প্যারাগুয়েকে উড়িয়ে বিশ্বকাপ শুরু যুক্তরাষ্ট্রের

ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ শুরুটা দাপটের সঙ্গেই করল যুক্তরাষ্ট্র। লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে গ্রুপ ‘ডি’র ম্যাচে প্যারাগুয়েকে ৪-১ গোলে হারিয়েছে মরিসিও পচেত্তিনোর দল।
যুক্তরাষ্ট্রের জয়ের নায়ক ফোলারিন বালোগান। প্রথমার্ধেই জোড়া গোল করেন মোনাকোর এই ফরোয়ার্ড। তার আগে ক্রিস্টিয়ান পুলিসিকের দারুণ ড্রিবল ও নিচু ক্রস থেকে দামিয়ান বোবাদিয়ার আত্মঘাতী গোলে এগিয়ে যায় স্বাগতিকেরা। প্যারাগুয়ের হয়ে দ্বিতীয়ার্ধে ব্যবধান কমান মাউরিসিও। আর ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে গোল করেন যুক্তরাষ্ট্রের জিওভানি রেইনা।
যুক্তরাষ্ট্র কোচ মরিসিও পচেত্তিনো অনেক দিন ধরেই বলে আসছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আসল পরীক্ষা বিশ্বকাপে। প্রস্তুতি ম্যাচের ফল, ওঠানামা, সমালোচনা—সবকিছুর ভেতর দিয়ে তিনি যেন একটি কথাই ধরে রেখেছিলেন: সময় এলেই তাঁর দল নিজেদের চেহারা দেখাবে।
সোফাই স্টেডিয়ামে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে সেই চেহারাই দেখা গেল। ঘরের বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্র জিতল ৪-১ গোলে। স্কোরলাইন বড়, কিন্তু শুধু ফল নয়, জয়ের ধরনটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গতি, প্রেসিং, পাস, দ্রুত দিক বদল, পুলিসিকের আগুনে শুরু, বালোগানের ফিনিশিং—সব মিলিয়ে পচেত্তিনোর পরিকল্পনার প্রথম বড় প্রমাণ পেল যুক্তরাষ্ট্র।
ম্যাচের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ছিল আক্রমণাত্মক। প্যারাগুয়ে যেন প্রস্তুতই ছিল না সেই গতির জন্য। ৭ মিনিটেই বাঁ দিক দিয়ে ক্রিস্টিয়ান পুলিসিক দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বক্সে ঢোকেন। তাঁর নিচু ক্রস সামলাতে গিয়ে দামিয়ান বোবাদিয়া নিজেদের জালেই বল ধান্তে।
এরপর যুক্তরাষ্ট্র থামেনি। প্যারাগুয়ের রক্ষণ বারবার অস্বস্তিতে পড়েছে পুলিসিক, ওয়েস্টন ম্যাকেনি, মালিক টিলম্যান, সার্জিনো ডেস্ট ও ফোলারিন বালোগানের দ্রুত সমন্বয়ে। বল এক পা থেকে আরেক পায়ে গেছে কম স্পর্শে, কিন্তু পরিষ্কার উদ্দেশ্যে। প্যারাগুয়ে শুধু পেছনে দৌড়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ সাজিয়েছে।
৩১ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন বালোগান। দ্রুত আক্রমণ থেকে বল পেয়ে ঠান্ডা মাথায় ফিনিশ করেন মোনাকোর ফরোয়ার্ড। গোলটি ছিল একজন নিখুঁত নম্বর নাইন-এর কাজ—সঠিক জায়গায় থাকা, বলের গতির সঙ্গে শরীর মেলানো এবং ফিনিশিংয়ে কোনো তাড়াহুড়া না করা।
প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে বালোগানের দ্বিতীয় গোল আরও সুন্দর। বক্সের বাইরে বল পেয়ে ডিফেন্ডারদের সামনে থেকে ভেতরে কাটেন তিনি। এরপর বাঁ পায়ের জোরালো শটে বল পাঠান জালে। প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিলের করার ছিল খুব সামান্য। বিরতির আগেই ম্যাচ প্রায় শেষ করে দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
এই প্রথমার্ধ ছিল পচেত্তিনোর যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে পরিষ্কার বিজ্ঞাপন। উচ্চ প্রেসিংয়ে বল কাড়া, বল কাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত আক্রমণ, উইং দিয়ে ভাঙা, মাঝখানে টিলম্যানের বুদ্ধিদীপ্ত অবস্থান, ম্যাকেনির শক্তি, ডেস্টের ওভারল্যাপ—সবকিছুই একসঙ্গে কাজ করেছে।
প্যারাগুয়ে নিজেদের পরিচিত চরিত্রও দেখাতে পারেনি। দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলোর সঙ্গে যে লড়াই, শরীরী উপস্থিতি, ম্যাচের গতি ভাঙার ক্ষমতা জড়িয়ে থাকে, তার খুব কমই দেখা গেছে প্রথমার্ধে। রক্ষণে তারা ছিল ছন্নছাড়া, মাঝমাঠে ধীর, আক্রমণে বিচ্ছিন্ন।
বিরতির পর পুলিসিককে আর নামাননি পচেত্তিনো। ম্যাচের বড় অংশ তখন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। তবু পুলিসিক না থাকায় আক্রমণের ধার কিছুটা কমে যায়। প্যারাগুয়ে কিছুটা বল রাখতে শুরু করে, ডান দিক দিয়ে আক্রমণ গড়ার চেষ্টা করে।
৭৩ মিনিটে প্যারাগুয়ের সান্ত্বনার গোল আসে মাউরিসিওর পা থেকে। হুলিও এনসিসোর পাস থেকে বক্সের বাইরে জায়গা পেয়ে নিচু শটে গোল করেন তিনি। গোলটি প্যারাগুয়েকে সাময়িকভাবে ম্যাচে ফেরার ইঙ্গিত দিলেও বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র খুব বেশি বিপদে পড়েনি।
বরং শেষ দিকেও সুযোগ তৈরি করেছে স্বাগতিকরা। টিমোথি ওয়েহর শট বিপদ তৈরি করেছিল। রিকার্ডো পেপিও বড় সুযোগ পেয়েছিলেন, যদিও তাঁর শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। প্যারাগুয়ে কয়েকটি হলুদ কার্ড দেখে, ম্যাচের শেষ দিকে তাদের হতাশাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
যোগ করা সময়ে জিও রেইনা শেষ রঙটা লাগান। দারুণ শটে গোল করেন তিনি। গোলটি ছিল নান্দনিক, আত্মবিশ্বাসী এবং ম্যাচের পুরো গল্পের সঙ্গে মানানসই—এই যুক্তরাষ্ট্র শুধু জিততে চায় না, সুন্দর ফুটবলও খেলতে চায়।
বালোগানের রাতটি আলাদা করে মনে থাকবে। ১৯৩০ সালের পর বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো খেলোয়াড়ের প্রথম জোড়া গোল এটি। পুলিসিকের তৈরি প্রথমার্ধ, বালোগানের ফিনিশিং এবং রেইনার শেষ গোল—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ঘরের বিশ্বকাপে প্রথম রাতেই শক্ত বার্তা দিল।
.png)

