমাঠে বল এগিয়ে নিতে সহায়তা করেন, উইঙ্গারদের সঙ্গে সমন্বয় করেন এবং প্রতিপক্ষের কাউন্টার আক্রমণ ঠেকাতে দ্রুত নিচে নেমে আসেন। মোলিনা ও তাগলিয়াফিকো ফিট ও ছন্দে থাকলে এই কাঠামো অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ দেখায়। কিন্তু তাদের কারও ফর্মে ধস নামলে বা চোট এলে স্কালোনিকে দ্রুত পরিকল্পনা বদলাতে হতে পারে।

এখানেই সমস্যা। আর্জেন্টিনার মূল কাঠামো খুব শক্তিশালী হলেও ফুল-ব্যাক পজিশনে একই মানের গভীরতা নেই। লিসান্দ্রো মার্তিনেজ, ফাকুন্দো মেদিনা বা মনতিয়েলের মতো ফুটবলাররা প্রয়োজনে একাধিক ভূমিকায় খেলতে পারেন। কিন্তু বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে বিশেষায়িত ফুল-ব্যাকের অভাব কখনো কখনো বড় ঝুঁকি তৈরি করে।

মাঝমাঠ ও আক্রমণে আর্জেন্টিনার ছবি তুলনামূলক স্বস্তির। ডি পল, ম্যাক অ্যালিস্টার, এনজো, লিয়ান্দ্রো পারেদেস, জিওভানি লো সেলসো ও এক্সেকিয়েল পালাসিওসের উপস্থিতি স্কালোনিকে নানা ধরনের কম্বিনেশন সাজানোর সুযোগ দিচ্ছে। সামনে মেসির সঙ্গে হুলিয়ান আলভারেজ, লাউতারো মার্তিনেজ, নিকোলাস গনসালেস, আলমাদা, পাজ ও সিমিওনের মতো বিকল্পও আছে।

কিন্তু রক্ষণে প্রান্তের ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব পুরো দলে পড়ে। ফুল-ব্যাকরা ওপরে উঠতে না পারলে আর্জেন্টিনার আক্রমণ মাঝখানে বেশি ভিড় করে। আবার অতিরিক্ত ওপরে উঠলে পেছনে জায়গা তৈরি হয়, যা দ্রুতগতির উইঙ্গার থাকা দলগুলো কাজে লাগাতে পারে। বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়ার মতো গতিশীল ও সংগঠিত দল, কিংবা আলজেরিয়ার মতো শারীরিকভাবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এটি বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।

আর্জেন্টিনা গ্রুপ ‘জে’-তে অভিযান শুরু করবে ১৬ জুন আলজেরিয়ার বিপক্ষে। এরপর তাদের প্রতিপক্ষ জর্ডান ও অস্ট্রিয়া। কাগজে-কলমে আর্জেন্টিনা গ্রুপের সবচেয়ে শক্তিশালী দল। কিন্তু বিশ্বকাপের বাস্তবতা হলো, ছোট ভুলও অনেক সময় বড় মূল্য দাবি করে। বিশেষ করে শিরোপা ধরে রাখার চাপ যখন কাঁধে থাকে।

স্কালোনির সবচেয়ে বড় শক্তি অবশ্য এই দলকে পরিস্থিতি অনুযায়ী বদলাতে পারার ক্ষমতা। কাতার বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে হারের পরও তিনি দলকে পুনর্গঠন করেছিলেন। প্রতিপক্ষ অনুযায়ী একাদশ, মাঝমাঠের ভারসাম্য ও রক্ষণ কাঠামো বদলে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা এনে দিয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা এবারও তার বড় অস্ত্র।

তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের চ্যালেঞ্জ আলাদা। মেসির বয়স এখন ৩৮। দি মারিয়া নেই। ২০২২ সালের অনেক পরীক্ষিত মুখ এখনও আছেন, কিন্তু তাদের পাশে নতুন প্রজন্মকেও জায়গা দিতে হয়েছে। ফলে এই দলটি একদিকে চ্যাম্পিয়ন, অন্যদিকে পরিবর্তনের মধ্যেও আছে।

আর্জেন্টিনা তাই দুর্বল দল নয়। বরং তারা আবারও শিরোপার দাবিদার। কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী দলগুলোরও কিছু সূক্ষ্ম ফাটল থাকে। স্কালোনির আর্জেন্টিনার সেই ফাটল আপাতত ফুল-ব্যাক পজিশনে।

মেসির সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ অধ্যায়ে আর্জেন্টিনা ইতিহাস গড়তে নামছে। ১৯৬২ সালের ব্রাজিলের পর কোনো দল টানা দুটি বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। সেই দীর্ঘ অপেক্ষা শেষ করতে হলে শুধু মেসির জাদু বা আক্রমণভাগের ধারই যথেষ্ট হবে না। দরকার হবে রক্ষণভাগের দুই প্রান্তে স্থিতিশীলতা, ফিটনেস ও সঠিক সিদ্ধান্ত।