যে জাহাজে চড়ে শুরু হয়েছিল বিশ্বকাপের মহাযাত্রা

আজকের বিশ্বকাপে দলগুলোর যাত্রা শুরু হয় চার্টার্ড ফ্লাইটে, বিলাসবহুল টিম হোটেলে,জিপিএস-ভেস্টে মাপা অনুশীলনে, ভিডিও অ্যানালিস্টের স্ক্রিনে। বিমানবন্দরে নামার আগেই জানিয়ে দেওয়া হয় কোন মাঠে কত মিনিট হালকা সেশন হবে, কোন খেলোয়াড়ের কতটা লোড নেওয়া উচিত, কে কত দূর দৌড়াল, কার ঘুম কেমন হলো। আধুনিক ফুটবল এতটাই বৈজ্ঞানিক, এতটাই নিয়ন্ত্রিত যে বিশ্বকাপ এখন শুধু মাঠের টুর্নামেন্ট নয়, লজিস্টিকস, ডেটা আর প্রস্তুতিরও যুদ্ধ।
কিন্তু প্রথম বিশ্বকাপের গল্প শুরু হয়েছিল একেবারেই অন্যভাবে।
১৯৩০ সালে ফুটবলের সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্টে যেতে ইউরোপের দলগুলোর সামনে ছিল না প্রাইভেট জেট, ছিল না সরাসরি ফ্লাইট, ছিল না ফিফার বিলাসী আয়োজন। ছিল আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার দীর্ঘ, ক্লান্তিকর সমুদ্রযাত্রা। উরুগুয়েতে বসতে যাচ্ছে প্রথম বিশ্বকাপ, কিন্তু ইউরোপের অনেক দেশই যেতে চাইছিল না। কারণ পথ দীর্ঘ, খরচ বেশি, খেলোয়াড়দের কাজ থেকে ছুটি পাওয়া কঠিন, আর একবার রওনা দিলে কয়েক সপ্তাহের জন্য জীবনটাই যেন জাহাজে বন্দি।
সেই অনিশ্চয়তার মধ্যে বিশ্বকাপের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখে একটি জাহাজ, এস এস কন্তে ভার্দে। রোমানিয়া, ফ্রান্স, বেলজিয়ামসহ ইউরোপের দলগুলো আটলান্টিক পাড়ি দেয় এই জাহাজে। একই জাহাজে ছিলেন ফিফা সভাপতি জুল রিমে, ছিল বিশ্বকাপের ট্রফি, ছিলেন রেফারিরাও। পরে রিও ডি জেনেইরো থেকে ব্রাজিল দলও ওঠে জাহাজে। অর্থাৎ আজ যে বিশ্বকাপকে আমরা বিলিয়ন ডলারের গ্লোবাল মেগা ইভেন্ট হিসেবে দেখি, তার প্রথম যাত্রার বড় অংশটাই হয়েছিল এক ভাসমান করিডরে, যেখানে দল, সংগঠক, ট্রফি আর স্বপ্ন একই ডেকে জায়গা ভাগ করে নিয়েছিল।

ভাবুন দৃশ্যটা। একদিকে সমুদ্র, চারপাশে নীল জলরাশি, সামনে অনিশ্চিত টুর্নামেন্ট। খেলোয়াড়রা জানেন, তারা ইতিহাসের অংশ হতে চলেছেন, কিন্তু সেই ইতিহাসের মঞ্চে পৌঁছাতেই লাগছে প্রায় দুই সপ্তাহের সমুদ্রযাত্রা। নিয়মিত মাঠ নেই, ঘাস নেই, গোলপোস্ট নেই। তাই অনুশীলনের বদলে জাহাজের ডেকে দৌড়, শরীরচর্চা, সীমিত জায়গায় ফিটনেস ধরে রাখার চেষ্টা।
আজকের চোখে এটি রোমান্টিক মনে হতে পারে, কিন্তু তখন ছিল কঠিন বাস্তবতা। সমুদ্রযাত্রায় শরীর ভারী হয়ে যায়, ম্যাচের ধার কমে যায়, রুটিন ভেঙে যায়। এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অপরিচিত মহাদেশে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলা, সেটাই ছিল সাহসের ব্যাপার। ইউরোপের মাত্র চারটি দল শেষ পর্যন্ত ১৯৩০ বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল। দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যাত্রা, সঙ্গে মহামন্দার অর্থনৈতিক চাপ, অনেক দেশকে পিছিয়ে দিয়েছিল।

তবু যারা গিয়েছিল, তারা শুধু ম্যাচ খেলতে যায়নি; তারা বিশ্বকাপের জন্মদৃশ্যের সাক্ষী হতে গিয়েছিল। এসএস কন্তে ভার্দে তাই শুধু পরিবহন ছিল না, ছিল ফুটবল ইতিহাসের প্রথম বড় অভিযানের প্রতীক। এই জাহাজে ছিল সেই ট্রফি, যেটি পরে জুল রিমে ট্রফি নামে পরিচিত হয়। ছিলেন জুল রিমে নিজে, যার স্বপ্ন ছিল অলিম্পিকের বাইরে ফুটবলের নিজস্ব বিশ্বমঞ্চ তৈরি করা। ছিলেন ইউরোপের খেলোয়াড়রা, যাদের কেউ কেউ হয়তো বুঝতেই পারেননি, তাঁরা যে টুর্নামেন্টে যাচ্ছেন, সেটি একদিন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব হয়ে উঠবে।
১৯৩০ সালের বিশ্বকাপে অংশ নেয় ১৩টি দল। সব ম্যাচ হয় উরুগুয়ের রাজধানী মন্টেভিডিওতে। আয়োজক উরুগুয়ে তখন শুধু স্বাগতিক নয়, ফুটবলের শক্তিধর নামও। তারা ১৯২৪ ও ১৯২৮ অলিম্পিকে সোনা জিতেছিল, আর দেশের সংবিধানের শতবর্ষ উদ্যাপনের বছরেই প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পায়। শেষ পর্যন্ত ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়নও হয় উরুগুয়ে।
কিন্তু সেই শিরোপার আগের গল্পে এসএস কন্তে ভার্দের জায়গা আলাদা। কারণ বিশ্বকাপের জন্ম শুধু স্টেডিয়ামে হয়নি, হয়েছিল যাত্রাপথেও। জাহাজের ডেকে হাঁটা-দৌড়, সমুদ্রের ওপর দিন গোনা, দূর দেশের অনিশ্চয়তা, আর এক নতুন টুর্নামেন্টের প্রতি অদ্ভুত বিশ্বাস, সব মিলেই প্রথম বিশ্বকাপকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল এক অভিযাত্রার আবহ।
আজ ২০২৬ বিশ্বকাপ সামনে দাঁড়িয়ে আছে একেবারে ভিন্ন বাস্তবতায়। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা মিলিয়ে বিশাল আয়োজন, ৪৮ দল, আধুনিক স্টেডিয়াম, উন্নত প্রযুক্তি, কোটি কোটি দর্শক। দলগুলো পৌঁছাবে বিমানে, থাকবে পাঁচতারকা সুবিধায়, অনুশীলন করবে নির্ধারিত ট্রেনিং সেন্টারে। কিন্তু প্রায় এক শতাব্দী আগে ফুটবলের এই মহাযাত্রা শুরু হয়েছিল অনেক সরল, অনেক কঠিন, অনেক বেশি মানবিক এক পথে। একটি জাহাজে চেপে।
